Image description

দেশে গ্যাসের চাহিদা যেখানে প্রতিদিন প্রায় ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট, সেখানে দেশীয় উৎপাদন কমে যাওয়া ও এলএনজি সরবরাহের সীমাবদ্ধতায় সর্বোচ্চ ২ হাজার ৪২৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস মিলছে। সংকট মোকাবিলায় নতুন কূপ ও এলএনজি টার্মিনালের উদ্যোগ থাকলেও সেগুলোর বাস্তবায়নে সময় লাগবে কয়েক বছর। ফলে গ্যাস সংকট সহসাই কাটছে না; বরং চাহিদা ও সরবরাহের এই বড় ব্যবধান দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কাই করছেন সংশ্লিষ্টরা।

গ্যাস সংকট নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, কত দিন এই সংকট স্থায়ী হবে এবং কেনই বা এই সংকট তৈরি হলো। জ্বালানি মন্ত্রণালয় ও পেট্রোবাংলার একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয়েছে বাংলা ট্রিবিউনের। তারা বলছেন, ২০২৬ সালে গ্যাসের যে চাহিদা তৈরি হবে, তার প্রক্ষেপণ আগেই সরকারকে জানানো হয়েছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিগত অন্তর্বর্তী সরকার পরিস্থিতির উন্নতিতে তেমন কোনো কাজ করেনি। একদিকে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়া, অন্যদিকে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতার কারণে সহসাই এই সংকট কাটবে না বলে মনে করছেন জ্বালানি সংশ্লিষ্টরা।

গড় চাহিদা ৪ হাজার, সরবরাহ সর্বোচ্চ ৩ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট

দেশে এখন গ্যাসের চাহিদা গড়ে ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু দুই এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর প্রতিদিনের সরবরাহ নেমে যায় ২ হাজার ৯৮ মিলিয়ন ঘনফুটে। এর মধ্যে দেশের খনি থেকে ১ হাজার ৬৩১ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস তোলা হচ্ছিল।

এদিকে শনিবার সকালে এলএনজি টার্মিনাল চালু হওয়ার পর গ্যাস সরবরাহ বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৪২৫ মিলিয়ন ঘনফুটে। পেট্রোবাংলার শনিবার বিকালের হিসাবে, এর মধ্যে ১ হাজার ৬১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দেশীয় উৎস থেকে এবং বাকি ৮১০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি থেকে সরবরাহ করা হচ্ছিল। এর মধ্যে এক্সিলারেট এনার্জি থেকে ৩০০ এবং সামিট থেকে ৫১০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ করা হচ্ছিল।

টার্মিনাল পুরো চালু হলে সরবরাহ অল্প কিছুটা বাড়বে

দুই এলএনজি টার্মিনালের মোট ক্ষমতা ২ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। এখন দিচ্ছে ৮১০ মিলিয়ন ঘনফুট। পুরো সংকট কাটিয়ে উঠলে সরবরাহ আরও ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট বাড়তে পারে। এতে দেশের সরবরাহ আরও কিছুটা বাড়বে।

তবে সরকার এই মুহূর্তে চাইলেও এর চেয়ে বেশি গ্যাস সরবরাহ করতে পারবে না। কারণ হঠাৎ করে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব নয়। তেমনি তাৎক্ষণিকভাবে কোনো দেশ থেকে এলএনজি আমদানি করে আনা হলেও সরবরাহ অবকাঠামো না থাকায় এলএনজি গ্রিডে দেওয়া যাবে না।

চার বছরে দেশীয় গ্যাস কমেছে

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চার বছর আগেও দেশে স্থানীয়ভাবে প্রতিদিন ২ হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হতো। এখন তা নেমে এসেছে ১ হাজার ৬১৫ মিলিয়ন ঘনফুটে।

গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশের দেশীয় গ্যাস উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে ৩৩ শতাংশ। শনিবার বিকাল ৪টার দিকে দেশের ক্ষেত্রগুলো থেকে ১ হাজার ৬১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস তোলা হচ্ছিল। পাঁচ বছর আগে দেশের ক্ষেত্রগুলোর গড় দৈনিক সরবরাহ ছিল ২ হাজার ৪৪০ মিলিয়ন ঘনফুট। সেই বিবেচনায় এখন সরবরাহ কমেছে ৩৩ শতাংশ।

দেশের সবচেয়ে বেশি গ্যাস সরবরাহ করা খনি বিবিয়ানা থেকে ওই সময় ১ হাজার ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস তোলা হতো। শনিবার তোলা হয়েছে ৭৪১ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ এই একটি ক্ষেত্রের উৎপাদন কমেছে ৫৬০ মিলিয়ন ঘনফুট। বাকি খনিগুলোর উৎপাদন কমেছে আরও প্রায় ২০০ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো। কিন্তু এই সময়ে নতুন গ্যাসও গ্রিডে তেমন যোগ হয়নি।

টার্মিনালের চুক্তি বাতিল

দেশের খনিগুলোর গ্যাস উত্তোলন কমে যাবে, এটি আগে থেকেই পেট্রোবাংলার জানা ছিল। সেজন্য বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থেকেই বাপেক্সকে দিয়ে নতুন কূপ খননের পরিকল্পনার পাশাপাশি দুটি এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের চুক্তি করা হয়েছিল।

এর মধ্যে একটি সামিটের প্রস্তাবিত হওয়ায় আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্টতার কারণে টার্মিনালটির চুক্তি বাতিল করে দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। ওই সময় চুক্তি বাতিল না করলে টার্মিনালটির ২০২৬ সালের জুলাই মাসে উৎপাদনে আসার কথা ছিল।

এদিকে দেশের গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন গত জুলাই মাসে চার বছর আগের সরবরাহ থেকে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট কমে যাবে; এই ধারণা থেকেই টার্মিনালটি নির্মাণের কাজ দেওয়া হয়েছিল। ফলে টার্মিনালটি এখন এলে আর সংকট থাকত না।

এছাড়া আগামী বছর মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির আরও একটি টার্মিনাল আসার কথা ছিল। কিন্তু দুটি টার্মিনালের চুক্তিই ওই সময় বাতিল করা হয়েছিল।

গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর নতুন উদ্যোগ

বিএনপি সরকার নতুন করে চীনের একটি কোম্পানি সিএনইসিকে একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের কাজ দিয়েছে। এটি উৎপাদনে আসতে ২২ মাস সময় প্রয়োজন হবে। সরকার আরও একাধিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা করছে।

এদিকে ভোলার গ্যাস দেশের অন্য এলাকায় আনার পরিকল্পনা করা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো পরিকল্পনা আলোর মুখ দেখেনি। সিএনজি আকারে কিছুটা আনা হলেও সেটি বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক হয়নি।

এর বাইরে চলতি বছরের ২৩ মে পেট্রোবাংলা সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করে। সেটি জমা দিতে ২০ নভেম্বর পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে। এরপর কোনো কোম্পানি কাজ পেলে সেখান থেকে অনুসন্ধান, উৎপাদন ও সরবরাহ করতে কমপক্ষে ৫ থেকে ৭ বছর সময় লাগবে। অন্যদিকে স্থলভাগে যদি এখন কোনো গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার হয়, সেখান থেকেও গ্যাস পেতে কমপক্ষে এক বছর সময় প্রয়োজন হবে বলে মনে করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।

এদিকে সিপিডির সাম্প্রতিক গবেষণায় বলা হয়, ২০৩১ সালের মধ্যে দেশে গ্যাসের মোট ব্যবহার প্রায় ৩০ ট্রিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছাতে পারে। একই সময়ে অবশিষ্ট গ্যাসের মজুত প্রায় নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমান হারে গ্যাস ব্যবহার অব্যাহত থাকলে ২০৩০-এর দশকের শুরুতেই মজুত সংকটজনক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। এ পরিস্থিতিতে গ্যাস সংরক্ষণ ও দেশে নতুন গ্যাসের অনুসন্ধানে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

