Image description

জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার আহম্মেদাবাদ ইউনিয়নের রাঘবপুর গ্রামের তরুণ সিহাব হোসেন (২৪)। প্রবাসে চাকরি দেওয়ার কথা বলে তাকে পাকিস্তানে নিয়ে গিয়ে কিডনি কেটে নেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে তার বাবা-মা ও তারেক হাজী নামের এক দালালসহ একটি চক্রের বিরুদ্ধে। পাকিস্তানের একটি বেসরকারি হাসপাতাল থেকে কৌশলে পালিয়ে দেশে ফিরে এমন অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী সিহাব।

সিহাব রাঘবপুর গ্রামের সিরাজুল ইসলাম ও রহিমা বেগম দম্পতির ছেলে। এ ঘটনায় তিনি কালাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে লিখিত এজাহার নিয়ে গেলেও নেওয়া হয়নি বলে দাবি করেছেন। অভিযোগপত্রে তার বাবা সিরাজুল ইসলাম, মা রহিমা বেগমসহ অজ্ঞাতনামা কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

লিখিত অভিযোগে সিহাব উল্লেখ করেন, প্রায় দুই মাস আগে তার বাবা-মা তাকে জানান, পাকিস্তানের একটি হাসপাতালে চাকরি দেওয়ার বিষয়ে তাদের পরিচিত ব্যক্তিদের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। বাবা-মায়ের কথায় তিনি পাকিস্তানে যেতে রাজি হন। পরে বাবা-মায়ের সঙ্গে ঢাকায় যান এবং সেখানে তার বাবার পরিচিত তারেক হাজীসহ তিনজন ব্যক্তির সঙ্গে তার পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। এরপর দ্রুত তার পাসপোর্ট ও ভিসার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। 

সিটিও লোকাল ট্যুর গাইড এক্সপ্লোর করা

 

অভিযোগ অনুযায়ী, গত ২২ জুলাই ২০২৬ দুপুর আনুমানিক ২টায় ওই তিন ব্যক্তির সঙ্গে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিমানে পাকিস্তানে যান সিহাব। সেখানে পৌঁছানোর পর তাকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করা হয়।

পরের দিন হাসপাতালে নেওয়ার পর একটি ‘বোর্ড মিটিংয়ে’ তাকে জানানো হয়, তার একটি কিডনি তার বাবা-মা ছয় লাখ টাকার বিনিময়ে বিক্রির জন্য চুক্তি করেছেন। এ চুক্তির বিপরীতে তার বাবা অগ্রিম তিন লাখ টাকা নিয়েছেন বলেও তাকে জানানো হয়। বিষয়টি আগে কিছুই জানতেন না বলে অভিযোগ করেন তিনি।

কিডনি বিক্রির বিষয়টি জানতে পেরে সিহাব আপত্তি জানালে তাকে ওই হাসপাতালে আটকে রেখে কিডনি অপারেশনের প্রস্তুতি নেওয়া হয় বলে অভিযোগ তার।

একপর্যায়ে অন্য একজনের সহযোগিতায় কৌশলে তিনি তাদের কবল থেকে পালিয়ে যান। পরে গত ৩১ জুলাই দুপুর আনুমানিক ১২টার দিকে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফিরে আসেন বলে জানান সিহাব।

পাকিস্তানি ভিসা নম্বর: ২০-২৫-০৭০৮ চায়ন এয়ার লাইন্স ৩০ জুলাই: টিকিট নম্বর CZ8070, সিট নম্বর A1 ৩১ জুলাই টিকিট নম্বর CZ5015, সিট নম্বর A।

এরপর ১১ আগস্ট সকালে নিজ বাড়িতে ফিরে বাবা-মাকে কিডনি বিক্রির বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেন সিহাব। তার বাবা-মা বিষয়টি অস্বীকার করেন এবং তাকে গালিগালাজ ও বিভিন্ন ধরনের হুমকি দেন। কাউকে বিষয়টি জানালে খবর আছে বলেও হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ তার। 

