ঘরে তালা মারা, পরিবার নিয়ে পুরো জুলাই মাস ছিলেন ঢাকায়—তবুও বিদ্যুৎ বিল এসেছে ৩ হাজার ১০০ টাকা। ভুক্তভোগী শুধু শিলা মমতাজই নন, নর্দার্ন ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেডের (নেসকো) ঠাকুরগাঁও কার্যালয়ের উদাসীনতা ও ‘ভূতুড়ে’ বিলে অতিষ্ঠ জেলার প্রায় ৪০ হাজার গ্রাহক। অফিসে ধরনা দিয়েও মিলছে না সুরাহা, উল্টো বিল সংশোধনের দাবি জানালে দেওয়া হচ্ছে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার হুমকি।
গ্রাহকদের অভিযোগ, প্রতি মাসে বাড়ি বাড়ি গিয়ে মিটারের বর্তমান রিডিং দেখে বিল করার কথা থাকলেও বাস্তবে মিটার রিডারদের দেখাই মেলে না। মনগড়া ইউনিট বসিয়ে কয়েক মাস যাওয়ার পর হঠাৎ বকেয়া ইউনিট একসঙ্গে এক বা দুই মাসের বিলে যুক্ত করে দেওয়া হচ্ছে। এতে গ্রাহক উচ্চমূল্যের ইউনিটের ফ্রেমে আটকে যাচ্ছেন এবং তাদের পকেট থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ অর্থ।
পৌরসভার হাজীপাড়ার বাসিন্দা শিলা মমতাজ লিপি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘গত জুলাই মাসে পরিবার নিয়ে ঢাকায় ছিলাম, বাসায় কোনো বিদ্যুৎ ব্যবহারই হয়নি। তবুও আগের মাসের মতো ৩ হাজার ১০০ টাকা বিল পাঠানো হয়েছে। বারবার অভিযোগ করেও প্রতিকার পাইনি, উল্টো বিল না দিলে নাকি লাইন কেটে দেওয়া হবে!’
মিটার না দেখেই বিল দেওয়ার অভিযোগ
সাধারণত মিটার রিডার গ্রাহকের মিটারের বর্তমান রিডিং সংগ্রহ করেন। আগের মাসের রিডিং বাদ দিয়ে ওই মাসে ব্যবহৃত ইউনিট নির্ধারণ করা হয়। পরে নির্ধারিত স্ল্যাব অনুযায়ী বিল তৈরি করা হয়। এর সঙ্গে ভ্যাট ও ডিমান্ড চার্জ যুক্ত হয়। গ্রাহকদের অভিযোগ, বাস্তবে মিটার না দেখে অনুমাননির্ভর রিডিং বসানোর কারণে ব্যবহৃত ইউনিটের সঙ্গে বিলের হিসাব মিলছে না। কয়েক মাস পর মিটার দেখে আগের ঘাটতি ইউনিট একসঙ্গে যুক্ত করা হলে কোনো কোনো মাসে বিল অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়।
পৌরসভার গোয়ালপাড়ার বাসিন্দা নয়ন বলেন, ‘মিটার রিডাররা নিয়মিত মিটার দেখেন না। খেয়ালখুশিমতো বিলের ইউনিট বসান। পরে কয়েক মাসের জমে থাকা ইউনিট এক মাস বা দুই মাসের বিলে যুক্ত করেন। গত কয়েক মাস ধরে আমাকে দ্বিগুণ বিল দিতে হচ্ছে। বিল না দিলে লাইন বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হচ্ছে।’
আশ্রমপাড়ার বাসিন্দা আশা আক্তারও একই ধরনের অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, ‘মিটার না দেখেই বিল দেওয়া হচ্ছে। মিটারের রিডিংয়ের সঙ্গে বিলের কোনো মিল নেই। কোনো মাসে ২ হাজার, আবার কোনো মাসে ৩ হাজার ৫০০ টাকা বিল ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বিল সংশোধনের জন্য অফিসে গেলেও কার্যকর সমাধান পাওয়া যায় না।’
৪৩ হাজার গ্রাহকের বিপরীতে মিটার রিডার ২৯ জন
নেসকোর ঠাকুরগাঁও বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের তথ্যমতে, সদর উপজেলার আওতাধীন এলাকায় মোট ৪৩ হাজার ২০৭ জন গ্রাহক রয়েছেন। তাদের মধ্যে আবাসিক গ্রাহক ৩৬ হাজার ৭৭৯, বাণিজ্যিক গ্রাহক ৫ হাজার ১৯৮ এবং বিভিন্ন শ্রেণির গ্রাহক ১ হাজার ২৩০ জন। এসব গ্রাহকের মিটার রিডিং নেওয়ার দায়িত্বে রয়েছেন মাত্র ২৯ জন মিটার রিডার।
স্থানীয় গ্রাহকদের দাবি, বিপুলসংখ্যক গ্রাহকের বিপরীতে মিটার রিডারের সংখ্যা কম হওয়ায় নিয়মিত মিটার পরিদর্শন করা সম্ভব হচ্ছে না। এর সুযোগে অনেক ক্ষেত্রে অনুমানভিত্তিক বিল তৈরি করা হচ্ছে। পরে ব্যবহৃত ইউনিটের সঙ্গে সমন্বয় করতে গিয়ে গ্রাহকের ওপর বাড়তি বিলের চাপ পড়ছে।
শাহাপাড়ার স্কুলশিক্ষক আলতাফুর রহমান অভিযোগ করেন, বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেকেই গ্রাহকের সমস্যার প্রতি যথাযথ গুরুত্ব দেন না। তার অভিযোগ, বিদ্যুৎ লাইনে সমস্যা দেখা দিলে মেরামতকারী কর্মীদের আসতেও দেরি হয়। মেরামতের পর তাদের অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ারও অভিযোগ করেন তিনি।
ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস নেসকোর
ঠাকুরগাঁও বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের জেনারেল ম্যানেজার বাচ্চু মিয়া এশিয়া পোস্টকে বলেন, কোনো কর্মকর্তা বা মিটার রিডারের গাফিলতি থাকলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গ্রাহকদের অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। মিটার রিডিং ও বিলের মধ্যে অসংগতি পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার ঠাকুরগাঁও জেলার সহকারী পরিচালক এ এস এম মাসুম-উদ-দৌলা এশিয়া পোস্টকে বলেন, আমরা ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজন গ্রাহকের অভিযোগ পেয়েছি। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের ডেকে আমরা শুনানি করবো। তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণ করব।