‘অহংকার পতনের মূল’ চিরন্তন সত্য প্রবাদটি ভারতের জন্য যুৎসই উদাহরণ হয়ে উঠেছে। বড় দেশের অহংকারে দিল্লির সাউথ ব্লক ও ভারতের থিঙ্কট্যাঙ্করা আয়তনে ছোট দেশ বাংলাদেশকে পাত্তাই দেননি। যার কারণে গত ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট হাসিনার ভার্চ্যুয়ালি সংবাদ সম্মেলন ইস্যুতে ঢাকার অনুরোধকে পাত্তা দেয়নি হিন্দুত্ববাদী ভারত। ‘বেসরকারি আয়োজক সরকারের হাত নেই’ বক্তব্য দিয়েছে। বিপরীতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এতো কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখাবে সেটা বিজেপির শাসকদের চিন্তায় আসেনি। মৃত্যুদ-প্রাপ্ত হাসিনাকে বক্তব্য দিতে দিয়ে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে দিল্লি ‘ব্যাকফুটে’ চলে গেছে।
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নরেন্দ্র মোদির অভিনন্দন জানানোর পরও তারেক রহমান বিদেশ সফরে দিল্লির অনুরোধ উপেক্ষা করে মালয়েশিয়া ও চীন সফর করেন। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিংপির সঙ্গে একান্তে বৈঠক এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর নিয়ে অগ্রসর হন। অথচ ভারত হাসিনা ইস্যুতে বাংলাদেশের প্রত্যাশাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে আক্রমণাত্মক কথাবার্তা বলে বাংলাদেশের মানুষকে বিক্ষুব্ধের পাশাপাশি ভারতের সাধারণ মানুষকে ক্ষুব্ধ করে তোলে।
একজন পরিত্যক্ত নেত্রী হাসিনার জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে সাপে-নেউলে সম্পর্কের ঘোর বিরোধী ভারতের মানুষ। কিন্তু হিন্দুত্ববাদী মোদি গংদের আক্রমণাত্মক কার্যক্রম, সীমান্তে ‘পুশইন’ বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের দূরত্ব বাড়িয়ে দেয়। ভারতের বেশির ভাগ গণমাধ্যমের সম্পাদকীয়তে তীব্র ভাষায় দিল্লির থিঙ্কট্যাঙ্কদের অদূরদর্শী-আক্রমণাত্মক কর্মকা-কে দায়ী করেছে। বাধ্য হয়ে ভারতের শাসকরা এখন মরিয়া হয়ে উঠেছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দিল্লি সফরে নিতে। যার জন্য ঢাকায় কর্মরত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর ঢাকা-দিল্লি দৌড়ঝাঁপ করেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করেই বিকেলে দিল্লী ছুটে গিয়ে মোদিকে বার্তা দেন।
পরের দিন দিল্লি থেকে ফের ঢাকায় ফিরে আসেন। ভারতের বাহ্যিক গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং (র) প্রধান পরাগ জৈনের ঢাকা সফর করে তারেক রহমানের দিল্লি সফরে রাজী করানোর চেষ্টা করেন। ঢাকা জানিয়ে দিয়েছে মৃত্যুদ-প্রাপ্ত শেখ হাসিনা আর শহীদ ওসমান হাদির খুনিদের ঢাকার হাতে তুলে না দিলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারত যাবেন না। ভারতের মুখের উপর এমন জবাব এই প্রথম বাংলাদেশের কোনো প্রধানমন্ত্রীকে করতে দেশবাসী দেখলো। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন এবং নরেন্দ্র মোদির দুই দফায় আমন্ত্রণের পর তারেক রহমানের এমন সিদ্ধান্তে দেশবাসী দারুণ খুশি।
বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কের ইস্যুতে দিল্লির নীতি নির্ধারকরা দেশের ভিতরে চাপের মুখে পড়েছেন। তাই সম্পর্ক উন্নয়নে যেভাবেই হোক বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দিল্লি সফরে নিতে মরিয়া দিল্লি। এ নিয়ে দিল্লির পক্ষে যুক্তরাষ্ট্র দূতিয়ালি করছে ঢাকার নীতি নির্ধারকদের মন গলাতে। তারেক রহমানকে দিল্লি সফরে নিতে না পারলে কূটনৈতিক দৌড়ে পিছিয়ে পড়বে, দেরিতে হলেও বুঝে গেছে ভারত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক শিক্ষক প্রফেসর ড. শাহাদুজ্জামান বলেছেন, ‘তিস্তা মহাপ্রকল্প বাস্তবায়ন অপরিহার্য।
