Image description

দেশব্যাপী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলছে। বিশেষ করে ঢাকাতে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা চোখে পড়ার মতো। এ বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে দেশব্যাপী মৃত্যুর ৭৪ জনের মধ্যে ঢাকাতেই ৩৪ জন। আক্রান্তের সংখ্যাও ছাড়িয়েছে ১০ হাজার। 

এরই মধ্যে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) বলেছে, বিগত চার বছর ধরে দেশে ডেঙ্গু ভাইরাসের ধরন (সেরোটাইপ) ছিল ডেন-২। কিন্তু ঢাকাসহ দেশের কয়েকটি জেলায় এবার ডেন-৩ পাওয়া গেছে। 

ঢাকায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়া ৭১ জনের নমুনা বিশ্লেষণ করে ৯১ দশমিক ৫ শতাংশে ডেন-৩ ও ৮ দশমিক ৫ শতাংশে ডেন-২ পাওয়া গেছে। এর ফলে এবার ডেঙ্গুতে আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি হতে পারে বলে জানিয়েছেন রোগতত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

সম্প্রতি আইইডিসিআরের একদল গবেষক দেশের বিভিন্ন স্থানে ডেঙ্গুর নমুনা সংগ্রহ করে একেক স্থানে একেক ধরনের সেরোটাইপের দেখা পেয়েছেন।

মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) গবেষণা দলের একাধিক সদস্যের সঙ্গে এ প্রতিবেদকের কথা হলে তারা জানান, এবার ঢাকাতে ডেঙ্গুর ধরন পুরোপুরি পাল্টে গেছে। গত বছর যেখানে ডেন-২ ছিল ৪৮ শতাংশ এবং ডেন-৩ ছিল ৩৫ শতাংশ। বিশেষ করে গত দুই বছর ধরে ডেঙ্গুর সেরোটাইপের আচরণগত পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। কিন্তু এবার পুরোপুরি ডেন-৩-তে শিফট করেছে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন জেলাতেও ডেন-২ থেকে ডেন-৩-তে রূপ নিচ্ছে। কিন্তু ঢাকার মতো এভাবে শিফট করছে না।

দ্বিতীয়বার ডেঙ্গুতে মৃত্যুঝুঁকি বাড়তে পারে

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গুর সেরোটাইপে এমন পরিবর্তন বড় ধরনের প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। কারণ, আগে ডেন-২-এ আক্রান্ত হয়ে যাদের শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছিল, তারা এখন ডেন-৩-এ নতুন করে আক্রান্ত হতে পারেন। দ্বিতীয়বার ডেঙ্গু হলে রোগের জটিলতা ও মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায়।

ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা– সেরোটাইপ বদলের মধ্যে এর প্রজননস্থল ধ্বংসেই জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা / ফাইল ছবি

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, দীর্ঘদিন দেশে ডেন-২-এর আধিপত্য থাকায় অনেক মানুষের শরীরে ওই সেরোটাইপের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এখন ডেন-৩ বেশি ছড়ালে সেই অ্যান্টিবডি সুরক্ষা দিতে পারবে না। ফলে এবার মৃত্যুঝুঁকির আশঙ্কা বেশি করা যাচ্ছে। একই সঙ্গে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব নভেম্বর-ডিসেম্বর পর্যন্ত গড়াতে পারে।

এ বিষয়ে আইইডিসিআরের পরিচালক ডা. কাজী আহমেদ জাকী বলেন, এবার ডেন-৩ সেরোটাইপের কারণে রোগীদের মধ্যে দ্রুত ডেঙ্গু শক সিনড্রোমের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। এর ফলে ডেঙ্গুতে মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। আমরা আশঙ্কা করেছি, আগামী মাস থেকে দেশব্যাপী ডেঙ্গু ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। বৃষ্টির পরিমাণ কমলেই বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানিতে মশার লার্ভার পরিমাণ বেড়ে যায়। তাই ডেঙ্গু মোকাবিলা করার জন্য জনসচেতনতার বিকল্প নেই। যদি এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা সম্ভব হয়, তাহলে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়া থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। আর কারও জ্বর হলে অবহেলা না করে দ্রুত পরীক্ষা ও চিকিৎসা নিতে হবে।

ডেঙ্গু ছড়িয়েছে ৬৪ জেলাতেই, সংক্রমণ বেশি পিরোজপুরে

এদিকে ডেঙ্গু দেশের ৬৪ জেলায় আক্রান্ত হয়েছে। জেলা বিবেচনায় পিরোজপুরে সংক্রমণ বেশি দেখা যাচ্ছে। এ জেলায় বেশি হওয়ার পেছনে আইইডিসিআরের এক গবেষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমরা যখন পিরোজপুরে নমুনা সংগ্রহে যাই, সেখানকার প্রত্যন্ত এলাকায় কাটা সুপারি গাছের গোড়ায় গর্ত হয়ে সেখানে জমে থাকা পানিতে প্রচুর লার্ভা পাই। এরকম বিভিন্ন স্থানে গিয়ে একই ধরনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আমরা গেছি। সেখানকার মানুষদের কাছে ডেঙ্গু সম্পর্কে জানতে চাইলে তারা এ সম্পর্কে কিছু জানেন না বলে জানান। তিনি বলেন খুব শিগ্‌গির আমাদের গবেষণাপত্রটি প্রকাশ হবে তখন বিস্তারিত জানানো হবে।

আইইডিসিআরের কর্মকর্তারা বলছেন, ডেন-৩-এর বিস্তারের কারণে দ্রুত ডেঙ্গু শক সিনড্রোমের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব নভেম্বর-ডিসেম্বর পর্যন্ত গড়ানোর আশঙ্কাও রয়েছে।

আইইডিসিআরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে ডেঙ্গুর সেরোটাইপের আধিপত্য সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে। ২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ডেন-১ ও ডেন-২ বেশি ছিল। ২০১৯ সালে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাবের সময় আক্রান্তের প্রায় ৯০ শতাংশের শরীরে ডেন-৩ শনাক্ত হয়েছিল। এরপর ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ঢাকায় আবার ডেন-২ সবচেয়ে বেশি প্রচলিত ছিল। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে পরীক্ষিত নমুনার প্রায় ৭০ শতাংশে ডেন-২ পাওয়া যায়। ২০২৫ সালে তা কমে ৪৮ শতাংশে নামে।

হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ঢাকা বিভাগে

এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে নতুন ৭০৩ ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ বছর মোট ২৫ হাজার ৬০১ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

ডেঙ্গুর প্রকোপে হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে রোগীর চাপ– আক্রান্তের সংখ্যা বেশি ঢাকা বিভাগে / ফাইল ছবি

এর মধ্যে মারা গেছেন ৭৪ জন। বিভাগভিত্তিক হিসাবে, ঢাকা দুই সিটি করপোরেশনসহ ঢাকা বিভাগে এ পর্যন্ত রোগী ভর্তি হয়েছেন ১০ হাজার ২২৫ জন। অন্য সাত বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছেন বরিশাল বিভাগে। এই বিভাগে এ পর্যন্ত হাসপাতালে রোগী ভর্তি হয়েছেন ৪ হাজার ৫৫৯ জন।

এরপর পর্যায়ক্রমে আছে চট্টগ্রামে (৪ হাজার ১০৬), খুলনায় (৩ হাজার ৪৬৭), ময়মনসিংহে (১ হাজার ২২৩), রাজশাহীতে (১ হাজার ১৭০) ও রংপুরে ৭০৫ জন। ডেঙ্গু রোগী সবচেয়ে কম শনাক্ত হয়েছেন সিলেট বিভাগে ১৩৬ জন।