Image description

বিগত দেড় দশকে ২৭ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে মর্মে অভিযোগ রয়েছে। আজকের অর্থনৈতিক সংকটের কারণ নিহিত হাসিনা জমানার এই লুটপাট-পাচার। এসব পাচারে জড়িত প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব-কর্তৃত্বেই এখন চলছে পাচার কিংবা চুরি যাওয়া অর্থ-সম্পদ (স্টোলেন অ্যাসেট) পুনরুদ্ধারের চেষ্টা। ফলে অর্থ পুনরুদ্ধারে গত দুই বছরে দেখা যায়নি সাফল্যের মুখ; বরং বৈঠক, চিঠি চালাচালি, এমএলএআর পাঠানোÑ ইত্যাদিতে অপচয় হচ্ছে আরো কিছু সরকারি অর্থ ও সময়। বিশ্লেøষকরা মনে করছেন, যে প্রক্রিয়ায় অর্থ ফেরত আনার চেষ্টা চলছে, সেটি একাধারে একটি ভুল পদ্ধতি। উপরন্তু এটি শুধু স্বার্থের সঙ্ঘাতই নয়, প্রকারান্তে দায়ী ব্যক্তিদের কৌশলে দায়মুক্তি দেয়ার চেষ্টাও বটে। আর এই ‘চেষ্টায়’ পাচার হয়ে যাওয়া অর্থের ফুটো পয়সাও ফেরত আসবে না।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ফ্যাসিস্ট ও লুটেরা হাসিনা সরকারের সময় ২৭ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। টাকাগুলো পাচার করেছেন হাসিনা পরিবারের সদস্য, আত্মীয়-স্বজন, ‘ব্যবসায়ী’ নামধারী পরিচিত হাসিনাঘনিষ্ঠ মাফিয়াচক্র, আমলা, প্রকৌশলী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ পদে থাকা ব্যক্তিরা। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যাংকঋণ নিয়ে, ভুয়া এলসির মাধ্যমে, শিল্পের কাঁচামাল আমদানির নামে ওভার-ইনভয়েসিং এবং কাঁচামাল আমদানির নামে আন্ডার-ইনভয়েসিং, হুন্ডিসহ নানা কৌশলে সংঘটিত হয়েছে এসব পাচার। মূলত হাসিনার ফ্যাসিজমকে টিকিয়ে রাখতে ব্যাংকের ভল্টগুলো খুলে দেয়া হয়েছিল। তৈরি করে দেয়া হয় যার যত ইচ্ছে লুটে নেয়ার মহা মওকা। লুণ্ঠিত সেই অর্থই অন্তত ১৫টি দেশে পাচার হয়।

পাচারের সর্বাধিক নিরাপদ পদ্ধতি ছিল বাণিজ্য-ভিত্তিক। হুন্ডি কিংবা অনানুষ্ঠানিক স্থানান্তর প্রক্রিয়ায়ও হয়েছে পাচার। গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি-জিএফআইয়ের তথ্য বলছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালে অধিকাংশ অর্থ পাচার সংঘটিত হয়েছে। কৌশলে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে ‘বাণিজ্য’কে। ফলে ঋণের অভাবে অনেক ব্যবসায়ী-শিল্পোদ্যোক্তা হাসিনার আমলে পথে বসলেও ফুলেফেঁপে ঢোল হয়েছিলেন কথিত ব্যবসায়ী অলিগার্করা। এস.আলম, সামিট, বসুন্ধরা, ওরিয়ন গ্রুপ, বেক্সিমকো, নাবিল, নাসা গ্রুপ, প্রিমিয়ার গ্রুপ, সিকদার গ্রুপ, নোমান গ্রুপ, জেমকন, আরামিট গ্রুপই কেবল আলোচনায় উঠে আসে। এর বাইরে ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি, লিজিং কোম্পানির মতো বহু নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান-পরিচালকসহ শীর্ষ কর্মকর্তারাও অর্থ পাচার করেন।