সরকারের বক্তব্য

সম্প্রতি সিপিডির এক অনুষ্ঠানে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, গ্যাস সংকট মোকাবিলায় ২০২৯ সালের মধ্যে আরও তিনটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। পায়রা, মোংলা ও হিরণ পয়েন্টে সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে এবং বিনিয়োগকারী খোঁজা হচ্ছে।

তিনি বলেন, শুধু টার্মিনাল নির্মাণ করলেই হবে না, এর সঙ্গে সঞ্চালন অবকাঠামোও তৈরি করতে হবে। চট্টগ্রাম থেকে বাখরাবাদ পর্যন্ত গ্যাস সঞ্চালন সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এ জন্য সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে নতুন পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনাও করা হচ্ছে।

দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে বাপেক্সের কার্যক্রম বাড়ানো হয়েছে। নতুন কূপ খননের পাশাপাশি আরও দুটি রিগ কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তবে তিনি এও বলেন, আজকের এই পরিস্থিতির জন্য তারা দায়ী নন। আগের সরকারগুলো উদ্যোগ না নেওয়ার ফলাফলই এখন ভোক্তারা ভোগ করছেন। তারা পরিস্থিতির উন্নতিতে যথাসম্ভব চেষ্টা করছেন।

এদিকে শনিবার (১৫ আগস্ট) রাজধানীর বনানীতে টিঅ্যান্ডটি কলোনি মাঠে প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে দরিদ্র-অসহায়দের মাঝে আর্থিক সহায়তা প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানান, দেশের জ্বালানি সমস্যা আগামী ১০ বছরে কীভাবে সমাধান করা হবে, সেই পরিকল্পনা আগামী ২৭ আগস্ট সংসদ অধিবেশনে জনগণের সামনে উপস্থাপন করা হবে।’

তিনি বলেন, ‘বিএনপির পরিকল্পনা আছে জনগণের জন্য। আগামী ২৭ তারিখ যে সংসদের অধিবেশন শুরু হবে, সেখানেই আমরা দেশের জনগণের সামনে উপস্থাপন করবো আগামী ১০ বছর কীভাবে জ্বালানি সমস্যার সমাধান করবো।’

বিশেষজ্ঞদের মতামত

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ২০০৮ সালে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির একটি সমন্বিত পরিকল্পনা করা হয়, যা ২০২১ সাল পর্যন্ত পরিকল্পনা ছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, একসময় গ্যাসের মজুত শেষ হয়ে যাবে। এজন্য গ্যাসের ব্যবহার না বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনে তেলের ব্যবহারও যাতে না বাড়ে, সে বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু সেটি বাস্তবায়ন না করে যাচ্ছেতাইভাবে গ্যাস ও তেলের ব্যবহার বাড়ানো হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। অব্যাহতভাবে এসবের ব্যবহার বাড়ানোয় সংকটও বেড়েছে।

তিনি বলেন, সংকট মোকাবিলায় এলএনজি টার্মিনাল করলেও দামি জ্বালানি দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা করতে গেলে অর্থনৈতিকভাবে তা সম্ভব হবে না। বরং সরকার যদি নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে গুরুত্ব দেয়, তাহলে এখন থেকেই কাজ শুরু করতে হবে। সেখানে জ্বালানি খরচ কম।

অন্যদিকে তরল জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ পাওয়া এবং নেপাল ও ভুটান থেকে বিদ্যুৎ আনা গেলে সরকার এই মুহূর্তে একটি ভালো অবস্থায় যেতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

শামসুল আলম বলেন, দীর্ঘমেয়াদে অনেক কিছু করা যাবে। তবে এই সময়ে সমস্যা সমাধান করতে গেলে এর চেয়ে ভালো অপশন সরকারের হাতে আর কিছু নেই। আর যেসব বড় উদ্যোগের কথা বলা হচ্ছে, সেগুলো সব করতে গেলে দুই থেকে ৫ কিংবা ৭ বছর সময় লাগবে।