দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর মানুষের মধ্যে বাংলাদেশকে নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার অধিকাংশ মানুষ বাংলাদেশকে ইতিবাচকভাবে দেখলেও ভারতে এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছেন মাত্র এক-চতুর্থাংশ মানুষ।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মধ্যে প্রতিবেশী দেশগুলো সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি জানতে এ জরিপ চালানো হয়।
জরিপ অনুযায়ী, পাকিস্তানের ৬৬ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কার ৫৬ শতাংশ মানুষ বাংলাদেশের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন। ভারতে বাংলাদেশকে ইতিবাচকভাবে দেখেন ২৫ শতাংশ মানুষ।
বাংলাদেশকে নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গিতে গত দুই বছরে পরিবর্তনও দেখা গেছে। ২০২৪ সালের তুলনায় শ্রীলঙ্কায় বাংলাদেশের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ৯ শতাংশ বেড়েছে। বিপরীতে ভারতে তা ১০ শতাংশ কমেছে।
একই সময়ে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যেও প্রতিবেশী দেশগুলো সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন এসেছে। ভারতের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ২০২৪ সালের তুলনায় ১৫ শতাংশ কমেছে। বিপরীতে শ্রীলঙ্কার প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বেড়েছে ১৪ শতাংশ।
বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে পারস্পরিক ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিও জরিপে উঠে এসেছে। বাংলাদেশের ৫৪ শতাংশ মানুষ পাকিস্তানের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন বলে পিউ রিসার্চ জানিয়েছে। ২০২৪ সালে এ হার ছিল ৪০ শতাংশ। অর্থাৎ দুই বছরে পাকিস্তানের প্রতি বাংলাদেশের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ১৪ শতাংশ বেড়েছে।
শ্রীলঙ্কাতেও পাকিস্তানের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বেড়েছে। দেশটির ৫৭ শতাংশ মানুষ পাকিস্তানকে ইতিবাচকভাবে দেখেন, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ১৩ শতাংশ বেশি।
ভারতের ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন। দেশটির মাত্র ৮ শতাংশ মানুষ পাকিস্তানকে ইতিবাচকভাবে দেখেন। ভারতীয়দের মধ্যে পাকিস্তানের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির হার পিউ রিসার্চের জরিপগুলোর মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন।
ভারতের মানুষের কাছে সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবেও পাকিস্তানের নাম সবচেয়ে বেশি এসেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মানুষ ভারতকে নিজেদের সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
মিত্র দেশের প্রশ্নেও দক্ষিণ এশিয়ায় বড় পার্থক্য দেখা গেছে। শ্রীলঙ্কার ৬৩ শতাংশ মানুষ ভারতকে নিজেদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হিসেবে মনে করেন। বিপরীতে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে অংশ নেওয়া মানুষের মধ্যে ভারতকে সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে দেখার প্রবণতা বেশি।
পিউ রিসার্চ জানিয়েছে, চার দেশের মধ্যে শ্রীলঙ্কাই একমাত্র দেশ, যাকে জরিপে অংশ নেওয়া অন্য তিন দেশের মানুষই নেতিবাচকের চেয়ে বেশি ইতিবাচকভাবে দেখেন। বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে প্রায় অর্ধেক মানুষ শ্রীলঙ্কার প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন।
বাংলাদেশের মানুষের ভারত সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গিতেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। জরিপে ৪২ শতাংশ বাংলাদেশি ভারতের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির কথা জানিয়েছেন। অর্থাৎ ৫১ শতাংশের বেশি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি ইতিবাচক নয়। ২০২৪ সালের তুলনায় ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির হার ১৫ শতাংশ কমেছে।
ভারত সম্পর্কে মতামত না দেওয়া মানুষের সংখ্যাও এ সময়ে কমেছে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে জরিপে অংশ নেওয়া ২৪ শতাংশ মানুষ ভারতের বিষয়ে কোনো মতামত দেননি। এবার এ হার নেমে এসেছে ৭ শতাংশে।
পিউ রিসার্চের জরিপে ধর্মভেদেও কিছু পার্থক্য পাওয়া গেছে। ভারতের মুসলিমদের মধ্যে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি হিন্দুদের তুলনায় বেশি। পাকিস্তানের প্রতি ভারতীয় মুসলিমদের ২১ শতাংশ এবং হিন্দুদের ৬ শতাংশ ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ হার যথাক্রমে ৪১ শতাংশ ও ২৩ শতাংশ।
তবে ভারতীয় মুসলিমদের মধ্যেও দুই-তৃতীয়াংশ পাকিস্তানকে নেতিবাচকভাবে দেখেন।
বয়স ও শিক্ষাগত যোগ্যতার ভিত্তিতেও দৃষ্টিভঙ্গিতে পার্থক্য দেখা গেছে। বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে মাধ্যমিক বা তার বেশি শিক্ষা রয়েছে এমন মানুষেরা শ্রীলঙ্কার প্রতি তুলনামূলকভাবে বেশি ইতিবাচক। একইভাবে শ্রীলঙ্কায় বেশি শিক্ষিত মানুষ অন্য তিন দেশের প্রতি তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন।
শ্রীলঙ্কার ৩৫ বছরের কম বয়সী মানুষেরাও বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের প্রতি বয়স্কদের তুলনায় বেশি ইতিবাচক। ভারতে তরুণদের মধ্যেও শ্রীলঙ্কার প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বেশি। ৩৫ বছরের কম বয়সী ভারতীয়দের ৫৪ শতাংশ শ্রীলঙ্কাকে ইতিবাচকভাবে দেখেন, যেখানে ৫০ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে এ হার ৪৩ শতাংশ।
পিউ রিসার্চের জরিপে উঠে আসা এসব তথ্য বলছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে জনগণের দৃষ্টিভঙ্গিতেও গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশকে নিয়ে পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার মানুষের ইতিবাচক মনোভাবের বিপরীতে ভারতে তুলনামূলকভাবে কম ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দেখা যাচ্ছে।
সূত্র : পিউ রিসার্চ সেন্টার