চীন-মিয়ারনমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর নিয়ে তিন দেশ যখন এগিয়ে যাচ্ছে তখন সেটা বাস্তবায়নের আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিল্লি সফরে যাওয়া উচিত হবে না’। বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ‘ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কেমন হবে সেটা নিরূপণ হওয়ার আগে পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফর করা উচিৎ নয়। ভারত সরকারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সমর্থনে গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে প্রেস কনফারেন্স করেছেন শেখ হাসিনা। ওই প্রেস কনফারেন্স বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ছিল’।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দিল্লি সফরে নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে ভারতের নীতি নির্ধারকরা। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের গভীর সম্পর্কের মধ্যে ঢাকা-দিল্লির দূরত্ব ভারতের আগামীর রাজনীতি, সার্বভৌমত্ব শঙ্কায় ফেলতে পারে। সে জন্য দিল্লির থিঙ্কট্যাঙ্করা যে কোনো মূল্যে তারেক রহমানকে দিল্লি নিতে চায়। এ জন্য দুই দফায় তারেক রহমানকে নরেন্দ্র মোদির পক্ষ থেকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ঢাকায় কর্মরত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী ১৬ আগস্ট বলেছেন, ‘বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর উচিত ভারত সফর করা। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক।
দুটিই সার্বভৌম দেশ। দুই দেশেরই নিজেদের সমস্যা, মতপার্থক্য ও বিরোধ আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব। মতপার্থক্য ও তর্ক-বিতর্ক আছে। দুই দেশকে পারস্পরিক সম্মান ও মর্যাদা বজায় রেখে অভিন্ন লক্ষ্য অর্জনে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তারেক রহমান ও নরেন্দ্র মোদি বৈঠকে বসলে অনেক অমীমাংসিত বিষয় সমাধানের পথ তৈরি হবে’। এর জবাবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ও জনকূটনীতি অনুবিভাগের অতিরিক্ত পররাষ্ট্র সচিব একেএম শহীদুল করিম জানিয়েছেন, তিন শর্তে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারত সফরে যেতে পারেন। এক, শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে দেয়া; দুই, ওসমান হাদির হত্যায় অভিযুক্তদের প্রত্যর্পণ; এবং তিন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফরের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্র্যাইবুনাল মানবতাবিরোধী অপরাধে শেখ হাসিনাসহ কয়েকজন অপরাধীর মৃত্যুদ- দিয়েছে। মৃত্যুদ-ের পর বিগত অন্তর্বর্তী সরকার ২০১৩ সালের বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে দিল্লির কাছে চিঠি দেয়। শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে দুই বার এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মৃত্যুদ-প্রাপ্ত আসাদুজ্জামান খান কামালকে ফেরত চেয়ে একটি চিঠি দিয়েছে। দিল্লি সে চিঠিগুলো নিয়ে পর্যালোচনা করছে বলে জানিয়েছে। তবে মাঝপথে হিন্দুত্ববাদী মোদি সরকার শেখ হাসিনাকে তৃতীয় কোনো দেশে পাঠানোর চেষ্টা করলেও হাসিনা যাননি। এখন বাংলাদেশ শেখ হাসিনাকে ফেরত না দেয়া হলে দিল্লি-ঢাকার সম্পর্ক স্বাভাবিক হবে না। রাজনৈতিক স্ট্যা-বাজি করে শেখ হাসিনা নিজেও ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন।
হাসিনা ডিসেম্বরে ঢাকায় না ফিরলে রাজনৈতিকভাবে ফের পরাজিত হবেন। শুধু তাই নয়, ভারতের সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এক খবরে বলা হয়েছে, পতিত ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা এবং সাবেক সংসদ সদস্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে জানিয়েছেন, শেখ হাসিনা মাঝে মধ্যে বাংলাদেশে অবস্থানরত দলের ক্যাডারদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাদের আন্দোলন, সন্ত্রাস করার প্ররোচনা দেন। দিল্লি ও কোলকাতার কূটনীতিক ও বুদ্ধিজীবীরা মন্তব্য করেছেন যে, দিল্লিতে অবস্থানরত মৃত্যুদ-ে দ-িত শেখ হাসিনার রাজনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত থাকলে ঢাকা-দিল্লির সম্পর্কের ইতিবাচক উদ্যোগে ব্যাঘাত ঘটবে।
