Image description

ভারতের রাজধানী দিল্লিতে আগামী ১৬ ও ১৭ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ১৮তম ব্রিকস সম্মেলন। চতুর্থবারের মতো জোটটির সভাপতি ভারত। তবে এবারের শীর্ষ সম্মেলনের চেয়ে মূল আলোচনা আউটরিচ সেশনগুলো নিয়ে। এর মধ্যে আলোচনায় বাড়তি মাত্রা যুক্ত করেছে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত।

গতকাল সোমবার ভারতীয় হাইকমিশনারের সঙ্গে বৈঠকের পর তারেক রহমানের দিল্লি সফরের বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে কি না জানতে চাওয়া হলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেছিলেন, ‘আমরা এখনো এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিইনি।’ ভারত সফর নিয়ে আবারও জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ‘প্রথমত, আমি কোনো গণক নই। দ্বিতীয়ত, প্রধানমন্ত্রীকে ব্রিকসের পক্ষ থেকে ব্যক্তিগতভাবে দাওয়াত দেওয়া হয়নি; তাকে বিমসটেকের সভাপতি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। আপনাদের এই সূক্ষ্ম পার্থক্যটা বোঝা উচিত।’

ঢাকার আপত্তির পর বিষয়টি নিয়ে আজ দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল। তিনি বলেছেন, ‘দায়িত্ব নেওয়ার পরপর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। পাশাপাশি বিমসটেকের বর্তমান সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশকে ব্রিকসের আউটরিচ অধিবেশনে অংশ নিতেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।’

তবে ঢাকা থেকে তারেক রহমানের ভারত সফরে বিষয়টি এখনো নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে সম্মেলনে তার অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত ঝুলে থাকা নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা ধরনের গুঞ্জন।

খলিলুর রহমান জানান, ‘নতুন সরকার গঠনের পরপরই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন, যা সেই দিনই হস্তান্তর করা হয়। একটি আমন্ত্রণ আগে থেকেই আছে।’ যার মানে তারেক রহমানের সামনে এখন দুটি আমন্ত্রণ। তা সত্ত্বেও এই সফর নিয়ে এখনো কোনো স্পষ্টতা নেই। সফরটি বাস্তবায়িত হলে সম্মেলনের পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হওয়ারও কথা রয়েছে।

রণধীর জয়সওয়াল আগে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পরই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ভারতে আসার আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। আর ব্রিকস সম্মেলনের ক্ষেত্রে, বিমসটেকের বর্তমান সভাপতি হিসেবে তাকে দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় আউটরিচ সেশনে অংশ নেওয়ার জন্য আলাদা একটি আমন্ত্রণ দেওয়া হয়েছে। ব্রিকসের আউটরিচ সেশনের ক্ষেত্রে যে রীতি মানা হয় সে অনুযায়ী এই আমন্ত্রণ। একইভাবে আঞ্চলিক বিভিন্ন জোটের প্রধানদেরও এতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।’

 

চলতি বছর ব্রিকস সভাপতি দেশ ভারতের মূল বিষয়বস্তু হলো স্থায়িত্ব, উদ্ভাবন, সহযোগিতা এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিতকরণ। তবে দুটি পৃথক আমন্ত্রণ থাকা সত্ত্বেও এখনো সম্মতি দেননি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর পেছনে দুটি কারণ দেখছেন বিশ্লেষকরা।

প্রথম কারণটি হলো ভারতবিরোধী গোষ্ঠীগুলোর কাছ থেকে আসা অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ। এই সফরকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষরা অভ্যন্তরীণভাবে তার সরকারকে চাপে ফেলার চেষ্টা করতে পারে। বাংলাদেশের অন্যতম বড় দল জামায়াতে ইসলামী ভারতের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখার ইঙ্গিত দিয়েছে। তাই আগামী মাসে ভারত সফরের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত করার আগে সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও ফলাফলের বিষয়টি সতর্কতার সঙ্গে পর্যালোচনা করছেন তারেক রহমান।

দ্বিতীয় কারণটি হতে পারে কোন আমন্ত্রণটি গ্রহণ করবেন— সে সংক্রান্ত কৌশলগত সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রের মতে, ঢাকা ব্রিকসের মতো বহুপাক্ষিক প্ল্যাটফর্মের চেয়ে ভারতের সঙ্গে সরাসরি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক বা আলোচনায় বেশি আগ্রহী। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় সমস্যার আলোকেই দেখতে চায় ঢাকা।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমানের প্রথম আন্তর্জাতিক সফর ছিল মালয়েশিয়া ও চীন। এ নিয়ে দিল্লিতে কিছুটা চাঞ্চল্যও তৈরি হয়। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্ত রয়েছে যা পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা ও মিজোরাম রাজ্য ঘেঁষে বিস্তৃত। ওই সফরের পর যৌথ ঘোষণায় তিস্তা পরিকল্পনা ও মংলা বন্দর সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলো ভারতের জন্য উদ্বেগ তৈরি করেছে। ধারণা করা হচ্ছিল, ভারত সফর নিশ্চিত হলে দুই দেশের সম্পর্কের বরফ গলবে। আর ঠিক এই কারণেই তার সফর নিয়ে এত আলোচনা।

তবে তারেক রহমানের দিল্লি সফরের বাধাগুলো দূর করতে গত কয়েক দিনে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের আগে ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবীরের সঙ্গে বৈঠক করেন।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠককে ইতিবাচক, গঠনমূলক ও ভবিষ্যৎমুখী হিসেবে বর্ণনা করেন দিনেশ ত্রিবেদী। বৈঠক শেষে তিনি বললেন, ‘আমাদের মধ্যে বেশ ভালো আলোচনা হয়েছে। আমাদের কিছু অমীমাংসিত বিষয় আছে, বাংলাদেশেরও আছে। কিন্তু দুই দেশের জনগণের চাওয়ার জায়গা একটাই। উত্তম প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক। এমন কোনো সমস্যা নেই যার সমাধান আলোচনার টেবিলে বসে করা সম্ভব নয়।’ তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গেও কথা বলেছেন।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের পক্ষে ব্রিকস সম্মেলনে না যাওয়ার উপযুক্ত কারণ দেখানো বেশ কঠিন হবে। যদিও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিষয় এবং দিল্লিতে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলন নিয়ে কিছুটা উত্তাপ ছড়িয়েছিল, তবে ভারত দ্রুতই কারো ব্যক্তিগত মতামত এবং সরকারি কূটনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে অবস্থান জানিয়েছে। তাতে দুই দেশের জন্যই কূটনৈতিক আলোচনার পথ তৈরি হয়েছে।

তাছাড়া আগামী ডিসেম্বরে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে। তিস্তা এবং গঙ্গা উভয় নদীর ক্ষেত্রে উজানের দেশ ভারত। তাই দেশটির সঙ্গে আলোচনা অনির্দিষ্টকালের জন্য পেছানোর সুযোগ নেই।

একই সঙ্গে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রতিবেশী ভারত। প্রতিবেশী পরিবর্তন করা কিংবা এড়িয়ে চলারও সুযোগ নেই। বিষয়টি তুলে ধরেছেন ভারতীয় প্রতিনিধি। ধারাবাহিক বৈঠকের পর দিল্লির উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার আগে দিনেশ ত্রিবেদী বলেছেন, ‘আমাদের ইতিহাসে যা-ই ঘটুক না কেন, তা পরিবর্তন করা যাবে না। আমরা আমাদের প্রতিবেশী বদলাতে পারব না। আমি সবসময় বলি— আমাদের শুধু সীমান্ত এক নয়, স্বপ্নও এক।’

তথ্যসূত্র: এনডিটিভি