মার্জিয়া খাতুন, গত বছরের এসএসসি পরীক্ষায় গণিতে ফেল করেছিলেন। মার্জিয়ার মা মারা গেছেন। বড় তিন ভাইয়ের সংসার রয়েছে, বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন বাবা। তিনি ২০২৫ সালে এসএসসি পরীক্ষা যখন দেন তখন তার বিয়ে নিয়ে কথা চলছিল। মা-হারা মার্জিয়ার কাঁধে বাবার দায়িত্ব। পরীক্ষার পর বিয়ের বিষয়টি আরও সামনে আসে। ফল প্রকাশের আগেই তার বিয়ে হয়ে যায়। কুড়িগ্রামের উলিপুরে তার বাড়ি। বিয়ে হয়েছে পাশের উপজেলায়। জানতে চাইলে বলেন, আমার ভাইয়েরা কেউই এইচএইচসি’র পর লেখাপড়া করে নাই। মা মারা গেলো এরপর থেকে তো লেখাপড়া করাটা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। আমি গণিতে ফেল করি কিন্তু এবছর আর পরীক্ষা দেই নাই। কেউ চাপও দেয় নাই, আমারও ইচ্ছা ছিল না।
মার্জিয়ার মতো লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পারেন নাই মো. মিলন। গাইবান্ধায় এখন তিনি ফ্রিজ, টিভি, ওভেন ইত্যাদি মেরামতের কাজে সহযোগিতা করেন। তিনিও ২০২৫ সালে দুই বিষয়ে ফেল করেছিলেন। ২০২৬ সালে আর পরীক্ষা দেন নাই। তিনি পরিবারের দায়িত্ব নেন এবং আয়ের সন্ধানে লেখাপড়া ছেড়ে দেন।
চলতি বছরের এসএসসি-সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি ৬ লাখ ৯০ হাজার ৬০৮ জন। ফল শোনার পরই অন্তত চারজন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্বভাবতই বিরাজ করছে হতাশা-অবসাদ। শিক্ষার্থীদের ফেল করায় শঙ্কা দেখা দিয়েছে ঝরে পড়ার। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থী যারা পাস করেননি তাদের শিক্ষাজীবন অধিকাংশেরই এখানেই শেষ হয়ে যাবে।
উত্তরাঞ্চলের তিন জেলার (রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম) শিক্ষার্থীদের নিয়ে কাজ করে দাতব্য সংস্থা ‘রং পেন্সিল’। তারা ২০২৩ ও ২০২৪ সালের শিক্ষার অবস্থা নিয়ে একটি তথ্য প্রকাশ করেছিল। যাতে এই দুই বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হওয়া শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটি অংশ ছিল। যাতে দেখা যায়, ২০২৩ সালে নির্দিষ্ট কয়েকটি এলাকার ৬২ জন অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর মধ্যে পরবর্তী বছর পরীক্ষা দেয় ১৮ জন। এই ১৮ জনের মধ্যে ৪ জন পুনরায় ফেল করে। আর ৬২ জনের মধ্যে ৫৫ জনই বিয়ে, নিয়মিত-অনিয়মিত কাজের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। ৬২ জনের মধ্যে ছাত্রী ছিল ২৯ জন।
বাংলাদেশে শিক্ষায় ঝরে পড়া নতুন কিছু নয়। বাংলাদেশের মাধ্যমিক স্তরে (ষষ্ঠ-দশম) সর্বশেষ পাওয়া ব্যানবেইস ভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ঝরে পড়ার হার ছিল ৩২.৮৫ শতাংশ। অর্থাৎ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শিক্ষাজীবন শেষ করার আগেই ঝরে পড়ে। ২০২২ সালে এই হার ছিল ৩৫.৯৮ শতাংশ। ২০২৩ সালের হারটি ছেলে শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ৩০.৬৩ শতাংশ এবং মেয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ৩৪.৮৭ শতাংশ।