দৈনিকখবরের ডিজিটাল সাবস্ক্রিপশন নেওয়া

 

পাকিস্তানের হাসপাতাল থেকে পালিয়ে আসা ভুক্তভোগী সিহাব বলেন, আমার আপন বাবা-মা প্রবাসে কাজ দেওয়ার কথা বলে কৌশলে আমার একটি কিডনি ছয় লাখ টাকার বিনিময়ে দালালের কাছে বিক্রি করে দেন। পাকিস্তানে নিয়ে হাসপাতালে কিডনি কেটে নেওয়ার প্রস্তাব দিলে আমি প্রতিবাদ করি। একপর্যায়ে তাদের সঙ্গে আমার হাতাহাতি হয়। আমি লোকজন ও পুলিশ ডাকব বলে ভয় দেখালে তাদের একজন আমাকে পাকিস্তান বিমানবন্দরে নিয়ে এসে টিকিট করে দিতে বাধ্য হন।

তিনি আরও বলেন, দেশে ফিরে আমি ঢাকায় কিছুদিন রিকশা চালিয়েছি। পরে নিজ গ্রামে ফিরে বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি, টাকার বিনিময়ে আমার একটি কিডনি বিক্রির চুক্তি করা হয়েছিল। আমি প্রতিবাদ করায় বাবা আমাকে বাড়িতে থাকতে দিচ্ছেন না। বর্তমানে বন্ধুদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে আছি।

প্রশাসনের কাছে আমার দাবি, আমার বাবা-মা ও এই দালালচক্রের সঙ্গে জড়িতদের তদন্ত করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক। না জানি এভাবে এই এলাকার আরও কত মানুষের কিডনি তারা কৌশলে বিক্রি করেছেন।

এদিকে কালাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, এ সংক্রান্ত কোনো ঘটনা নিয়ে থানায় কেউ অভিযোগ করতে আসেনি। যদি এমন কোনো ভুক্তভোগী থাকে, থানায় এলে তার কথা শুনে বিষয়টি দেখা হবে।

অন্যদিকে সিহাবের দাবি, তিনি থানায় অভিযোগ নিয়ে গেলেও তার অভিযোগ নেওয়া হয়নি। তিনি বিষয়টি পুলিশ সুপার ও জেলা প্রশাসকের কাছে জানানোর কথা জানিয়েছেন।

সিরাজুল ইসলাম রহিমা দম্পতির ব্যবহৃত মুঠোফোনে যোগাযোগ করে তাদের বক্তব্য জানতে চাইলে তারা বলেন, তাদের ছেলে ঢাকায় রিকশা চালাতেন। সেখান থেকে তিনি পাকিস্তানে যান। পরে ছেলে নিখোঁজ হলে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য তারা সিমরাল গ্রামের আলফাজ ও কালাইয়ের মূলগ্রামের এক ব্যক্তির মুঠোফোনের মাধ্যমে ঢাকার এক দালালের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। 

সিটিও লোকাল ট্যুর গাইড এক্সপ্লোর করা

 

তাদের দাবি, ছেলেকে দেশে ফিরিয়ে আনতেই তারা ওই ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। তাদের ছেলে মাদক সেবন করেন এবং তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দেওয়ার চেষ্টা করছেন।

তবে প্রশ্ন ওঠে, তারা যদি কিডনি চক্রের সঙ্গে যুক্ত না থাকেন, তাহলে ওই চক্রের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ কীভাবে হলো? এমন প্রশ্নের জবাবে রহিমা দম্পতি বলেন, সত্যি স্যার, এ বিষয়ে আমরা কিছুই জানি না। আমাদের পেটে ধরা সন্তানই আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা গুজব রটাচ্ছে।

এ বিষয়ে জয়পুরহাটের পুলিশ সুপার শাহনাজ বেগম বলেন, মানবদেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ক্রয়-বিক্রয়ের সঙ্গে জড়িত দালালচক্রের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সিহাবের অভিযোগটিও আমলে নিয়ে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।