খাতা-কলমে শতভাগ কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। নির্মাণকাজ অর্ধেক রেখেই শতভাগ বিল পরিশোধ ও অফিসে বসে বস্তা ভরে ঘুষ লেনদেনের মতো অনিয়মে জড়িয়ে পড়েছে স্বয়ং নিয়ন্ত্রণকারী দপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন মহলকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে বছরের পর বছর গড়ে ওঠা এই দুর্নীতি সিন্ডিকেটের নেপথ্যে উঠে এসেছে সাবেক ইইডি কর্মকর্তা ও বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. হাসান শওকতের নাম।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী ঠিকাদারদের যোগসাজশে জাল নথিপত্র তৈরি এবং অবকাঠামোগত ভুয়া পরিমাপ দেখিয়ে খোদ রাজধানীর একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন বরাদ্দ লুটে নেওয়ার প্রমাণ পেয়ে এশিয়া পোস্ট। নিজ দপ্তরে বসে বস্তা ভরে কোটি টাকার ঘুষ নেওয়ার ভিডিও এবং ঠিকাদারদের কাছ থেকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার সরাসরি প্রমাণ মিলেছে তার বিরুদ্ধে। অনিয়মের টাকায় স্ত্রী-স্বজনদের নামে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ১৮৪ শতক জমি, বিলাসবহুল রিসোর্ট ও ১০ তলা ভবনসহ অঢেল সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন এই কর্মকর্তা।
জানা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) ঢাকা মেট্রোপলিটন সার্কেলে নির্বাহী প্রকৌশলী ছিলেন মো. হাসান শওকত। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরে তিনি শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে সংযুক্ত থেকে পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর তত্ত্ববধায়ক প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি পান।
বাস্তবে ৮ তলা, বিল উত্তোলন ১০ তলার
পুরান ঢাকার শেরে বাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয়ের একটি একাডেমিক ভবনের কাগজে কলমে ১০ তলা ভবনের কাজ শেষ হয়েছে ২০২১ সালে। কাজ শেষে ঠিকাদার নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি লিয়াকত শিকদার ঐ বছরেই বিলও জমা দেন। সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রকৌশলীরা ১০ তলা এই ভবনের গুনগত মান পরিদর্শন করে ২০২২ সালের ১৩ জুন বিলও ছাড় দিয়েছেন। তবে এই বিল দেওয়ার চার বছর পরেও ভবনের কাজ শেষ হয়নি। ভবনটির এখন বাস্তবে অবকাঠামো দাঁড়িয়ে আছে মাত্র ৮ তলা পর্যন্ত। অথচ নথিপত্রে ভুয়া পরিমাপ দেখিয়ে তুলে নেওয়া হয়েছে ৯ম ও ১০ম তলার ছাদ, ঢালাই, রড ও ওয়াটার প্রুফিংয়ের ২ কোটি ৮০ লাখ টাকা।

নথিপত্রে দেখা যায়, গত ২০২২ সালের ১৩ জুন ২ কোটি ৮০ লাখ টাকার সপ্তম চলতি বিলে (আর/এ) নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে মো. হাসান শওকত স্বাক্ষর করে অর্থ ছাড়ের অনুমোদন দেন। পরিমাপ বইয়ের ৪৬ থেকে ৯৪ পৃষ্ঠা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ৯ম ও ১০ম তলার ছাদের পানি নিরোধক মেমব্রেন বাবদ ৭ লাখ ৪৬ হাজার ৪৫০ টাকা, ১০ম তলাসহ ভবনের দেয়ালের ওয়াটার প্রুফিং বাবদ ৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা, ৯ম তলা ছাদের সাটারিং বাবদ ১ লাখ ৮৮ হাজার টাকা, ১০ম তলার ছাদের পিলার বাবদ ৫ লাখ ১৪ হাজার টাকা, ১০ম তলা ছাদের সাটারিং বাবদ ১ লাখ ৮৮ হাজার টাকা, ৯ম তলা লিন্টেল বাবদ ৫ লাখ ৯ লাখ টাকা, ৯ম তলা লিন্টেল সাটারিং বাবদ ২ লাখ ৩৩ হাজার টাকা, ৯ম তলা ছাদের ঢালাই বাবদ ৪ লাখ ৯০ হাজার টাকা, ৯ম তলা ছাদের সাটারিং বাবদ ৪ লাখ ৯০ হাজার টাকা, ৯ম তলার সিড়ি বাবদ ২ লাখ ১০ হাজার টাকা, ৯ম ও ১০ তলার ছাদের রড বাবদ ৪৯ লাখ টাকা, নিরাপত্তা বেস্টনি বাবদ ৯ লাখ ২৫ হাজার টাকা বিল উত্তোলন করা হয়েছে। সব মিলিয়ে সংশ্লিষ্ট বিলের পরিমাণ প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ টাকা বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