বিবিএস-২০২৩ এর তথ্যানুযায়ী ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৪২ শতাংশ বিয়ের কারণে পড়াশোনা ছেড়েছে। মেয়েদের ক্ষেত্রে এই হার ৭১ শতাংশ। অন্যান্য কারণের মধ্যে কাজ/চাকরি, আর্থিক অসচ্ছলতা, পড়াশোনায় অনীহা এবং করোনা-পরবর্তী সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরে না আসা রয়েছে। তথ্যানুযায়ী, মাধ্যমিকে ঝরে পড়ে ৩২.৮৫ শতাংশ শিক্ষার্থী। এর মধ্যে এসএসসিতে ফেল করার কারণে ঠিক কতো শতাংশ শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে তার কোনো সরকারি হিসাব নেই।
এসএসসিতে ফেল করা শিক্ষার্থীরা মানসিক একটা ট্যাবুর মধ্যে পড়ে যায় বলেন রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার রিমোর্ট এলাকার শিক্ষক ইফতেখারুল ইসলাম। তিনি বলেন, অনেক শিক্ষার্থী বিভিন্ন ক্লাসে পাস করে যায় বা পরবর্তী ক্লাসে উঠিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু বোর্ড পরীক্ষায় যেয়ে তারা আর পারে না। শিক্ষার পরিবেশটা খুুবই গুরুত্বপূর্ণ। অনেক শিক্ষার্থী ফেল করার মাধ্যমে শিক্ষাজীবন শেষ করা মানে নিজেকে ফ্রি মনে করে। বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে। তারা মূলত নবম-দশম শ্রেণিতে উঠা মানে বিয়ের প্রস্তুতি নেয়া শুরু করে। আর ছেলেরা বিভিন্ন কাজে প্রবেশ করে।
তিনি বলেন, আমাদের স্কুলের একটা মেয়ে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় বিয়ে ঠিক হয়। তার আমরা বিয়ে আটকানোর চেষ্টা করি এবং সফল হই। এরপর মেয়ের বাবা আমাদের বলেন, এই মেয়ে বড় হলে শেয়ানা হয়ে যাবে। কোনো কিছু করলে পরে বিয়ে দেবো কীভাবে। মেয়েকে মধ্যরাতে কোনো এক ছেলের সঙ্গে মোবাইলে কথা বলা অবস্থায় ধরেছে। এরপর থেকেই মোবাইল কেড়ে নেয়া হয়। কিন্তু এরপরও মোবাইল থেকে ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ করে। ছেলে মাদকাসক্ত উল্লেখ করে তারা বাবা বলেন, এই মেয়ে যদি ওই ছেলের সঙ্গে পালিয়ে যায় তাহলে দোষ হবে আমাদের।
আরেকজন শিক্ষক সাদেকুল ইসলাম বলেন, আমার স্কুলটি কুড়িগ্রামের চরের মধ্যে। এসব এলাকায় প্রথমত এসএসসি পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা পড়েই না। মেয়েদের জন্য এসএসসি পাস করে আরও লেখাপড়া করা অনেক কষ্টসাধ্য। এমনকি আয়ের দিক থেকে ভালো পরিবারের মেয়েদেরও বাবা-মায়েরা লেখাপড়া করাতে চান না। কারণ এই এলাকায় প্রেম করে বিয়ের প্রবণতা অনেক বেশি। আর নেশাজাতীয় দ্রব্য ও মোবাইল সহজলভ্য হওয়ায় শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে ব্যাপক।
জানতে চাইলে তিনি বলেন, এসএসসি ফেল করা ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থী আর লেখাপড়ায় ফিরবে না। এরমধ্যে আবার অধিকাংশ শিক্ষার্থীর ফেরার ইচ্ছাও নাই। মেয়েদের বিয়ে হয়ে যাবে আর ছেলেরা আনস্কিলড কাজে যুক্ত হয়ে যাবে। তাই এসব শিক্ষার্থীদের জন্য কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যায় তাহলে তারা স্কিলড হয়ে কর্মে প্রবেশ করতে পারবে।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ফাহমিদা আক্তারের মতে ফেল করা শিক্ষার্থীরা আর লেখাপড়া করুক আর না করুক তাদের আত্মবিশ্বাস ঠিক রাখা জরুরি। তিনি বলেন, তারা ফেল করা মানে একটা বড় রিয়েলিটির মধ্যে প্রবেশ করে। লেখাপড়া করুক আর না করুক তারা এতদিন শিক্ষার্থী হিসেবে পরিবারে, সমাজে একটা সফ্ট কর্নার পেতো সেটা আর পাবে না। তারা এখন থেকে বিবেচিত হবে ভিন্ন পরিচয়ে। তাই সামাজিকভাবে একটা শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। যারা লেখাপড়া করবে তাদের উৎসাহিত করতে হবে। যারা করবে না তাদের মানসিকভাবে হেও করা যাবে না। কারণ এই সময়ের ধাক্কাটা তার সারা জীবনের আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরাতে পারে। আর অধিকাংশ নারীরা এই ধাক্কাটা কিছুদিন পর ভুলে যাবে। কিন্তু সন্তানের যখন লেখাপড়ার বিষয়টি সামনে আসবে তখন সে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে টেক কেয়ার করতে পারবে না।