বেসরকারি ব্যাংকের মালিক, ব্যক্তি পর্যায়ে দুর্নীতিগ্রস্ত শেখ পরিবার, প্রভাবশালী মন্ত্রী, আমলা, সামরিক কর্মকর্তা, পুলিশ, প্রকৌশলীদের নাম উচ্চারিত হয়। তাদের অর্থ পাচারের কৌশল ছিল মোটামুটি একই রকম। যেমনÑ ‘ওভার-ইনভয়েস’। শিল্পের আমদানিযোগ্য কাঁচামালের মূল্য প্রকৃত মূল্যের চেয়ে কাগজ-কলমে অনেক বেশি দেখানো হতো এ ধরনের পাচারের ক্ষেত্রে। অতিরিক্ত যে টাকা, সেটি ব্যাংকিং চ্যানেলে বিদেশে বিক্রেতার কাছে চলে যেত। পরে পাচারকারী বিক্রেতার কাছ থেকে ওই অর্থ নিজের ব্যক্তিগত বৈদেশিক অ্যাকাউন্টে জমা হতো।
জিএফআইয়ের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১০ বছরে আট লাখ ৩৩ হাজার কোটির বেশি টাকা পাচার হয়েছে ওভার-ইনভয়েসের মাধ্যমে। আন্ডার-ইনভয়েসের মাধ্যমেও পাচার হয়েছে বিপুল অর্থ। পণ্য রফতানির সময় প্রকৃত মূল্যের চেয়ে কাগজ-কলমে অনেক কম মূল্য দেখায় পাচারকারী প্রতিষ্ঠান। পণ্যের অতিরিক্ত টাকা আমদানিকারক সরাসরি বিদেশে পাচারকারীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা করতেন। এ ক্ষেত্রে রফতানি পণ্যের মূল্য কম দেখিয়ে শুধু অর্থই পাচার করা হয়নি। আমদানি শুল্কও ফাঁকি দিয়ে ওই অর্থ রাখা হয়েছে বিদেশের অ্যাকাউন্টে।

পাচারের আরেকটি কৌশল ছিল কোনো পণ্য আমদানি বা রফতানি না করেই ভুয়া চালানে ব্যাংকের মাধ্যমে সরাসরি বিদেশে টাকা পাঠিয়ে দেয়া। পণ্যের ভুল বিবরণ বা মিথ্যা ডিক্লারেশনের মাধ্যমে কম দামি পণ্য আমদানি করে নথিতে ‘অতি মূল্যবান পণ্য’ হিসেবে ডিক্লার করে অর্থ পাচার। হুন্ডির মাধ্যমে সরাসরি অর্থ পাচার হচ্ছে ব্যক্তি পর্যায়ের বহুল প্রচলিত অপ্রাতিষ্ঠানিক কৌশল। এ ক্ষেত্রে ধরার মতো আনুষ্ঠানিক কোনো নথিও থাকে না। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডির তথ্যমতে, বছরে ৭ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে হুন্ডির মাধ্যমে। রকেট, বিকাশ, নগদ, উপায়সহ বিভিন্ন মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস-এমএফএসের মাধ্যমে এই পাচারের সঙ্গে অন্তত পাঁচ হাজার এজেন্ট হুন্ডিচক্রের সাথে জড়িত। বিশ্বের ১৫টি দেশ হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাচারের প্রধান গন্তব্য।

‘শেল কোম্পানি’র মাধ্যমে পাচার হয়েছে অপরিমেয় অর্থ। কাগজ-কলমে অস্তিত্ব রয়েছে, বাস্তবে অস্তিত্ব নেই। এমন কিছু কাগুজে প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করা হয়েছে যেগুলোর কোনো ব্যবসায়িক কার্যক্রম নেই। অফিসে কেনো কর্মচারী নেই। শুধু অর্থ পাচারের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয় ‘শেল কোম্পানি’ কৌশল। এ ছাড়া বেনামি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পাচার করা হয় অর্থ। সে ক্ষেত্রে ‘ট্যাক্স হ্যাভেন’ বা ‘কর স্বর্গ’ হিসেবে পরিচিত কেম্যান দ্বীপপুঞ্জ, ব্রিটিশ ভার্জিন লাইল্যান্ডস অঞ্চলে এ ধরনের বেনামি প্রতিষ্ঠান অর্থের বিনিময়ে টাকা পাচারে সহযোগিতা করে। সে ক্ষেত্রে প্রকৃত মালিকের পরিচয় গোপন রেখে অবৈধ অর্থ বেনামি কোম্পানিগুলো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ব্যাংক অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করে সেটি ‘বৈধ সম্পদ’ হিসেবে দেখানো হয়।

