Image description

ভাঙা দরজা-জানালা। ভবনের ছাদে বটগাছ জন্মে শিকড় ঢুকেছে ঘরের ভিতরে। বৃষ্টি হলেই পানিতে ভেসে যায় দেয়াল ও মেঝে। পরগাছা, জঙ্গলে ঘিরে ধরেছে চারপাশ। এই নড়বড়ে পরিস্থিতিতে সেবা নিতে রোগীরা এলেও মিলছে না সেবা। ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার ইয়াকুবপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রে পাঁচজনের জনবল থাকার কথা থাকলেও মাত্র একজন উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার দিয়ে চলছে সেবা। সপ্তাহের চার দিন এ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সেবা দিয়ে তাঁকে অন্য স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আবার দুই দিন যেতে হয়।

এভাবেই খুঁড়িয়ে চলছে ফেনীর আট ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র। শুধু ফেনী নয়, দেশের অধিকাংশ ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রে সংকটের শেষ নেই। ফেনীর পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের জরাজীর্ণ ভবন সংস্কার করে দোতলা ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ওষুধের সংকট রয়েছে। এ সমস্যার বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে জানালে ওষুধ সরবরাহের আশ্বাস পাওয়া গেছে।’

দেশের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে গড়ে ওঠা ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র এবং ইউনিয়ন সাব-সেন্টারগুলো এখন নিজেই যেন রোগী। কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতেও রয়েছে নানামুখী সমস্যা। তীব্র জনবলসংকট, পর্যাপ্ত ওষুধের অভাব এবং অবকাঠামোগত জরাজীর্ণতার কারণে কাক্সিক্ষত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। সংকটে তৃণমূলের মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় আধমরা অবস্থা। ফলে প্রান্তিক পর্যায়ের এ স্বাস্থ্যসংকট রাজধানীসহ জেলা হাসপাতালগুলোর ওপর সৃষ্টি করছে অতিরিক্ত চাপ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখা সূত্রে জানা গেছে, দেশের প্রান্তিক মানুষকে সেবা দিতে প্রায় ১ হাজার ১০০ ইউনিয়ন সাব-সেন্টার রয়েছে। এ সেন্টারগুলোয় একজন মেডিকেল অফিসার, একজন উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার (স্যাকমো), একজন ফার্মাসিস্ট এবং অফিস সহায়কের (এমএলএসএস) একটি পদ রয়েছে। কিন্তু কাগজে কলমে চারজনের পদ থাকলেও অধিকাংশ জায়গাতেই অর্ধেক জনবল দিয়ে চলছে সেবা। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদনে জানা গেছে, তৃণমূলের সেবায় এ অধিদপ্তরের আওতায় রয়েছে ৩ হাজার ২৯০টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র। এ কেন্দ্রে উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার পদে একজন, পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা একজন, ফার্মাসিস্ট একজন, এমএলএসএস কাম নিরাপত্তাপ্রহরী একজন ও আয়া পদে একজন-মোট পাঁচজনের পদ রয়েছে। কিন্তু জনবলসংকটের কারণে অধিকাংশ জায়গায় অর্ধেক কিংবা তার চেয়ে কম জনবল দিয়ে চলছে সেবা। কমিউনিটি ক্লিনিক ট্রাস্ট সূত্রে জানা যায়, দেশে বর্তমানে ১৪ হাজার ৪৬৭টি কমিউনিটি ক্লিনিক চালু আছে। এখানেও আছে ওষুধের সংকট।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সরকারি হাসপাতাল ও গ্রামীণ স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ ৪১ হাজার ৮০৬। এর মধ্যে ফাঁকা রয়েছে ৯ হাজার ৪০৭টি। অর্থাৎ চিকিৎসক পদের প্রায় ২২ দশমিক ৫ শতাংশ শূন্য।

এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. মো. নুরুল ইসলাম বলেন, ‘ইউনিয়ন সাব-সেন্টারগুলোয় চিকিৎসক, অন্য কর্মী এবং ওষুধের সংকট রয়েছে। সরকার এবার স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে বড় বাজেট দিয়েছে। এ ছাড়া ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে একজন করে স্বাস্থ্যকর্মী বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করবেন। জরাজীর্ণ ভবনের জায়গায় নতুন অবকাঠামো নির্মাণের কাজও পরিকল্পনায় রয়েছে। তাই দ্রুতই এসব সংকটের অনেকটা দৃশ্যমান সমাধান হবে বলে আশা করছি।’

জানা গেছে, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রগুলোয় স্বাভাবিক প্রসব, গর্ভবতী মায়ের নিয়মিত পরীক্ষা, পরিবার পরিকল্পনা ও নবজাতকের সেবা দেওয়ার কথা। কিন্তু অনেক কেন্দ্রে প্রশিক্ষিত জনবল ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাবে এসব সেবা নিয়মিত দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীরা জানান, অনেক ইউনিয়ন সাব-সেন্টারে সপ্তাহে মাত্র এক-দুই দিন স্বাস্থ্যকর্মী উপস্থিত থাকেন। কিছু কেন্দ্রে ভবন থাকলেও নিয়মিত চিকিৎসাসেবা নেই। কোথাও বিদ্যুৎ, বিশুদ্ধ পানি কিংবা ইন্টারনেট সংযোগের সমস্যাও রয়েছে। অনেক ভবন সংস্কারের অভাবে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষ সামান্য জ্বর, ডায়রিয়া, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস কিংবা গর্ভকালীন সেবার জন্যও উপজেলা সদরে যেতে বাধ্য হচ্ছে। এতে সময়, যাতায়াত ও চিকিৎসা ব্যয় সবই বাড়ছে।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, ‘দেশে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় ইউনিয়ন সাব-সেন্টার, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র এবং কমিউনিটি ক্লিনিক কাজ করছে। এগুলোর প্রতিটিতেই জনবলসংকট রয়েছে। এগুলোর তত্ত্বাবধান করে আলাদা প্রতিষ্ঠান। এ তিন ধারাকে এক ছাতার নিচে নিয়ে আসতে হবে। একসঙ্গে সমন্বয় করে সেবা দিলে জনবলসংকটের সমাধান হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সেবাকে বিস্তৃত করে বাড়ি বাড়ি নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে স্বাস্থ্য বিভাগ। কিন্তু স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র চালু রেখে সেটা করতে হবে। ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি উপজেলা হাসপাতালে সেবার পরিধি বাড়াতে হবে। রেফারেল পদ্ধতি গড়ে উঠলে জেলা, বিভাগ এবং ঢাকার বিশেষায়িত হাসপাতালে রোগীর চাপ কমবে।’

এ ব্যাপারে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে আমরা অগ্রাধিকার দিচ্ছি। ইউনিয়ন স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের অবকাঠামো উন্নয়নে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। যেসব ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের জরাজীর্ণ অবস্থা সেখানে নতুন ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা চলছে।’ তিনি আরও বলেন, সরকার এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেবে। এর ৮০ শতাংশ হবেন নারী স্বাস্থ্যকর্মী। তাঁরা নির্দিষ্ট এলাকায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে উচ্চরক্ত চাপ, ডায়াবেটিস পরিমাপসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা দেবেন। একটা মূল ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র থাকবে। সেখান থেকে ওয়ার্ডগুলোতে সেবা পরিচালনা করা হবে। সরকারের লক্ষ্য শুধু সেবা দেওয়া নয়, রোগ প্রতিরোধ করা। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদার হলে জেলা ও বিভাগীয় হাসপাতালে রোগীর চাপ কমে আসবে। মানুষ ভোগান্তি ছাড়াই সেবা পাবেন।