দেশের আবাসিক স্কুল, মাদ্রাসা ও হেফজখানায় অতিরিক্ত শিক্ষার্থী নিয়ে গাদাগাদি পরিবেশ, ব্যক্তিগত জিনিসপত্র ভাগাভাগি করে ব্যবহার এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণের অভাবে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে খোসপাঁচড়া বা স্ক্যাবিস। সাম্প্রতিক একাধিক গবেষণা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যে এমন উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।
শিশুস্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণায় বিশ্বের অন্যতম জার্নাল বিএমজি প্যাডিয়াট্রিক ওপেন-জি সম্প্রতি এ বিষয়ে একটি গবেষনাপত্র প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে ২০২৬ সালে প্রকাশিত কুষ্টিয়ার ৩৯৪ জন আবাসিক স্কুল ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীর ওপর গবেষণা পরিচালিত হয়েছে। এতে দেখা গেছে, তাদের ৪০ দশমিক ৩৫ শতাংশ স্ক্যাবিসে আক্রান্ত। এর মধ্যে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের আক্রান্তের হার ৫১ দশমিক ৩ এবং আবাসিক স্কুলের শিক্ষার্থীদের হার ৩১ দশমিক ৬৫ শতাংশ।
গবেষণায় অতিরিক্ত বসতি, একই বিছানা বা কম্বল ব্যবহার, কাপড় ও তোয়ালে ভাগাভাগি, অনিয়মিত গোসল এবং স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে সচেতনতার অভাবকে সংক্রমণের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর আগে ২০২৪ সালে দেশের আটটি আবাসিক মাদ্রাসায় পরিচালিত আরেক গবেষণায়ও প্রায় ৩৪ শতাংশ শিক্ষার্থীর স্ক্যাবিসে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়।
চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. নিশিথ রঞ্জন দে বলেন, স্ক্যাবিস একটি ছোঁয়াচে রোগ। শারীরিক সংস্পর্শের মাধ্যমে এটি দ্রুত ছড়ায়। মাদ্রাসা, এতিমখানা ও হেফজখানার একেক কক্ষে ৫০ থেকে ৭০ জন পর্যন্ত শিক্ষার্থী থাকে। তারা একসঙ্গে থাকে, একই বিছানায় বসে এবং ঘনিষ্ঠভাবে চলাফেরা করে। ফলে একজন আক্রান্ত হলে অন্যদের মধ্যে সংক্রমণের আশঙ্কা থাকে। পুষ্টির ঘাটতি থাকলে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বেড়ে যায়। তিনি আরও বলেন, স্ক্যাবিসের চিকিৎসায় আক্রান্ত ব্যক্তির পাশাপাশি ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে থাকা সবাইকে
একই সময়ে চিকিৎসার আওতায় আনা প্রয়োজন।
কিন্তু আবাসিক প্রতিষ্ঠানে তা নিশ্চিত করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। স্ক্যাবিস অতি ক্ষুদ্র পরজীবী মাইটের কারণে হওয়া একটি অত্যন্ত সংক্রামক চর্মরোগ। দীর্ঘসময় আক্রান্ত ব্যক্তির ত্বকের সংস্পর্শে থাকা কিংবা তার ব্যবহৃত কাপড়, বিছানার চাদর, কম্বল বা তোয়ালে ব্যবহার করলে রোগটি ছড়াতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে যেকোনো সময়ে ২০ কোটিরও বেশি মানুষ স্ক্যাবিসে আক্রান্ত থাকেন। ২০১৭ সালে সংস্থাটি রোগটিকে ‘নেগলেকটেড ট্রপিক্যাল ডিজিজ’ বা অবহেলিত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় রোগের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের মেডিকেল কর্মকর্তা ডা. নিগার ফেরদৌসী বলেন, আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্ক্যাবিসকে শুধু চর্মরোগ হিসেবে দেখলে হবে না; এটি জনস্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা।
আক্রান্ত শিক্ষার্থীর সহপাঠী ও রুমমেটদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা, আবাসিক কক্ষের অতিরিক্ত বসতি কমানো, পর্যাপ্ত গোসল ও কাপড় ধোয়ার ব্যবস্থা এবং ব্যক্তিগত জিনিসপত্র ভাগাভাগি বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সময়মতো শনাক্তকরণ ও চিকিৎসার পাশাপাশি আবাসিক প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, পর্যাপ্ত পানি ও গোসলের ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের সচেতন করা জরুরি। একই সঙ্গে শিক্ষক, অভিভাবক ও স্বাস্থ্য বিভাগের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া আবাসিক স্কুল ও মাদ্রাসাগুলোতে স্ক্যাবিসের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।