এর মধ্যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী সাক্ষাৎ করলে তারা ২০১৩ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী সব নথি যুক্ত করেই বাংলাদেশ মানবতাবিরোধী অপরাধে দ-িত হাসিনাকে ফেরত চেয়েছে। ফলে হাসিনা হয়ে পড়েছে ভারতের কলার কাঁটা। এর মধ্যেই শেখ হাসিনাকে রক্ষা করতে চাণক্যনীতি গ্রহণ করেছে দিল্লি। তারা ভারতের আদালতের ঘাড়ে বন্দুক রেখে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের হাতে তুলে দেয়া ঠেকাতে চায়।
গত ১৬ আগস্ট ভারতের গণমাধ্যমগুলোর এক খবরে জানানো হয়, শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের সিদ্ধান্ত নেবে ভারতের আদালত। এটি রাজনীতি বা কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের বাইরে বলে জানিয়েছেন ভারত সরকারের এক শীর্ষ কর্মকর্তা। ওই কর্মকর্তা বলেছেন, ‘প্রত্যর্পণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে ভারতের আদালত। এটি কোনো কূটনৈতিক অথবা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হবে না। আদালতে প্রমাণিত হতে হবে যে বাংলাদেশে শেখ হাসিনা যে অপরাধ সংঘটিত করেছেন সেগুলো ভারতের আইন অনুযায়ীও অপরাধ কি না?’
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের গতি বেড়ে যাওয়ায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে ভারত। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশিদের ভিসা বন্ধ করে দিয়ে ঢাকাকে বিপদে ফেলতে চেয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ ভারতের বদলে চিকিৎসা ও ভ্রমণে চীন, থাইল্যান্ড, সিংগাপুরমুখী হলে কোলকাতার ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। প্রায় দুই বছর পর ভিসা চালু করায় কোলকাতার ব্যবসায়ীরা দারুণ খুশি।
ফলে দেশটির নীতি নির্ধারকরা মনে করছেন, হাসিনা ইস্যুতে ঢাকার সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি অব্যাহত থাকলে দুই দেশের ক্ষতি। তাছাড়া চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ করিডোর এবং তিস্তা মহাপ্রকল্পের গতি ত্বরান্বিত হলে শিলিগুড়ির ‘চিকেন নেক’ হুমকির মুখে পড়তে পারে। ফলে ঢাকার সঙ্গে দিল্লির সম্পর্ক উন্নয়ন অপরিহার্য। ১৬ আগস্টের দ্য হিন্দুর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর দ্রুত বাস্তবায়নে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে নয়াদিল্লি।
সম্পর্ক পূর্ণাঙ্গভাবে স্বাভাবিক করার লক্ষ্য নিয়ে চলতি আগস্টের শেষ কিংবা আগামী সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহের মধ্যেই এই সফর আয়োজনে ঢাকার সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ভারতীয় কূটনীতিকরা এ বিষয়ে আশাবাদ প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, খুব শিগগিরই হয়তো ঢাকা থেকে সুখবর আসতে পারে। তারেক রহমান দিল্লি গেলে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি নবায়ন, জ্বালানি সংক্রান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন এবং ২০২৫ সালে বাংলাদেশের বিভিন্ন পণ্যের ওপর দেয়া ভারতীয় বাণিজ্য বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল কৈফিয়ত দিয়ে জানান, ‘হাসিনার ওই কর্মসূচির সাথে ভারত সরকারের কোনো সম্পর্ক ছিল না এবং তার কোনো বক্তব্য দিল্লি সমর্থন করেন না’। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এর প্রধান পরাগ জৈন বাংলাদেশ সফরে এসে এবং হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে বার্তা দেন যে, ‘হাসিনা ইস্যুতে আটকে না থেকে’ দুই দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন, ভিসা সুবিধা ও বাণিজ্যিক অচলাবস্থা কাটানোর লক্ষ্যে দ্রুত দ্বিপক্ষীয় সফর সম্পন্ন করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। তবে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীরা বলছেন, হাসিনাকে ফেরত দেয়া ইস্যুর সমাধান না হলে তারেক রহমানের দিল্লি সফরে যাওয়া উচিত হবে না।