হঠাৎ করে দেশে একের পর এক বোমা ও বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধারের ঘটনাগুলো কোনো নাটক নাকি পরিকল্পিত আতঙ্ক সৃষ্টির অপচেষ্টা তা নিয়ে সর্বত্রই প্রশ্ন উঠেছে। আইন শৃংখলা পরিস্থিতি যখন ক্রমেই স্বাভাবিক হয়ে আসছে তখন এমন খবরে জনমনে তীব্র বিতর্ক রয়েছে। রাজনৈতিক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ সন্দেহ করছেন ভারতের ইন্দনে বাংলাদেশে ফের কথিত জঙ্গী আবিস্কার’ করতে এমন করা হচ্ছে কিনা?
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কিছু ঘটনায় আসল বিস্ফোরক বা আইইডি উদ্ধারের সত্যতা নিশ্চিত করলেও, ভিন্ন কোন উদ্দেশ্যে মানুষের দৃষ্টি ঘোরানোর এবং আতঙ্ক ছড়ানোর কৌশল হিসেবে করা হচ্ছে কিনা তা তদন্ত করা অতি জরুরী। বিস্ফোরক বা আইইডি উদ্ধারের কোনো কোনো স্থানে পাওয়া বস্তু পরীক্ষায় বিস্ফোরক পাওয়া যায়নি। ফ্যাসিস্ট সরকারের সময় বোমা উদ্ধার বা বোমা হামলার ঘটনা অনেক নাটক তৈরির অভিযোগ রয়েছে কতিপয় সিটিটিসি, সোয়াত ও পুলিশসহ অন্যান্য সংস্থার কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। রাজধানীতে ১ আগস্ট একই সময়ে দুটি স্থানে বোমাতঙ্ক দেখা দেয়। পরে বোমা বিশেষজ্ঞরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নিশ্চিত হন, উদ্ধার হওয়া বস্তু দুটি বোমা নয়। তবে এর এক সপ্তাহে রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় একের পর এক বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধারের ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, হঠাৎ করে বোমা আতঙ্ক ছড়ানো হচ্ছে কেন?
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো একদিকে যেমন গুজব ও আতঙ্কের ঝুঁকি বাড়িয়েছে, অন্যদিকে প্রকৃত বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনাগুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্তের প্রয়োজনীয়তাও সামনে এনেছে। দ্রুত তদন্ত শেষ করে দায়ীদের শনাক্ত করা, প্রযুক্তিনির্ভর গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করা এবং জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি-এই তিনটি পদক্ষেপই ভবিষ্যতে সম্ভাব্য নাশকতা প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। তবে অতীতের মত পরিকল্পিতভাবে দেশে কোন জঙ্গী রয়েছে বা জঙ্গীর তৎপরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে প্রমান করতে কোন দেশী-বিদেশী চক্র প্রচার করছে কিনা তাও খতিয়ে দেখতে হবে গোয়েন্দাদের।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন দায়িত্বশীল গোয়েন্দা কর্মকর্তা ইনকিলাবকে বলেন, হঠাৎ বোমাতঙ্কের পেছনে মূলত সন্দেহজনক পরিত্যক্ত বস্তু (যেমন ব্যাগ বা বস্তা), ভুয়া তথ্য বা গুজব এবং জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টির কুপ্রবণতা কাজ করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিভ্রান্ত করা কিংবা জনবহুল এলাকায় চাঞ্চল্য তৈরি করাও এর অন্যতম উদ্দেশ্য হতে পারে। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর মধ্যে মতিঝিলে উদ্ধার হওয়া আইইডির ঘটনাকে পুলিশ সম্ভাব্য নাশকতার চেষ্টা হিসেবে তদন্ত করছে। তিনি আরও বলেন, রহস্যজনক বোমাতঙ্ক ছড়ানোর পেছনে কারা জড়িত এবং এর নেপথ্য নেটওয়ার্ক কী, তা উদ্ঘাটনে অতি জরুরী। এ বিষয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে দ্রুত নির্দেশনা দেয়া প্রয়োজন আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ শামসুল হক সাংবাদিকদের বলেন, বোমা উদ্ধারের ঘটনায় সিটিটিসিসহ পুলিশের একাধিক টিম তদন্ত করছে এবং জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে। গ্রেফতারের পরই তাদের উদ্দেশ্য, কারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত এবং কেন এ ধরনের নাশকতার চেষ্টা করা হয়েছে, তা স্পষ্ট হবে। তিনি বলেন, যে কোনো ধরনের নাশকতা মোকাবিলায় সিটিটিসি সর্বোচ্চ প্রস্তুত রয়েছে এবং উগ্রবাদী ও অন্যান্য সন্ত্রাসী সংগঠনের কার্যক্রম গোয়েন্দা নজরদারির আওতায় রাখা হয়েছে।
গত ২৪ জুলাই মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে একটি পরিত্যক্ত ছাতার ভেতর থেকে ১ থেকে ১.৫ কেজি ওজনের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন পাইপ বোমা উদ্ধার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) বোম ডিসপোজাল ইউনিট। নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে সেটি নিষ্ক্রিয় করার সময় এক পথচারী আহত হন। এর ছয়দিন পর, ৩০ জুলাই রাতে সাভারের আশুলিয়ায় একটি মুদি দোকানে ট্রাভেল ব্যাগের ভেতর রাখা প্রেসার কুকারে তৈরি করা আইইডি বোমা উদ্ধার করা হয়। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সেটি টাইমারযুক্ত ছিল এবং নির্দিষ্ট সময়ে বিস্ফোরণের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছিল। দুটি ঘটনাই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
এরই মধ্যে শনিবার মিরপুর-১০ ও ফার্মগেট মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে বোমাসদৃশ বস্তু দেখতে পেয়ে স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দেন। পরে বোম ডিসপোজাল ইউনিট পরীক্ষা করে জানায়, মিরপুরে পাওয়া বস্তুটি ছিল পান-সুপারির কৌটা এবং ফার্মগেটে পাওয়া বস্তার মধ্যে ছিল পরিত্যক্ত আবর্জনা।
সর্বশেষ রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোড এলাকায় পড়ে থাকা একটি শপিং ব্যাগ থেকে ককটেল-সদৃশ ৪টি বস্তু উদ্ধার করা হয়েছে। সোমবার রাত ১০টার দিকে বাটা সিগন্যালের কাছে নিউ মার্কেটমুখী রাস্তা থেকে উদ্ধার করা হয়। নিউ মার্কেট থানার ওসি মোহাম্মদ আইয়ুব গণমাধ্যমকে জানান, রাত ১০টা ৫ মিনিটে তারা খবর পান। তাদের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে যায় এবং টেপ দিয়ে মোড়ানো চারটি গোলাকার বস্তু দেখতে পায়। এরপর আমরা কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দলকে খবর দিই। বস্তুগুলো ককটেল নাকি অন্য কিছু, তা নিশ্চিত হতে সিটিটিসি সেগুলো পরীক্ষার জন্য নিয়ে যায় বলে জানান তিনি। মঙ্গলবার দিবাগত রাতে এ বিষয়ে সিটিটিসির প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ শামসুল হকের সাথে যোগাযোগ করা হলে এ বিষয়ে কোন তথ্য জানাতে অস্বীকার করেন। যা রহস্যজনক। তবে ডিএমপির জনসংযোগ বিভাগ থেকে জানানো হয়েছে, উদ্ধারকৃত বস্তু ককটেল ছিল। পরে সেগুলো নিস্ক্রিয় করা হয়।