তবে প্রতিষ্ঠানটি সরেজমিন পরিদর্শন করে দেখা যায়, ভবনটির নির্মাণকাজ মাত্র অষ্টম তলা পর্যন্ত সম্পন্ন হয়েছে। নবম ও ১০ম তলার কোনো অস্তিত্বই নেই। অথচ কাজ শেষ না করেই ভুয়া পরিমাপ দেখিয়ে ২ কোটি ৮০ লাখ টাকা উত্তোলন করে আত্মসাৎ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে শেরেবাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ রোজিনা শাহীনের মুঠোফোনে যোগাযোগ করে তাকে পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে ঠিকাদার লিয়াকত শিকদারকে মুঠোফোনে পাওয়া যায়নি।
শুধু শেরেবাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয় নয়, রাজধানীর আরও কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাজের অগ্রগতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিল দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
২০২২ সালের ৯ জুন মোহাম্মদপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ‘মেসার্স মেড-ইন বাংলাদেশ’ নামক প্রতিষ্ঠানকে বিদ্যুৎ সংস্কার কাজের জন্য ১১ লাখ ৬৮ হাজার টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়। এই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রধান তৎকালীন মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ইলিয়াস হোসেন। ২০২৩ সালে ১৬ জানুয়ারি নির্বাহী প্রকৌশলী হাসান শওকত গুনগত কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে ৮ লাখ টাকার বিল দেওয়ার সুপারিশ করেন। তবে বাস্তবে এই কাজ সম্পন্ন হয়নি। এই কাজের সময়সীমা ৯০ দিন হলেও তিন বছর পর ২০২৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর বাকি কাজ শেষ হয়েছে দেখিয়ে ৩ লাখ ৬৮ হাজার টাকার বিলও পরিশোধ করা হয়েছে।
২০২২-২৩ অর্থবছরে ওয়েস্ট ধানমন্ডি ইউসুফ উচ্চ বিদ্যালয়ে ৬ তলা ভবন নির্মাণের জন্য ‘মেসার্স এমএসবি-এমসিবিএল জেভি’ কে কার্যাদেশ দিয়ে কাজ ছাড়াই ১০ লাখ টাকার বিল ছাড় করেন হাসান শওকত। একই প্রক্রিয়ায় পুরান ঢাকার কোতোয়ালি থানার আনোয়ারা বেগম মুসলিম গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজে কোনো কাজ না করেই বিলের ১৯ লাখ টাকার সরকারি অর্থ আত্মসাত করা হয়।
দপ্তরে বসেই বস্তা ভরা টাকার ঘুষ নেন শওকত
অনুসন্ধানে ২০২২ সালের চারটি ভিডিও ফুটেজ পাওয়া যায়। এসব ভিডিওতে দেখা যায়, সরকারি অফিসে নিজ কক্ষে চেয়ারে বসে আছেন প্রকৌশলী হাসান শওকত। তার সামনেই টেবিলের ওপর বস্তা থেকে ব্যাগ ভর্তি কোটি কোটি নগদ টাকা বের করা হচ্ছে। আর এই টাকা তিনি টেবিলের নিচে রাখছেন।
চারটি ভিডিওর উৎস, দৃশ্যমান তথ্য ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় আলাদাভাবে যাচাই করেছে এশিয়া পোস্ট। ভিডিওগুলোর দৃশ্যমান অংশে কোনো স্পষ্ট সম্পাদনার চিহ্ন পাওয়া যায়নি।
ভিডিওতে দেখা গেছে, ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের প্রচার সম্পাদক রাকিব হোসেন মিরন, ঢালী কনস্ট্রাকশনের ঠিকাদারসহ তার সহযোগী ও অন্যান্য ঠিকাদাররা সেই টাকা গুনে প্রকৌশলীর সামনে সাজিয়ে রাখছেন। এসব টাকা প্রকৌশলী হাসান শওকতকে দেওয়া হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন উপস্থিত ঠিকাদারেরা।
নাম পরিচয় গোপন রাখার শর্তে একজন ঠিকাদার বলেন, ‘২০২২ সালে কাজ দেওয়ার বিনিময়ে ঠিকাদারের থেকে দুই কোটি টাকা ঘুষ নেন প্রকৌশলী হাসান শওকত।’
