Image description

২৮ জুলাই। ঘড়ির কাঁটায় সকাল সাড়ে ১০টা। খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার শরাফপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণকেন্দ্রের আয়া অলোকা মণ্ডল চেয়ারে বসে গল্প করছিলেন। পাশে ওষুধের পাতা কাটছিলেন নৈশপ্রহরী চিন্ময় রায়। ডাক্তারের অপেক্ষায় অশীতিপর আছিরন বিবি।

বেলা সোয়া ১১টায় ঢোকেন কেন্দ্রের উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার (এসএসিএমও) তনুময় বিশ্বাস। দেরির কারণ ব্যাখ্যায় বললেন, ‘ফটো কপি করতি যাইয়ে দেরি হইছে। কখনো এমন হয় না।’ শেষমেশ বর্ষাকেও দুষলেন।

আলাপে জানা গেল, তিনি এ কেন্দ্রের অতিরিক্ত দায়িত্বে। প্রতি মঙ্গলবার এক দিনের জন্য আসেন। তাঁর পোস্টিং পার্শ্ববর্তী গুটুদিয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। কেন্দ্রের পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা (এফডব্লিউভি) পদটি দেড় বছর শূন্য। ফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রসূতিসেবা, মা-শিশুস্বাস্থ্য এবং পরিবার পরিকল্পনার মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এখানকার হতদরিদ্র হাজারো মানুষ। স্থানীয় বাসিন্দা আশরাফ হোসেন জানান, আবাসিক ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও এখানে কেউ থাকে না। ডাক্তার আসে সপ্তায় একবার। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বি এম আলমগীর কবীর বলেন, কয়েক কোটি টাকার এই সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে সাধারণ মানুষ সুফল পাচ্ছে না। প্রয়োজনীয় ওষুধও দেওয়া হয় না। বেশি অসুবিধায় পড়েন গর্ভবতী মা ও শিশুরা।

শরাফপুর কেন্দ্র থেকে চার কিলোমিটার দূরে সাহস ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রটি একাই চালাচ্ছেন পরিবারকল্যাণ পরিদর্শক কাজী সুলতানা জাহান। এখানকার ছয়টি পদের পাঁচটিই বহুদিন শূন্য। সুলতানা জাহান বলেন, স্বাস্থ্যসেবাসহ অফিশিয়াল কাগজপত্র তৈরি একসঙ্গে সামলানো একার পক্ষে কঠিন। রূপসা উপজেলার নৈহাটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রটি একাই চালাচ্ছেন পরিবারকল্যাণ পরিদর্শক হাফিজা খাতুন। কেন্দ্রের উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারসহ চারটি পদই শূন্য। হাফিজা খাতুন জানান, অনেক চাপের মধ্যে কাজ করতে হয়।

স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, তৃণমূলের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ইউনিয়নে পর্যায়ে একটি করে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র রয়েছে। দুই ও তিন তলার কেন্দ্রের ভবনগুলোতে আবাসিক সুবিধাও আছে। কেন্দ্র পরিচালনার জন্য একজন উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার এবং একজন পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকাসহ আয়া, নৈশপ্রহরী ও ধাত্রী কাম নার্সের পদ রয়েছে। কেন্দ্রগুলো থেকে গ্রামের দরিদ্র মানুষের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, শিশুদের টিকা প্রদান, গর্ভবতী মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা এবং স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ ও সচেতনাতামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়।