‘অফশোর অ্যাকাউন্ট’ বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের আরেকটি কৌশল। এ ক্ষেত্রে কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করে কিছু বিদেশি ব্যাংকে বেনামে, কখনো বা ট্রাস্টের নামে অ্যাকাউন্ট খুলে অর্থ জমা করেন পাচারকারীরা।
‘ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ডিজিটাল মাধ্যম’ অর্থ পাচারের অত্যাধুনিক কৌশল। এ ক্ষেত্রে ‘বিট কয়েন’ বা অন্যান্য ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে ‘ব্লকচেইন’ প্রযুক্তিতে সারা বিশ্বে অর্থ পাঠানো হয়। এতে বড় সুবিধা হচ্ছেÑ এন্টি-মানিলন্ডারিং সংস্থাগুলো অপরাধীদের সহজে শনাক্ত করতে পারে না।

আরেকটি হচ্ছে সরাসরি ‘ফিজিক্যাল ক্যাশ’ কিংবা মূল্যবান ধাতবÑ সোনা-রুপা বা কার্গোর মাধ্যমে লুকিয়ে পাচার করা। পাচারকৃত এই অর্থ বহুস্তর (লেয়ারিং) সৃষ্টি করে গন্তব্য দেশগুলোতে বিনিয়োগ করা হয়েছে। সেই অর্থে এখন পালিয়ে যাওয়া হাসিনা পরিবারের সব সদস্য, ব্যবসায়ী, অলিগার্ক ও কর্মকর্তারা পলাতক থেকেও যাপন করছেন আয়েশী জীবন।

চব্বিশের ৫ আগস্ট হাসিনার উৎখাতের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার হাসিনা জমানায় চুরি এবং পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগ নেয়। চব্বিশের ১৪ ডিসেম্বর দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নেতৃত্বে গঠন করা হয় জয়েন্ট ইনভেস্টিগেশন টিম-জেআইটি। আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্সের অধীনে কার্যক্রম শুরু করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডি, এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল-সিআইসি এবং কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর-সিআইআইডি। জেআইটির কার্যপরিধি নির্ধারণ করা হয় হাসিনাঘনিষ্ঠ কয়েকটি শিল্পপরিবার পর্যন্ত। উদ্দেশ্য, ব্যবসায়ী গ্রুপের মাধ্যমে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ-সম্পদ ফেরত আনা। অন্যদিকে এর আগে একই বছর ২৯ সেপ্টেম্বর পুনর্গঠন করা হয় ‘ইন্টার এজেন্সি টাস্কফোর্স অন স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট’ নামক একটি সংস্থা।

পাচার হওয়া অর্থ-সম্পদ দেশে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে এই টাস্কফোর্স পুনর্গঠন করে। বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট-বিএফআইইউ, দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডি, কাস্টমস ইন্টেলিজেন্স, আইন ও বিচার বিভাগ এবং পররাষ্ট্র মন্দ্রণালয়সহ ৯টি প্রতিষ্ঠান টাস্কফোর্সটির সদস্য। পদাধিকারবলে টাস্কফোর্সটির চেয়ারম্যান করা হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে। হাসিনার জমানায়ও (২০১৩ সালে) এমন একটি টাস্কফোর্স ছিল। পদাধিকার বলে সেটির নেতৃত্বে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল। তখন বিষয়টি এমন হয়ে গিয়েছিল যে, যার সহযোগিতায় অর্থপাচার হচ্ছিলÑ তিনিই হয়ে গিয়েছিলেন টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নেতৃত্বে ১১ দফতরের সমন্বয়ে গঠিত ‘ইন্টার এজেন্সি টাস্কফোর্স অন স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট’ দুই বছর ধরে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার চেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু গত দুই বছরে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার ফলাফল এখন পর্যন্ত শূন্য।

যদিও টাস্কফোর্স দাবি করছে, আদালত এবং টাস্কফোর্সের নির্দেশে দেশ-বিদেশে এ যাবত ১০ হাজার ৪০৮ কোটি টাকাসহ ৬৬ হাজার কোটি টাকার বেশি সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। অগ্রাধিকার মামলার তদন্তের জন্য ১১টি যৌথ তদন্ত কাজ করছে। পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিষ্ঠান ও অ্যাসেট রিকভারি ফার্মের সঙ্গে ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে চুক্তি ও এনডিএ স্বাক্ষর হয়েছে। রিকভারি ফার্মের মাধ্যমে যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশের আদালতের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা সম্পদ জব্দের আদেশ চাওয়া হয়েছে। মানি লন্ডারিংয়ের বেশ কয়েকটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করা হয়েছে।