সরকারি নথি সূত্রে জানা যায়, ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী যুবলীগের প্রচার সম্পাদক রাকিব হোসেন মিরনের শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে ‘M/S Miron Enterprise’ ও ‘M/S MERON ENTERPRISE’ নামে দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ করেন। ২০১৮ সালের ৫ ফেব্রুয়ারিতে ‘M/S Miron Enterprise’ প্রথম শিক্ষা প্রকৌশলে ঠিকাদারি দরপত্র পায়। এই লাইসেন্সের মাধ্যমে মিরন সারাদেশে ২৩৩টি কাজ করেন। আর শিক্ষা প্রকৌশলে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১১৯টি দরপত্রে ৬৯.০০৩ কোটি টাকা কাজ করার তথ্য ইজিপিতে পাওয়া গেছে। এর মধ্যে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে ঢাকা মেট্রো জোনে তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী হাসান শওকতের সময়েই ৯০টি দরপত্রে ৪২ কোটি টাকার কাজ করেছেন।
আর ‘M/S MERON ENTERPRISE’ লাইসেন্সের মাধ্যমে তিনি সারাদেশে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত ৯৩টি কাজ করেছেন। আর শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে এ পর্যন্ত ১২টি কাজ করেছেন। এর মধ্যে মেট্রো জোনে ১১টি দরপত্রে ৬ কোটি ২৯ লাখ টাকার কাজ করেছেন। এছাড়া দুটি লাইসেন্সের মাধ্যমে যৌথভাবে অন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তিনি মেট্রোজোনে আরও অর্ধশত কোটি টাকার কাজ করেছেন।
এ বিষয়ে জানার জন্য মিরন হোসেন রাকিবকে মুঠোফোনে যোগাযোগ করে তাকে পাওয়া যায়নি।
স্ত্রী ও স্বজনদের নামে সম্পদের পাহাড়
সরকারি নথিপত্রে প্রাপ্ত ব্যক্তিগত তথ্য এবং অনুসন্ধানে দেখা গেছে, চাকরির সুবাদে নামে-বেনামে বিপুল সম্পত্তি গড়ে তুলেছেন হাসান শওকত। সরকারি তথ্যে স্ত্রী ফেরদৌসী খানমকে গৃহিণী হিসেবে উল্লেখ করলেও তার নামে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে গড়েছেন সম্পদের পাহাড়। সারাদেশে স্ত্রীর নামে রেজিস্ট্রিকৃত মোট ১৮৪.৩৩ শতক জমি ও রিসোর্ট ছাড়াও আত্মীয়-স্বজনদের নামে কোটি কোটি টাকার ফ্ল্যাট ও প্লটের তথ্য মিলেছে।
এর মধ্যে খুলনা ডুমুরিয়া উপজেলায় বিলপাবলা-৫৭ মৌজায় ৪১২২ খতিয়ানে ১২.৫০ শতাংশ, দিঘলিয়া উপজেলার বয়রা-১০ মৌজায় ৩৭১৭ খতিয়ানে ১১.৭২ শতাংশ, মেহেরপুর জেলার সদর উপজেলার মেহেরপুর-৬৬ মৌজায় ৫০৬২ খতিয়ানে ১৩.৮৫ শতাংশ, একই মৌজায় ৯৯৪২ খতিয়ানে ৮ শতাংশ, মাগুরা সদর উপজেলার মাগুরা-৬৯ মৌজায় ৮০০২ খতিয়ানে ১৯ শতাংশ জমিসহ ঢাকা মহানগরের ক্যান্টনমেন্ট থানাধীন বরুয়া-১ মৌজায় ৮৭৯৭ খতিয়ানের জমিতে করেছেন আলিশান বাড়ি। মেহেরপুর সদর উপজেলার মেহেরপুর-৬৬ মৌজায় ১৪০৪৫ খতিয়ানে ৬৫ শতাংশ ও ১৫৪২৯ খতিয়ানে ৪০.৩৭ শতাংশ জমি আছে। এছাড়া দক্ষিণখান এলাকায় নিজের ও স্ত্রীর নামে করেছেন ১০ তলা আলিশান বাড়ি।
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) ঢাকা মেট্রোপলিটন সার্কেলে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. হাসান শওকত এশিয়া পোস্টের কাছে তার কক্ষে টাকা লেনদেনের ভিডিওর সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ‘ঠিকাদাররা নিজেদের মধ্যে টাকা বিনিময় করছেন।’
তবে একটি ভিডিওতে কোনো এক স্যারকে পাঁচ লাখ টাকা দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ঠিকাদাররা নিজেরাই টাকা বিনিময় করছেন এরমধ্যে আমাকে ওই পাঁচ লাখ টাকা দিয়েছেন।’
তবে ঠিকাদাররা তার কক্ষে কেন টাকা লেনদেন করছে, আর পাঁচ লাখ টাকা কি বাবদ নিয়েছেন- এ প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে।’ এ সময় তিনি সংবাদটি প্রকাশ না করার অনুরোধ করেন।
এছাড়া কাজ না করে বিল ও স্ত্রীর নামে সম্পত্তির বিষয়ে জানতে চাইলে এসব বিষয়ে তিনি কোনো উত্তর দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
এ বিষয়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. তারেক আনোয়ার জাহেদী বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’