Image description

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ক্যাটারিং সেন্টারের (বিএফসিসি) জুনিয়র শেফ বা কমিস জহিরুল ইসলাম। তার বিরুদ্ধে সহকর্মীকে মারধর, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে অসদাচরণ, কর্মক্ষেত্রে অনুপস্থিতি ও শৃঙ্খলাভঙ্গসহ একের পর এক অভিযোগে (প্রায় ২০টি) তার বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ, সতর্কপত্র ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্যও রয়েছে। অথচ এত অভিযোগের পরও দীর্ঘদিন চাকরিতে তার বহাল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এবার জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে সহকর্মীকে মারধরের একটি সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া গেছে। তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোকে ষড়যন্ত্র বলে দাবি করেছেন তিনি। বিএফসিসির ভেতরের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, এক কর্মীর সঙ্গে বাগ্‌বিতণ্ডার এক পর্যায়ে এক ব্যক্তি তার দিকে এগিয়ে গিয়ে শারীরিকভাবে আক্রমণ করছেন। নথির তথ্যানুযায়ী, ওই ব্যক্তি বিএফসিসির কমিস বা জুনিয়র শেফ জহিরুল ইসলাম। ঘটনাটি গত বছরের ১৬ আগস্টের।

বিজ্ঞাপন

অভিযোগ রয়েছে, মারধরের সময় পরিস্থিতি সামাল দিতে অন্য সহকর্মীরা এগিয়ে এলে তাদের সঙ্গেও অসদাচরণ ও গালাগাল করেন জহিরুল। এরপর সহকর্মীকে মারধরের অভিযোগের বিষয়ে জানতে তাকে বিএফসিসির চিফ শেফের কক্ষে ডাকা হয়। কিন্তু সেখানেও তিনি উত্তেজিত হয়ে অশালীন ভাষা ব্যবহার করেন। এক পর্যায়ে ভুক্তভোগী কর্মীর দিকে আবারও তেড়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।

এর পর সহকর্মীকে মারধর ও পরবর্তী অসদাচরণের অভিযোগ শেষ পর্যন্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের প্রধান কার্যালয় বলাকায় পৌঁছায়। এরপর বিষয়টি নিয়ে শুরু হয় বিভাগীয় তদন্ত।

এদিকে, তদন্ত-সংক্রান্ত নথিতে একাধিক কর্মকর্তা কর্মচারীর লিখিত বক্তব্য এবং তদন্ত কার্যক্রমের রেকর্ড রয়েছে। তদন্তের অংশ হিসেবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা কর্মচারীদের সাক্ষ্য ও বক্তব্য নেওয়ার পাশাপাশি অভিযোগ-সংক্রান্ত বিভিন্ন নথি পর্যালোচনা করা হয়েছে। তবে সহকর্মীকে মারধরের ঘটনা জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা প্রথম অভিযোগ নয়।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের নথিতে জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ, সতর্কপত্র, সাময়িক বরখাস্তসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের তথ্য রয়েছে। অভিযোগের ধরনও বিভিন্ন। কর্মস্থলে অনুপস্থিতি, নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলাসংক্রান্ত বিষয়, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে অসদাচরণ এবং সহকর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারসহ নানা অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

বিমান প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বিভিন্ন সময়ে জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে প্রায় ২০টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এত অভিযোগ, নোটিশ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার পরও একই কর্মীর বিরুদ্ধে বারবার একই ধরনের অভিযোগ কেন উঠছে এবং কীভাবে তিনি চাকরিতে বহাল থেকে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

সম্প্রতি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের যাত্রীদের জন্য বিএফসিসিতে প্রস্তুত করা খাবারে পোকা পাওয়ার অভিযোগ নিয়ে আলোচনা চলছে। এর মধ্যেই বিএফসিসির ভেতরে কর্মীকে মারধর ও বিশৃঙ্খলার সিসিটিভি ফুটেজ সামনে এলো। জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধেও খাদ্য প্রস্তুত ও তদারকিতে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ রয়েছে। তবে খাবারে পোকা পাওয়ার ঘটনায় কার বা কাদের দায় রয়েছে, সেটি তদন্তের বিষয়।

অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ আমলেও জহিরুল ইসলামের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়েও একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে। সূত্রে জানা যায়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তিনি আওয়ামী শ্রমিক লীগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন এবং সংগঠনটির কার্যক্রমে আর্থিক সহযোগিতা করতেন। হাতে পাওয়া জহিরুল ইসলামের পুরোনো কয়েকটি পে-স্লিপে বেতন থেকে সংগঠন-সংশ্লিষ্ট খাতে অর্থ কাটার তথ্য দেখা যায়।

ওই অর্থ শ্রমিক লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রমে দেওয়া হতো বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। এমনকি বিমান থেকে শ্রমিক লীগকে আর্থিক সহযোগিতা দেওয়ার ক্ষেত্রে জহিরুল অন্যতম প্রধান ব্যক্তি ছিলেন। তবে পে-স্লিপে অর্থ কর্তনের তথ্য থাকলেও ওই অর্থের চূড়ান্ত গন্তব্য কী ছিল কিংবা অন্য কর্মীদের তুলনায় জহিরুলই সর্বোচ্চ অর্থদাতা ছিলেন কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

অভিযোগকারীদের দাবি, শ্রমিক লীগের পরিচয়েই তৎকালীন প্রতিমন্ত্রীসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে তার সখ্য গড়ে ওঠে এবং সেই রাজনৈতিক যোগাযোগ কর্মক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তারে ব্যবহার করা হতো। তবে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তির সঙ্গে ছবি থাকা বা ব্যক্তিগত পরিচয় থাকাই রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রমাণ নয়।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জহিরুল ইসলামের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসে চাকরিরত থাকা অবস্থায় তিনি বর্তমানে ঢাকা মহানগরের দক্ষিণখান থানা শ্রমিক দলের আহ্বায়ক পদে রয়েছেন। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপি ও শ্রমিক দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার পরিচয় দিয়েও কর্মস্থলে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। ফলে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে শ্রমিক লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ও আর্থিক সহযোগিতার অভিযোগ এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শ্রমিক দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার তথ্য- দুই সময়ের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সারাবাংলার কাছে অভিযোগকে ষড়যন্ত্র বলে দাবি করেন জহিরুল। তবে সিসিটিভি ফুটেজে সহকর্মীর সঙ্গে মারধরের বিষয়ে তিনি উত্তপ্ত আচরণ করেন।

এসব ঘটনায় তদন্ত শেষ পর্যায়ে জানিয়ে বিমান প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে প্রায় ২০টি অভিযোগ জমা পড়েছে। সর্বশেষ অভিযোগগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এবং তদন্ত প্রক্রিয়া এখন শেষ পর্যায়ে। তদন্ত প্রতিবেদন জমা হওয়ার পর অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে বিমানের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) বোসরা ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘তদন্ত শেষ হয়েছে বলে জানতে পেরেছি। চার্জশিটও হয়েছে। এখন আমরা রায়ের জন্য অপেক্ষা করছি।’