Image description

ভঙ্গুর অর্থনীতি নিয়ে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়া বিএনপি সরকার শুরুতে আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা ফেরানোকে অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করে। প্রথম ছয় মাস পর দেশের সেই বিপর্যস্ত আর্থিক খাতের অবস্থা কিছুটা উন্নতি হয়েছে। ছয় মাস পর বর্তমানে ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলনের হিড়িক আর নেই। বিপরীতে ব্যাংকে আমানতের পরিমাণ বেড়েছে। বাড়ছে এলসি খোলার হার। অথচ ছয় মাস আগে আমদানির এলসি খোলার মতো যথেষ্ট ডলার ছিল না। রাজস্ব খাতের অস্থিরতা থেমেছে। এখন শক্তিশালী হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। তবে সামগ্রিকভাবে সংকট এখনো কাটেনি। অবশ্য অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী শুরু থেকেই বলে আসছেন অর্থনীতিতে স্বাভাবিক গতি ফিরিয়ে আনতে অন্তত দুই বছর সময় প্রয়োজন। সে হিসেবে গত ছয় মাসে সরকার অনেকটাই সফল হয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

কেননা ব্যাংক খাতের নগদ টাকার সংকট এখন নেই বললেই চলে। বৈদেশিক মুদ্রাবাজারেও স্থিতিশীলতা ফিরতে শুরু করেছে। ডলার সংকটের কারণে এলসি খুলতে না পারার অভিযোগ এখন আর পাওয়া যায় না। বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও শক্তিশালী হচ্ছে। বন্ধ শিল্প কারখানাগুলো চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অর্থনীতির পুনরুদ্ধারে ঘোষিত ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। একীভূত হওয়া ছয় ব্যাংকের সংকটও সমাধানের পথে।

শেয়ারবাজারে স্থিতিশীলতা না ফিরলেও ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। রপ্তানি ও রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বেকার সমস্যার সমাধান, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ব্যাংক ঋণের সুদ হার কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে জ্বালানি সংকটের স্থায়ী সমাধান খুঁজতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কার্যকর আলোচনার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বাজেট বাস্তবায়ন, অনিয়ম-দুর্নীতি কমিয়ে আনা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্যও বিভিন্ন রকম উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এত কম সময়ে মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। শুরুটা খারাপ করেনি তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার বলে মনে করেন বিশ্বব্যাংক ঢাকার সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। 

তিনি বলেন, কোনো দেশের যদি ব্যাংকিং খাত দুর্বল থাকে, বেসরকারি ঋণ কম থাকে এবং শিল্প বিনিয়োগ স্থবির থাকে, শেয়ারবাজারে স্থিতিশীলতা না থাকে, বৈদেশিক মুদ্রাবাজার যদি অস্থির থাকে তবে সামগ্রিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল বলা যাবে না। তবে বাংলাদেশের ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি থেকে অনেক সূচকেই গত ছয় মাসের ব্যবধানে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। যা মূলত আর্থিক খাতের সাময়িক স্থিতিশীলতাকে নির্দেশ করে। আমাদের এখন একটা স্থায়ী স্থিতিশীলতার পথে এগোতে হবে বলে তিনি মনে করেন।

দেশের সাম্প্রতিক সময়ের সামষ্টিক অর্থনীতির প্রধান প্রধান সূচকগুলো বিশ্লেষণ করলে অর্থনীতিতে আস্থা ফেরার মতো একটা পরিবেশ তৈরি হয়েছে। তবে সংকটগুলো কাটাতে হলে আরও অপেক্ষায় থাকতে হবে। তবে ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ হারের কারণে বিনিয়োগে উৎসাহ পাচ্ছেন না শিল্প মালিকরা। ফলে ব্যাংক ঋণের সুদ হার কমানো ছাড়া শিল্প খাতকে চাঙা করা সম্ভব নয়।

এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আমরা ব্যবসাবাণিজ্যের একটা ইতিবাচক পরিবেশ তৈরির জন্য কাজ করছি। তবে সেটার জন্য আরও কিছুটা সময়ের প্রয়োজন। প্রথম ছয় মাসে অনেকগুলো নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। এখন সেগুলো বাস্তবায়ন করার সময়। আর এর ফলাফল পেতে আমাদেরকে আরও কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে। তবে এটা তো বলাই যায় ভঙ্গুর অর্থনীতি-যেটা গর্তের কিনারে দাঁড়িয়ে ছিল আমরা সেটাকে রাতারাতি ঠিক করতে ফেলতে পারি না। কিন্তু আমরা যেটা পারি সেটা হলো খাদে পড়তে না দেওয়া। এবং ছয় মাসে সেটাই হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

