Image description

যুক্তরাষ্ট্রের পর এবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারেও বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি প্রতিযোগিতার দৌড়ে পিছিয়ে পড়ছে। ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে ইইউতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৬.৪৩ শতাংশ কমে ৮.৬৪ বিলিয়ন ইউরোতে নেমে এসেছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় অর্ধেকই আসে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে। ফলে এই গুরুত্বপূর্ণ বাজারে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়া রপ্তানি খাতের জন্য নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

ইইউ’র সামগ্রিক পোশাক আমদানির বাজার সংকুচিত হওয়ায় বাংলাদেশের রপ্তানিতে এই ধাক্কা লেগেছে বলে মনে করেন তারা।
ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি-জুন মাসের মধ্যে ইইউতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি ১৬.৪৩ শতাংশ কমে ৮.৬৪ বিলিয়ন ইউরোতে নেমেছে। ছয় মাসে কমেছে প্রায় ১.৭০ বিলিয়ন ইউরো। গত বছর একই সময়ে ১০.৩৪ বিলিয়ন ইউরো আয় করেছিল। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ১৬.৪৩ শতাংশ পতন বৈশ্বিক গড় পতনের তুলনায় প্রায় ৬.৭৩ শতাংশ পয়েন্ট বেশি।
অন্যদিকে, তালিকায় থাকা প্রধান প্রধান সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে চীনের রপ্তানি ৮.৮৮ শতাংশ কমে ১২.৯৭ বিলিয়ন থেকে ১১.৮২ বিলিয়ন ইউরো হয়েছে। তুরস্কের রপ্তানি ১৪.৬০ শতাংশ কমে ৪.২৭ বিলিয়ন থেকে ৩.৬৫ বিলিয়ন ইউরো এবং ভারতের রপ্তানি ১২.৪৯ শতাংশ কমে ২.৭০ বিলিয়ন থেকে ২.৩৬ বিলিয়ন ইউরো হয়েছে।

তবে, ভিয়েতনাম তুলনামূলকভাবে ভালো করেছে। দেশটির রপ্তানি ২০২৫ সালের ২.০৬ বিলিয়ন ইউরো থেকে সামান্য বেড়ে ২০২৬ সালের জানুয়ারি-জুনে ২.০৭ বিলিয়ন ইউরো হয়েছে, যা ০.৩৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি। কম্বোডিয়া, পাকিস্তান, মরক্কো, শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়াসহ অন্যান্য সরবরাহকারী দেশের রপ্তানিও কমেছে।
সামগ্রিকভাবে, জানুয়ারি-জুন মাসের মধ্যে ইউরোপীয় বাজারে বিশ্বের শীর্ষ পোশাক সরবরাহকারী দেশগুলোর রপ্তানিতে বড় ধরনের চাপ দেখা গেছে। ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় বিশ্ব থেকে ইইউ’র পোশাক আমদানি কমেছে ৯.৭০ শতাংশ এবং আমদানি দাঁড়িয়েছে ৪১.১০ বিলিয়ন ইউরোতে।
এদিকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি-জুলাই সময়ে বাংলাদেশ থেকে ইইউতে রপ্তানি করা প্রতি কেজি পোশাকের মূল্য আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮.৯৪ শতাংশ কমেছে। বিপরীতে, একই সময়ে বিশ্ববাজার থেকে ইইউ’র পোশাক আমদানির গড় মূল্য কমেছে ৩.৫৩ শতাংশ।

এই ব্যবধান বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ওপর বাড়তি চাপের ইঙ্গিত। অর্থাৎ, বৈশ্বিক বাজারে পোশাকের মূল্য কমলেও বাংলাদেশের পণ্যের ইউনিট মূল্যে পতন হয়েছে বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এতে একদিকে রপ্তানিকারকদের আয় ও মুনাফার ওপর চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের পণ্যের মূল্য ও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগীদের মধ্যে ভিয়েতনাম এক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখিয়েছে। 

‘আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদার পরিবর্তন, ক্রেতাদের সোর্সিং কৌশলে পরিবর্তন, চীন ও ভিয়েতনামের বাড়তি প্রতিযোগিতা এবং বিভিন্ন দেশের বাণিজ্য সুবিধা বাংলাদেশের ওপর বাহ্যিক চাপ বাড়িয়েছে। পাশাপাশি দেশের ভেতরে জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা, আর্থিক খাতের দুর্বলতা এবং ব্যবসার পরিবেশের নানা সীমাবদ্ধতা রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে।’ বৈশ্বিক চাহিদার পরিবর্তনের পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি সংকট, সরবরাহ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা এবং বাণিজ্য সুবিধার পার্থক্যÑসব মিলিয়ে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের ওপর চাপ আরও বাড়ছে।

বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বাংলাদেশে পোশাকের রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়ার পেছনে এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে উত্তরণের অনিশ্চয়তা, তীব্র জ্বালানি সংকট, আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক ক্রেতাদের সোর্সিং কৌশলে পরিবর্তনÑসবক’টি বিষয়ই একসঙ্গে কাজ করছে।
সিপিডি বিশেষ ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদার পরিবর্তন, ক্রেতাদের সোর্সিং কৌশলে পরিবর্তন, চীন ও ভিয়েতনামের বাড়তি প্রতিযোগিতা এবং বিভিন্ন দেশের বাণিজ্য সুবিধা বাংলাদেশের ওপর বাহ্যিক চাপ বাড়িয়েছে। এর পাশাপাশি দেশের ভেতরে জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা, আর্থিক খাতের দুর্বলতা এবং ব্যবসার পরিবেশের নানা সীমাবদ্ধতা রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে।