Image description

দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহির সংস্কৃতি চালু করতে এবার দল এবং সরকার আলাদা করার নীতি গ্রহণ করেছে ক্ষমতাসীন বিএনপি। এ নীতির লক্ষ্য দলের গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে মন্ত্রী-এমপিদের আলাদা রাখা। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অনুসৃত পথ ধরে সরকার পরিচালনার পাশাপাশি দলের ভিতরে পৃথক শক্তিশালী নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে এ পথে হাঁটছে। এর মূল উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনা হচ্ছে নেতৃত্বের বিকেন্দ্রীকরণ। পাশাপাশি দলের পদে থেকে কেউ যাতে ক্ষমতার অপব্যবহার করতে না পারেন, তা নিশ্চিত করা। রাজনৈতিকসংকট, নির্বাচন বা অন্য যে কোনো কারণে সারা দেশে সাংগঠনিক শক্ত ভিত তৈরি। একই সঙ্গে দলের ত্যাগী ও পদবঞ্চিতদের নতুন করে জায়গা দিতে অনেক আগে থেকেই ‘এক নেতা এক পদ’নীতি অনুসরণের চেষ্টা করছে দলটি। সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে গতিশীলতা আনতে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে গতকাল নতুনভাবে চারজনকে যুক্ত করা হয়েছে।

জানা গেছে, প্রথমে সংগঠনের শীর্ষ পদ থেকে মন্ত্রী ও এমপিদের সরিয়ে দেওয়া। দ্বিতীয় পর্যায়ে ধাপে ধাপে জেলা কমিটিসহ অন্যান্য সাংগঠনিক স্তর থেকেও একই নীতি কার্যকর করা। এভাবে পর্যায়ক্রমে পরবর্তী জাতীয় কাউন্সিলের আগেই দলের সব ইউনিটকে সরকার থেকে আলাদা করা হবে। যার মাধ্যমে সারা দেশে একটি শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্যেই কাজ শুরু হয়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর সরকার ও বিএনপি অনেকটাই একাকার হয়ে যায়। দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের অনেকেই মন্ত্রিপরিষদের সদস্য ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে স্থান পান। তৃণমূলের সামনের সারির নেতারাও এখন স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করছেন। অঙ্গসংগঠনের শীর্ষনেতারাও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন। ফলে দেশের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রম এখন আগের চেয়ে স্থবির। এ অবস্থায় দলের কার্যক্রমে ভারসাম্য আনতে বড় ধরনের সাংগঠনিক পরিবর্তনের পথে হাঁটছে বিএনপি।

সংশ্লিষ্ট একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, দীর্ঘ দেড় যুগ পর রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে সরকার পরিচালনা ও দলীয় কার্যক্রমকে আলাদা কাঠামোয় আনার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে বিএনপি। প্রথম ধাপে মন্ত্রী ও এমপিদের জেলা-মহানগর ও অঙ্গসংগঠনের শীর্ষ পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হতে পারে। পরে ধাপে ধাপে অন্যান্য সাংগঠনিক পদে পরিবর্তন আনা হবে। এর মাধ্যমে সরকার ও দলকে পৃথক দুটি সত্তায় রূপ দেওয়ার প্রচেষ্টা চলছে।

দলটির নীতিনির্ধারকদের মতে, একই ব্যক্তি সরকার ও দলের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করলে কার্যক্রমে সমন্বয়হীনতা তৈরি হয়। মন্ত্রী-এমপিরা প্রশাসনিক দায়িত্বে ব্যস্ত থাকায় অনেক ক্ষেত্রে দলীয় কর্মকাণ্ডে সময় দিতে পারছেন না। তাই কেউ কেউ স্বেচ্ছায় সাংগঠনিক পদ ছেড়ে সরকার পরিচালনায় মনোযোগী হওয়ার চিন্তাভাবনা করছেন।

এ বিষয়ে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়ে দল ও সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের মধ্যে পার্থক্য ছিল। সেই সময়ে দলের যেসব নেতা এমপি-মন্ত্রী হতেন, তাঁরা জেলার সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক পদে থাকলে নিজেরা পদত্যাগ করতেন। তখন অন্য কেউ সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পেতেন। বিষয়টি বিএনপির গঠনতন্ত্রে না থাকলেও শহীদ জিয়া দুটি স্তরের বিষয়টি উৎসাহিত করতেন এবং অনেকটাই বাস্তবায়ন করেছিলেন। সেই সময়ে দল গোছানোর কাজে মনোযোগ দেওয়ার জন্য বিএনপির প্রথম মহাসচিব অধ্যাপক ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে সরিয়ে দপ্তরবিহীন করা হয়। পরে তিনি সারা দেশ চষে বেরিয়ে দলকে সংগঠিত করেছিলেন।

জানা গেছে, দল সংস্কারের অংশ হিসেবে গত মার্চে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি পদ ছেড়ে দেন। তিনি এখন পুরোদমে মন্ত্রণালয়ের দাপ্তরিক কাজে নিয়োজিত। এ ছাড়া দলীয় পদ ছেড়েছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ এবং ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।

এদিকে, ঢাকা মহাগর বিএনপি, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলে অন্তত ছয়জন নেতা এমপি-মন্ত্রী হয়েছেন। এঁদের মধ্যে দুজন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। এঁরা হলেন ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক, ঢাকা-১৮ আসনে উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন, ফেনী-১ আসনে ঢাকা দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক রফিকুল আলম মজনু, ভোলা-৪ আসনে যুবদলের সাধারণ সম্পাদক নরুল ইসলাম নয়ন, গোপালগঞ্জ-৩ আসনে স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি এস এম জিলানী এবং বরিশাল-৪ আসনে সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী রাজীব আহসান। এঁদের দলীয় পদ থেকে সরিয়ে দিয়ে এ তিন ইউনিটের নতুন কমিটি গঠনের কাজ চলছে। সংসদ সদস্যের পাশাপাশি জেলা ও মহানগরীর গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষ পদেও আছেন অনেকে।

বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে সারা দেশ থেকে ছাত্র ও যুব নেতা-কর্মীদের ধানমন্ডিতে নিজের বাসায় ডেকে এনে কথা বলতেন। মন্ত্রীদের মঞ্চে রেখে তাঁদের সফল বা ব্যর্থতার প্রমাণ নেতা-কর্মীদের কাছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। তিনি দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহির সংস্কৃতি শুরু করেছিলেন। বাহুল্য পছন্দ করতেন না। কেউ তাঁর ব্যাপারে অতিরিক্ত বিশেষণ দিতে গেলে তাঁকে থামিয়ে দিতেন। এটা অপছন্দ করতেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটিতে নতুন চার নতুন মুখ : বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে নতুন করে চার নেতাকে মনোনীত করা হয়েছে। তাঁরা হলেন দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য আমান উল্লাহ আমান, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক অধ্যাপক ফরহাদ হালিম (ডোনার) এবং চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ। গতকাল বিএনপির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।