Image description

রাজধানীর শান্তিনগর এলাকায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের নাক, কান, গলা ও হেড-নেক সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয়প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. আসাদুর রহমানের ওপর হামলার ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। হামলার আগে হোয়াটসঅ্যাপে ‘ডেভিড ইমন গ্রুপের’ পরিচয়ে তার কাছে ১৫ হাজার মার্কিন ডলার অর্থাৎ ১৮ লাখ ৩০ হাজার ২৮২ টাকা (প্রতি ডলার প্রায় ১২২.০২ টাকা হিসাবে) চাঁদা দাবি করা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী চিকিৎসক। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টাকা না দিলে তাকে ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যার হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।

 

ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলতি আগস্টের ৬ তারিখ হোয়াটসঅ্যাপে ডেভিড ইমন গ্রুপের পরিচয়ে তার কাছে ১৫ হাজার ডলার চাঁদা দাবি করা হয়। ১৫ আগস্টের মধ্যে ওই অর্থ পরিশোধ করতে বলা হয়। টাকা দিতে ব্যর্থ হলে তাকে এবং তার পরিবারের সবাইকে ‘খতম’ (শেষ) করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয় বলে জানান তিনি।

 

গত সোমবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে শান্তিনগরের চেম্বার থেকে বের হন অধ্যাপক ডা. আসাদুর রহমান। একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে কিছু দূর যাওয়ার পর ৫-৬ জন ব্যক্তি তার পথরোধ করে। তারা অটোরিকশার দরজার কাছে গিয়ে দাবি করে, চিকিৎসকের ভুল চিকিৎসার কারণে তাদের এক আত্মীয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এ কথা বলে তারা জোরপূর্বক অটোরিকশার দরজা খুলে চিকিৎসকের ওপর হামলা চালায়।

 

অভিযোগ রয়েছে, হামলার প্রায় এক ঘণ্টা পর ফের হোয়াটসঅ্যাপে ওই চিকিৎসককে বার্তা পাঠানো হয়—‘How do you feel now?’ পরদিনও তাকে নক করে বলা হয়, বিষয়টি নিয়ে প্রশাসন কিংবা সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে কোনো লাভ হবে না। এমনকি ‘এরা আমাদেরই লোক’ এবং তারা চিকিৎসকের বিরুদ্ধেই কাজ করবে—এমন হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন অধ্যাপক ডা. আসাদুর রহমান।

 

বর্তমানে এই চিকিৎসক ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভিভিআইপি কেবিনে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

 

চিকিৎসককে ‘ভুল চিকিৎসার’ অজুহাতে হামলা?

পল্টন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোস্তফা কামাল খান জানান, শান্তিনগর এলাকায় এক চিকিৎসকের ওপর হামলার ঘটনায় একজনকে আটক করা হয়েছে।

 

তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে কোনো রোগীর চিকিৎসাকে কেন্দ্র করে ঘটনাটি ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। হামলায় চিকিৎসকের চোখে আঘাত লেগেছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। তবে ঘটনাটি বিস্তারিত তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। এ ঘটনায় অভিযোগ পাওয়া গেলে আইনগত প্রক্রিয়া অনুযায়ী মামলা নেওয়া হবে।

 

তবে ভুক্তভোগী চিকিৎসকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হামলার আগে ১৫ হাজার ডলার চাঁদা দাবি এবং পরপর হত্যার হুমকির বিষয়টি নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। হামলাটি শুধু কোনো রোগীর চিকিৎসাকে কেন্দ্র করে তাৎক্ষণিক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ, নাকি এর পেছনে পরিকল্পিত চাঁদাবাজি ও অপরাধী চক্রের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে—তা এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

‘দৃষ্টিশক্তি হারানোর শঙ্কা’

হামলায় আহত অধ্যাপক ডা. আসাদুর রহমানের সহকর্মী অধ্যাপক ডা. মাজহারুল ইসলাম শাহীন বলেন, ভয়াবহ হামলার কারণে ডা. আসাদুর রহমানের দৃষ্টিশক্তি হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তিনি এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

