চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) ডিসি মো. আমিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে এবার কার্যক্রম নিষিদ্ধ এক আওয়ামী লীগ নেতার পরিবারের কাছ থেকে ২৭ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ওই আ.লীগ নেতার নাম জহুরুল আলম জসিম। জসিম চসিকের ৯ নম্বর উত্তর পাহাড়তলী ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ছিলেন। প্রায় দেড় বছর ধরে তিনি কারাগারে। সম্প্রতি তিনি সবকটি মামলায় জামিন পান। অন্য কোনো মামলায় আর তাকে গ্রেফতার না করে মুক্তি দেওয়া হয়, সেটি নিশ্চিত করতে দুই দফায় এই টাকা আমিরুলকে দেয় জসিমের পরিবার। লেনদেনের মধ্যস্থতা করেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) ৭নং পশ্চিম বাকলিয়া ওয়ার্ড যুব মহিলা লীগের সভাপতি এবং চট্টগ্রাম মহানগর যুব মহিলা লীগের সদস্য সোনিয়া আজাদ। জসিমের ভাই মো. আকবর হোসেন খোকন ও যুব মহিলা লীগ নেত্রী সোনিয়া আজাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, গত বছরের ৫ মার্চ ঢাকার বসুন্ধরা এলাকা থেকে জসিমকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এরপর নগরীর পাঁচলাইশ থানার ৩টি, চান্দগাঁও থানার ৭টি, সদরঘাট থানার ১টি, আকবরশাহ থানার ১১টিসহ ২৭টি মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। তবে সব মামলায় জামিন হওয়ায় গত ৮ জুলাই তার চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে বের হওয়ার কথা ছিল। ওইদিন যাতে শ্যোন অ্যারেস্ট না দেখানো হয়, এ নিয়ে ডিসি আমিরুল ইসলামের সঙ্গে চুক্তি করে তার পরিবার। প্রথম ধাপে ১২ লাখ টাকা ডিসির কাছে হস্তান্তর করা হয়। লেনদেনের সময় জসিমের স্ত্রী তাসলিমা বেগম, ভাই খোকন এবং মধ্যস্থতাকারী সোনিয়া আজাদ উপস্থিত ছিলেন। তবে আমিরুল সিটিএসবিসহ সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করতে ব্যর্থ হন এবং নির্ধারিত দিনে জসিমকে কোতোয়ালি থানার একটি পুরোনো মামলায় নতুন করে গ্রেফতার দেখানো হয়। পরবর্তী সময়ে জামিন পেলে জসিমকে কারাগার থেকে মুক্ত করার শতভাগ আশ্বাস দিলে দ্বিতীয় দফায় আরও ১৫ লাখ টাকা ডিসির হাতে তুলে দেওয়া হয়। ওই লেনদেনের সময় সোনিয়া ও জসিমের স্ত্রী তাসলিমা আক্তার উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে।
সূত্র জানায়, সোনিয়া আজাদের স্বামীর নাম আবু নাসের চৌধুরী আজাদ। তিনি চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক অর্থ সম্পাদক এবং যুবলীগের বিভিন্ন পদ ও কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর এই দম্পতিও গ্রেফতার হয়ে কারাগারে যান। এর মধ্যে আবু নাসেরকে ৭টি মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছিল। তবে আওয়ামী লীগ আমলে কমিউনিটি পুলিশিং কমিটিতে যুক্ত ছিলেন সোনিয়া। এই সুবাদে পুলিশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার সখ্য গড়ে ওঠে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে খুব সহজে কারাগার থেকে বের হন তিনি। পরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ডিসি আমিরুলের সঙ্গে চুক্তি করে নিজের স্বামীকে জেল থেকে বের করে আনেন সোনিয়া। পরে জসিম তার পরিবারকে সোনিয়া আজাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন।
সাবেক কাউন্সিলর জসিমের ভাই আকবর হোসেন খোকন বলেন, ‘প্রথমে ভাবি (জসিমের স্ত্রী) আমাকে কিছু বলে নাই। পরে জানতে পারছি, এক মহিলা (সোনিয়া আজাদ) ভাইয়াকে জেল থেকে বের করার জন্য কাজ করছে। অথচ বের হওয়ার দিন সীতাকুণ্ড ও কোতোয়ালি থানার দুই মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো হয়। মূলত আজাদ ভাই জেলখানায় ভাইয়ার সঙ্গে একই রুমে ছিল। আর ওই মহিলা আজাদ ভাইয়ের স্ত্রী। এগুলোর জন্য আল্লাহ বিচার করবেন।’
এ বিষয়ে সোনিয়া আজাদ বলেন, ‘আজাদ দুইবার গেট থেকে ফেরত গিয়েছিল। তখন তো আমি কাউকে দোষ দিইনি। তৃতীয় দফায় আজাদকে বের করেছি। তখনো ডিসি আমিরুল টাকা নিয়েছে-এমন একটি কথা উঠেছিল, কিন্তু বিষয়টি সত্য নয়। তবে এটা ঠিক, আমাদের যে মামলাগুলো দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো ডিসি নর্থ (উত্তর) থেকে দেওয়া হয়েছিল। প্রশাসনকে জড়িয়ে আমি কোনো কথা বলতে চাই না।’
তিনি বলেন, ‘এখন সবাই জানে, কে কীভাবে বের হচ্ছে। আমার হাজব্যান্ডের বিষয়টা হ্যান্ডেল করেছি বলে আমি জানি, কীভাবে কী করতে হয়। আমার হাজব্যান্ডের জন্য কোথায় কত টাকা দিয়েছি, কী দিয়েছি, তা বলতে যাইনি। কারণ এটা নিয়ম হয়ে গেছে। আমরা এই নিয়মে পড়ে গেছি।’
জসিমের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আজাদ আর জসিম ভাইয়ের লেভেল এক নয়। জসিম ভাইয়ের ভাই (খোকন) অনেক বেশি রূঢ হয়ে গেছে। এ কারণে প্রতিশোধপরায়ণ ভাব চলে এসেছে মানুষের মধ্যে। জসিম ভাইয়ের বিষয়টা হ্যান্ডেল করতে গিয়ে দেখলাম, ওনার পেছনে এখনো অনেক মানুষ লেগে আছে। বিষয়টি নিয়ে টেনশন করতে গিয়ে আমার স্বামী অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছেন।’
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে সিএমপির ওয়েলফেয়ার অ্যান্ড ফোর্স শাখার ডিসি মো. আমিরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ‘সাবেক কাউন্সিলর জসিমকে আমি নিজে ঢাকার বসুন্ধরা থেকে গ্রেফতার করে চালান দিয়েছি। তাকে কারামুক্ত করার বিষয়ে সহযোগিতা বা তদবির করার প্রশ্নই ওঠে না। এ বিষয়ে আমার সঙ্গে কারও কথা হয়নি।’
আমিরুল ইসলাম গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে সিএমপির উত্তর বিভাগের ডিসি হিসাবে যোগদান করেন। দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে সাংবাদিককে মারধর ও লাঞ্ছিত করা এবং নগরীতে গ্রাফিতি আঁকতে যাওয়া নারী শিক্ষার্থীকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ রয়েছে। সবশেষ জাতীয় ক্রিকেট দলের খেলোয়াড় নাঈম হাসানকে মারধর ও হয়রানির ঘটনায়ও তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এরপর গত ১৮ জুন সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে উত্তর বিভাগের ডিসি থেকে সরিয়ে ওয়েলফেয়ার অ্যান্ড ফোর্স শাখার ডিসি হিসাবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।