তাত্ত্বিক অগ্রগতি, আত্মতুষ্টির ফানুস ও অনিশ্চিত ফলাফল : উপরোক্ত ‘অগ্রগতি’গুলো এখন পর্যন্ত তাত্ত্বিক। একটি কানাকড়িও ফেরত আসার উপক্রম হয়নি। যা হয়েছে তা হচ্ছে কার ওপর কে কর্তৃত্ব করবে। কোন সংস্থা ‘লিড’ দেবে, এ নিয়ে মিটিং-সভা, ফাইল চালাচালি। বিশ্লেষকরা বলছেন, একটি মিস কনসেপশনের ভিত্তিতে স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারির ঢোল-নাকাড়া পেটানো হচ্ছে। তাদের মতে, এটি কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট। অর্থ পাচারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের দায় রয়েছে। তাই এ প্রতিষ্ঠান ‘ইন্টার এজেন্সি টাস্কফোর্স অন স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট’-এর সদস্য হতে পারে না। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের জড়িত কর্মকর্তাদের মামলায় আসামি করা কঠিন হয়ে পড়বে। হাসিনার জমানায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সঠিক দায়িত্বটি পালন করলে অর্থই পাচার হতো না। আওয়ামী জমানায় গভর্নরদের নিষ্ক্রিয়তা কিংবা মৌন সম্মতিতেই পাচার হয়েছে অর্থ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্র্নর ছিলেন ড. আহসান এইচ মনসুর। তার কনসালট্যান্ট হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল ফারহানুল গণি চৌধুরীকে। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো: মোস্তাকুর রহমান এফসিএমএ। গভর্ণরের পরিবর্তন হলেও কনসালট্যান্ট হিসেবে রয়ে গেছেন ফারহানুল গনি। গভর্নরের কনসালট্যান্ট হলেও তিনি ছড়ি ঘোরাচ্ছেন টাস্কফোর্স অন স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট’ এ। তিনি প্রায় প্রতিটি মিটিংয়ে উপস্থিত থাকছেন এবং তদন্তাধীন অনেক স্পর্শকাতর, গোপন নথি এবং তথ্য-উপাত্তের ওপর মতামত দিচ্ছেন। এতে অর্থ পাচারের গুরুতর অভিযোগের মামলাগুলোর বিচারে চ্যালেঞ্জ হতে পারে। তার অযাচিত হস্তক্ষেপ অর্থ পাচারী-অভিযুক্তদের হাতে মামলাগুলো চ্যালেঞ্জ করার অস্ত্র তুলে দেবে। স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি দূরে থাক, উল্টো মামলাগুলোই দুর্বল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, কোনো ধরনের জয়েন্ট টাস্কফোর্স গঠন হওয়ার আগেই ‘তফসিলভুক্ত অপরাধ’ হিসেবে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক এসব তদন্ত শুরু করে। যৌথ টাস্কফোর্স গঠনের মাধ্যমে আরেকটি সমান্তরাল সংস্থার সৃষ্টি করা হয়েছে। যৌথ টাস্কফোর্সের কর্তৃত্বও দেয়া হয়েছে পাচার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের হাতে। যা পদে পদে চ্যালেঞ্জযোগ্য। তবে বিশ্লেষকরা এটিও মনে করছেন, যৌথ টাস্কফোর্স গঠিত হলেও তেমন অসুবিধা ছিল না। যদি নিয়ন্ত্রণটি থাকত দুদকের হাতে। তেমনটি না হওয়ায় যৌথ টাস্কফোর্সের নেতৃত্বদানকারী বাংলাদেশ ব্যাংক ভবনের ভেতর চলছে স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি মামলার তদন্ত। এটিও আইনি লড়াইয়ে পাচারকারীদের হাতে আরেকটি অস্ত্র তুলে দেয়া। যৌথ টাস্কফোর্স গঠনের পক্ষে যুক্তি হচ্ছেÑ পাচার হওয়া ঢাকা ফেরত আনতে অর্থ বিভাগের আওতায় স্বতন্ত্র কাঠামো তৈরি করতে হবে। কিন্তু সেটি প্রতিষ্ঠা হলে পাচারকারীরা শুরুতেই একটি অলিখিত ইনডেমনিটি পেয়ে যাবে। এছাড়া পেশাদার ও বিষেশায়িত তদন্ত সংস্থা দুদক এবং সিআইডির হাতে কর্তৃত্ব না দিয়ে প্যারালাল প্রতিষ্ঠান প্রমাণ করতে চায়, দুদক-সিআইডি ব্যর্থ। এ প্রশ্নে বিশ্লেষকদের জিজ্ঞাসাÑ অর্থ পাচারকারী অলিগার্করাই এ সমান্তরাল প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার নেপথ্যে রয়েছে কি-না।