উত্তীর্ণ না হওয়া শিক্ষার্থীদের কারিগরি শিক্ষায় যোগ দেয়া উচিত বলে মনে করেন শিক্ষা গবেষক ও পিএইচডি গবেষক রেজওয়ানুল ইসলাম। তিনি বলেন, অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের সবাইকে প্রচলিত ধারার শিক্ষায় ফেরানোর চেষ্টা না করে তাদের জন্য বিকল্প পথ তৈরি করা জরুরি। যারা পুনরায় এসএসসি পরীক্ষা দিতে আগ্রহী নয় বা সাধারণ শিক্ষায় টিকে থাকতে পারছে না, তাদের চিহ্নিত করে স্বল্পমেয়াদি কারিগরি ও কর্মমুখী প্রশিক্ষণের আওতায় আনা যেতে পারে। ইলেকট্রিক্যাল, ইলেকট্রনিকস, অটোমোবাইল, কম্পিউটার, কৃষি, গ্রাফিক ডিজাইনসহ স্থানীয় ও জাতীয় শ্রমবাজারে চাহিদা রয়েছে- এমন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিলে এসব শিক্ষার্থী দ্রুত দক্ষতা অর্জন করে কর্মসংস্থানের সুযোগ পেতে পারে। এতে একটি পরীক্ষায় ব্যর্থতার কারণে শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের একটি অংশকে দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করা সম্ভব হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের শিক্ষক প্রফেসর ড. এসএম হাফিজুর রহমান বলেন, কোনো শিক্ষার্থী ভালো করলে এর শুভেচ্ছা শুধু শিক্ষার্থীকে না প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক, অভিভাবক সবাইকে দেয়া হয়। তাহলে খারাপ ফল করলে কেন দেয়া হবে না? এখন দেখতে হবে শিক্ষার্থী কেন ফেল করলো? অভিভাবকের ঘাটতি কী? শিক্ষক, উপজেলা-জেলা শিক্ষা অফিস, বোর্ড, অধিদপ্তর, মন্ত্রণালয় কার কোনটা কাজ এবং তা ঠিকমতো করা হয়েছে কিনা। এটা নিয়ে একটা গবেষণা হতে পারে। এই ফেল করা শিক্ষার্থীদেরতো সকলেই ঝরে পড়বে না। তাদের বলবো, এসএসসিতে ফেল করা কোনো বিষয়ই না। হতাশ হওয়ার কিছু নাই। আমাদের সমাজে অনেক প্রতিষ্ঠিত মানুষ আছেন যারা এসএসসিতে ফেল বা খারাপ ফল করেছে।
তিনি আরও বলেন, এরপরও যারা ঝরে পড়বে তাদের শনাক্ত করে ট্রেনিং দেয়া প্রয়োজন। সরকার এখন থার্ড ল্যাঙ্গুয়েজ, শর্ট ট্রেনিং ইত্যাদিতে জোর দিচ্ছে। এই ঝরে পড়া শিক্ষার্থীরাও যাতে এর আওতায় আসে তা খেয়াল রাখতে হবে।
গতকাল এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া শিক্ষার্থীদের ভেঙে না পড়ে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। পরীক্ষা কোনো শিক্ষার্থীর জীবনের চূড়ান্ত পরিমাপক নয়- উল্লেখ করে তিনি অকৃতকার্যদের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি ফেসবুক পেজে দেয়া এক বার্তায় বলেন, ফলাফল আশানুরূপ না হওয়া অত্যন্ত বেদনার ও হতাশার। তবে অকৃতকার্য হওয়া মানেই জীবনের গল্প শেষ হয়ে যাওয়া নয়। আজকের এই ফল কারও মূল পরিচয় হতে পারে না। এটি পরীক্ষার নির্দিষ্ট কয়েক ঘণ্টার একটা হিসাব মাত্র। কোনো মানুষের পরিশ্রম ও স্বপ্নের নির্দিষ্ট নম্বর হয় না।