অর্থবিভাগ মনে করে দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রথমত, ব্যাংকিং খাতের সংকটই হলো বড় সংকেত। খেলাপি ঋণ দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে পুনরুদ্ধার করা না গেলে ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি বাড়তে পারে। এ ছাড়া সরকারি ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। রাজস্ব আহরণ দুর্বল থাকলে ব্যাংকনির্ভর সরকারি অর্থায়ন বেসরকারি খাতের অর্থায়নে চাপ তৈরি করতে পারে। পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতা। উদ্যোক্তারা নতুন মূলধন বিনিয়োগ না করলে ৪ শতাংশের আশপাশের প্রবৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতায় পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি আরও উসকে যেতে পারে। মূল্যস্ফীতি কমলেও তা এখনো এমন পর্যায়ে রয়েছে, যা মধ্যবিত্ত শ্রেণির পরিবারগুলোর প্রকৃত আয় ও ভোগক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। 

সবশেষ রেমিট্যান্সনির্ভর বৈদেশিক মুদ্রার ভারসাম্য। রেমিট্যান্সের শক্তি বর্তমান সংকট সামলাতে সাহায্য করছে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি বৈদেশিক সক্ষমতার ভিত্তি হতে হলে রপ্তানি ও উৎপাদনশীল বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এটা করতে পারলে দেশের অর্থনীতির ভিত মজবুত করা খুব কঠিন হবে না বলে মনে করে অর্থবিভাগ। জানা গেছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন আর আগের মতো প্রধানত বৈদেশিক মুদ্রার সংকটে আটকে নেই। রিজার্ভ ও রেমিট্যান্সের উন্নতি অর্থনীতিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তাবলয় দিয়েছে। কিন্তু সেই স্বস্তি দেশের অভ্যন্তরীণ আর্থিক ও উৎপাদন কাঠামোর দুর্বলতা আড়াল করতে পারছে না। 

আগামী দুই-তিন বছরের অর্থনৈতিক সাফল্য নির্ধারিত হবে রিজার্ভ কত বাড়ল তা দিয়ে নয়; বরং ব্যাংকিং খাত কতটা পরিষ্কার হলো, বেসরকারি বিনিয়োগ কতটা ফিরল, মূল্যস্ফীতি কতটা স্থায়ীভাবে কমল এবং অর্থনীতি কতটা উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারল- তার ওপর। এদিকে গত ছয় মাসের অর্থনীতির চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়- দেশের অর্থনীতিতে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও অভ্যন্তরীণ সংকট কাটেনি। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও রেমিট্যান্স বেড়েছে, ডলারবাজারও তুলনামূলক স্থিতিশীল। তবে মূল্যস্ফীতি এখনো ৯ শতাংশের ওপরে, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমেছে এবং ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে।

ফেব্রুয়ারিতে রিজার্ভ ছিল প্রায় ২৯.৫ বিলিয়ন ডলার। জুন শেষে তা বেড়ে ৩২.৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে রেমিট্যান্সে বড় উল্লম্ফন হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবাসী আয় এসেছে রেকর্ড ৩৫.৫৬ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের চেয়ে ১৭.৩ শতাংশ বেশি। তবে মূল্যস্ফীতিতে তেমন উন্নতি নেই। ফেব্রুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.১৩ শতাংশ, জুনে তা দাঁড়িয়েছে ৯.১৬ শতাংশে। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ কমেনি। অন্যদিকে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ফেব্রুয়ারির ৬.০৩ শতাংশ থেকে মে মাসে নেমে এসেছে ৫ শতাংশে। ব্যাংকিং খাতেও সংকট প্রকট হয়েছে।

ডিসেম্বরের ৩০.৬ শতাংশ থেকে মার্চে খেলাপি ঋণের অনুপাত বেড়ে ৩২.২৬ শতাংশে উঠেছে। রাজস্ব আহরণেও বড় ঘাটতি রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব সংগ্রহ হয়েছে প্রায় ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা, সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ঘাটতি প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকা। রপ্তানি খাতে জুনে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও পুরো অর্থবছরে পণ্য রপ্তানি কমেছে প্রায় ০.৬ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদের মতে, ছয় মাসে বাংলাদেশের বৈদেশিক খাতে স্বস্তি এলেও অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির দুর্বলতা কাটেনি। রিজার্ভ ও রেমিট্যান্সের ইতিবাচক প্রবণতাকে কাজে লাগিয়ে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও উৎপাদন বাড়ানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।