কিন্তু জনবল, ওষুধ ও সরঞ্জামের সংকটে সেবাগুলো সাধারণ মানুষ পাচ্ছে না। তাদের ছুটতে হচ্ছে উপজেলা বা শহরের হাসপাতাল-ক্লিনিকে। জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, খুলনার ৪৮ কেন্দ্রের মধ্যে ১২টিতে ২৯ বছরেও উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদই সৃষ্টি করা হয়নি। বাকি ৩৬টি সৃষ্ট পদের ১৬টি শূন্য। পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকার ৪৮টি পদের মধ্যে ১৮টি শূন্য। ১৫টি ফার্মাসিস্ট পদের ৭টি, ৪৮টি আয়া ও এমএলএসএস কাম নৈশপ্রহরী পদের মধ্যে যথাক্রমে ১৬টি এবং ১৫টি পদ দীর্ঘদিন শূন্য।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগীয় কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বিভাগের ১০ জেলায় ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রের সংখ্যা ৪৪১টি। এর মধ্যে ১৩১টির আবাসিক ভবন বসবাস অনুপযোগী এবং পরিত্যক্ত। ফলে এসব কেন্দ্রে প্রসূতি মায়েরা রাতবিরাতে প্রয়োজনীয় সহয়তা পান না। জনবলেও মহাসংকট। বিভাগের ৪১০ জন উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার পদের ২২৭টি (৫৫ শতাংশ) এবং পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকার ৭৪০টি পদের মধ্যে ৩৫৮টি পদ শূন্য (৪৮ শতাংশ)। এ ছাড়া ১৮৫টি ফার্মাসিস্ট পদের ১২৫টি (৬৮ শতাংশ), ৫৪৬টি আয়া পদের ২৬৪টি (৪৮ শতাংশ), এমএলএসএস কাম নিরাপত্তারক্ষীর ৩৩৬টি পদের ১৪৭টি এবং নৈশপ্রহরীর ৭টি পদের ৫টি (৭১ শতাংশ) শূন্য। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, খুলনা বিভাগীয় পরিচালকের ব্যবহারের জন্য গাড়ি বরাদ্দ থাকলেও গত ২৯ বছর গাড়িটি চালানোর জন্য ড্রাইভারের পদই সৃষ্টি করা হয়নি।  

দক্ষিণাঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী, মা ও শিশুস্বাস্থ্য স্বাস্থ্যঝুঁকি প্রশমনে বিশ বছর ধরে কাজ করছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা মুক্তি সেবা সংস্থা। এর নির্বাহী পরিচালক আফরোজা আকতার মঞ্জু বলেন, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো গ্রামীণ জনপদের মানুষের স্বাস্থ্যসেবার বাতিঘর হতে পারত। দীর্ঘ বছরেও তা হয়নি। যাঁরা কেন্দ্রগুলো চালাবেন বা সেবা  দেবেন, তাঁদের অনেকে কেন্দ্রে থাকেন না, শহরে বসবাস। ফলে গরিব মানুষগুলো স্বাস্থ্যসেবার পরিবর্তে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে। তাদের আর্থিক ব্যয়ও বাড়ছে। চাপ পড়ছে শহরের হাসপাতালগুলোতে। প্রয়োজন সঠিক ব্যবস্থাপনা জোরদার করা।

খুলনার উপকূলীয় অঞ্চলে মানুষের স্বাস্থ্য বিষয়ে এক যুগ কাজ করছেন বেসরকারি সংস্থা জাগ্রত যুব সংঘের (জেজেএস) কো-অর্ডিনেটর মামুন অর রশিদ। তিনি বলেন, আয়া-পিয়ন দিয়ে তো স্বাস্থ্যসেবা হয় না। সরকার তৃণমূলের স্বাস্থ্যের উন্নয়নে হাজার কোটি টাকা ব্যয় করছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ সুফল পাচ্ছে কম। পদে পদে গাফিলতি, কর্মকর্তাদের শহরে থাকার মানসিকতা এবং সুপারভিশন না থাকলে যা হয় তা-ই হচ্ছে। স্বাস্থ্য বিভাগের উচিত কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ।

খুলনা জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. আকিব উদ্দিন বলেন, সর্বশেষ ২০২২ সালে নিয়োগ দেওয়া হয়। ২০২৪ সালে নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হলেও তা বন্ধ হয়ে যায়। জনবলসংকটে মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যা জনবল আছে তা দিয়ে কেন্দ্রগুলো চালাতে হচ্ছে।