 

জাতীয় নাক, কান ও গলা ইনস্টিটিউট, তেজগাঁওয়ের পরিচালক ডা. হাসান জাফর রিফাত বলেন, কয়েক বছর ধরে দেশে বিভিন্ন ‘ভুল চিকিৎসা’র অভিযোগকে কেন্দ্র করে চিকিৎসকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটছে। প্রতিটি ঘটনায় যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হলে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব হতো।

 

তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের ওপর চিকিৎসকদের পূর্ণ আস্থা রয়েছে এবং তারা দ্রুত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনবে বলে তিনি আশা করেন।

 

কে এই ডেভিড ইমন

চিকিৎসকের কাছে হোয়াটসঅ্যাপে চাঁদা দাবিতে ‘ডেভিড ইমন গ্রুপের’ নাম ব্যবহারের ঘটনায় এখন আলোচনায় এসেছে চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমনের নাম। প্রশ্ন উঠেছে—চিকিৎসককে হুমকি দেওয়া ও হামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ‘ডেভিড ইমন’ কি পুলিশের নথিতে থাকা সেই আলোচিত অপরাধী, নাকি তার নাম ব্যবহার করে অন্য কোনো চক্র চিকিৎসককে ভয় দেখিয়েছে?

 

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাইয়ে যশোর থেকে ডেভিড ইমনসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে অন্তত ১৫টি মামলা থাকার কথা জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এসব মামলার মধ্যে ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ বাকলিয়া এলাকায় আলোচিত জোড়া হত্যা, ২৩ মে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবর হত্যা, হাটহাজারীর জোড়া হত্যা, চান্দগাঁওয়ের আফতাব হত্যা এবং চন্দনপুরা এলাকায় একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে হামলার অভিযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

 

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট আনিস ও মোহাম্মদ হাসান হত্যা মামলায় প্রথম তার নাম আসে। এরপর একের পর এক আলোচিত অপরাধের ঘটনায় তার নাম জড়িয়ে পড়ে।

 

পুলিশের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর চট্টগ্রামের অপরাধজগতে ডেভিড ইমনের দ্রুত উত্থান ঘটে। ওই সময় বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে ‘বড় সাজ্জাদ’-এর গ্রুপে যোগ দেন তিনি। পরে দুঃসাহসিক কর্মকাণ্ডের কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই গ্রুপটির অন্যতম সক্রিয় সদস্যে পরিণত হন বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি।

 

তদন্তেই মিলবে আসল রহস্য

একজন চিকিৎসকের ওপর প্রকাশ্য হামলা, হামলার আগে বিপুল অঙ্কের চাঁদা দাবি, পরিবারের সদস্যদের হত্যার হুমকি এবং হামলার পরপরই হোয়াটসঅ্যাপে দেওয়া রহস্যজনক বার্তা—সব মিলিয়ে ঘটনাটি সাধারণ হামলার চেয়ে অনেক বেশি গুরুতর ও পরিকল্পিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।

 

তবে ‘ডেভিড ইমন গ্রুপ’ কিংবা আলোচিত ডেভিড ইমন সরাসরি এই হামলা ও চাঁদা দাবির সঙ্গে জড়িত কি না, তা এখনও তদন্তসাপেক্ষ। হামলাকারীদের পরিচয়, ব্যবহৃত হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর, বার্তার উৎস এবং আটক ব্যক্তির জিজ্ঞাসাবাদ—এসব বিষয় বিশ্লেষণ করলেই ঘটনার নেপথ্যের প্রকৃত রহস্য উদ্‌ঘাটন হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।

 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ এশিয়া পোস্টকে বলেন, ঘটনাটি আমরা গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। ইতিমধ্যে থানায় মামলা করা হয়েছে। এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে অনিক নামের এক যুবককে আটক করা হয়েছে।

 

তিনি আরও বলেন, ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে হুমকিদাতাকে গ্রেপ্তারে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।