কারণ তদন্ত সংস্থাকেই মূল ভূমিকায় রাখতে হবে। তথ্য-উপাত্ত দিয়ে বিচারে তাদেরকেই প্রমাণ করতে হবে অর্থ পাচারের অভিযোগ। পক্ষান্তরে দেশের বিদ্যমান ফৌজদারি আইনে যৌথ টাস্কফোর্সের আইনি কাঠামো নেই। নিজস্ব দক্ষ জনবল নেই। প্রসিকিউশন ইউনিট নেই। নেই অনুসন্ধান-তদন্ত এবং বিচার মোকাবিলার অভিজ্ঞতাও। এসব ছাড়া গায়ের জোরে অর্থ পাচারের মতো গুরুতর অপরাধের মামলা ও তদন্ত করলে ফলাফল কী হতে পারেÑ ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী সময়ে গঠিত ‘গুরুতর অপরাধ দমন অভিযান সংক্রান্ত টাস্কফোর্স’ এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ওই টাস্কফোসের কোনো মামলায় উচ্চ আদালতে টেকেনি। আপিল বিভাগ দ্বারা চূড়ান্তভাবে কেউ অভিযুক্তও হয়নি। এছাড়া অর্থ পাচারকারীদের পক্ষে মোটা অঙ্কের ফি দিয়ে রাখা বাঘা বাঘা আইনজীবীর কাছে যৌথ টাক্সফোর্স আদালতে দ্রুতই পরাস্ত হবে।

দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদকের সাবেক সিনিয়র আইনজীবী দেলোয়ার হোসেন চৌধুরী বলেন, যারা দায়ী তাদের হাতেই স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারির দায়িত্ব। কতটা সাফল্য আসবে সন্দিহান। পাচারের সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন ব্যাংক। সকল ব্যাংকের নিয়ন্ত্রক সংস্থা কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অন্যদিকে পাচারের সঙ্গে জড়িত কাস্টমস, ভ্যাট, ট্যাক্স ও পোর্ট অথরিটি। এদের পরস্পর যোগসাজশ ছাড়া একটি টাকাও পাচার সম্ভব নয়। অথচ তাদেরকে মামলার আওতার বাইরে দাখিল করা হয় চার্জশিট। এখন আবার বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতৃত্বেই নাকি চলছে ‘স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি’ কার্যক্রম। এটি টোটালি ভুল প্রক্রিয়া। বিশেষায়িত তদন্ত সংস্থা-দুদক আইনগতভাবে যথেষ্ট শক্তিশালী। বাংলাদেশ ব্যাংকসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলো দুদককে বরং নানাভাবে সহযোগিতা দিতে পারে। মূল ভূমিকা পালন করতে পারে না। গায়ের জোরে সেটি করলে বিচারে সুফল আসবে না। পাচার হওয়া অর্থের একটি কানাকড়িও ফেরত আনা সম্ভব হবে না।

প্রায় অভিন্ন অভিমত দেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদও। তিনি বলেন, পাচার করা টাকার অংকটি নির্ধারিত হলো কিসের ভিত্তিতে? আগে পাচার হওয়া অর্থের সঠিক হিসাবটা বের করা জরুরি। তিনি বলেন, অঙ্ক যা-ই হোক, অর্থ পাচার হয়েছে, এটি সত্যি। কিন্তু সেই টাকা ফেরত আনার কথা একটি রাজনৈতিক বক্তব্য মাত্র। কারণ পাচারকৃত অর্থের গন্তব্য দেশগুলো বিভিন্ন ধরনের অফার দিয়ে অর্থগুলো ওই দেশে বিনিয়োগ করেছে। এটি ওই দেশের সরকারের পলিসির আওতায় পাচারকারীরা এটি করেছে। এই টাকা কি সংশ্লিষ্ট দেশগুলো ফেরত দিয়ে দেবে? এটি একটি চটকদার বক্তব্য। পাচারকৃত অর্থ ফেরত এনে দেশের অর্থর্নীতি চাঙ্গা করবেন, এমন বক্তব্য ড. ইউনূস সরকারও দিয়েছিল। এখন কোথায় সেই টাকা? ‘স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি’ কিংবা অন্যকোনো নামে সুনির্দিষ্ট কিছু হচ্ছে বলে আমার মনে হয় না।