ছেলের সঙ্গে পরীক্ষায় বসেছিলেন মা। দুজনের প্রস্তুতিও চলেছে পাশাপাশি। ছেলে পড়েছে। মা-ও পড়েছেন। সংসারের দায়িত্ব সামলে বই-খাতা নিয়ে রাত জেগেছেন তিনি। অবশেষে ফল প্রকাশের দিন এলো সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। মা-ছেলে দুজনেই পেয়েছেন জিপিএ ৫। রাজশাহীর এই মা-ছেলের সাফল্যে এখন পরিবারজুড়ে আনন্দ। আনন্দ ছড়িয়ে পড়েছে এলাকাতেও।
নগরীর রাজপাড়া থানা এলাকার বাসিন্দা মোছা. সাদিয়া বেগম। ১৯ বছর আগে বিয়ের পর থেমে গিয়েছিল তার পড়াশোনা। সংসার ও পারিবারিক দায়িত্বের কারণে বই-খাতা ছেড়ে দিতে হয়েছিল। দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর পড়াশোনার বাইরে ছিলেন তিনি। তবে পড়াশোনার প্রতি টানটা রয়ে গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত আবার বই হাতে নেন সাদিয়া। নতুন করে শুরু করেন শিক্ষাজীবন। সংসার সামলেছেন। সন্তানদের বড় করেছেন। দুই ছেলের পড়াশোনার খোঁজ রেখেছেন। এর পাশাপাশি চালিয়ে গেছেন নিজের পড়াশোনা। প্রায় দুই বছর আগে নেন আরও বড় সিদ্ধান্ত। ছেলের সঙ্গে এসএসসি পরীক্ষা দেবেন তিনি। পরিবারের সম্মতিতে শুরু হয় প্রস্তুতি। সংসারের কাজের ফাঁকে পড়াশোনা করেছেন। সন্তানের পড়াশোনার দেখভালের পাশাপাশি নিজের পড়াশোনার সময়ও বের করেছেন।
চলতি বছরের এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সেই পরিশ্রমের ফল পেয়েছেন সাদিয়া বেগম। তিনি জিপিএ-৫ পেয়েছেন। রাজপাড়া আদর্শ মহিলা টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিএম কলেজ থেকে পরীক্ষায় অংশ নেন তিনি। একই সময়ে তাঁর ছেলে তানভীর আহমেদও এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড সরকারি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে পরীক্ষায় অংশ নেয় সে। তানভীর পেয়েছে গোল্ডেন জিপিএ-৫। অর্থাৎ, একই বছরে একই সঙ্গে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে মা ও ছেলে দুজনেই পেয়েছেন জিপিএ-৫।
আজ সোমবার বিকালে রাজশাহী নগরের রাজপাড়া থানার বসিলা এলাকায় তাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, মা-ছেলেসহ পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আনন্দের বন্যা। ফল প্রকাশের পর থেকেই স্বজন ও পরিচিতজনেরা তাদের অভিনন্দন জানাচ্ছেন।
নিজের সাফল্যের অনুভূতি জানাতে গিয়ে সাদিয়া বেগম বললেন, ‘পড়াশোনার প্রতি ঝোঁক ছিল। কিন্তু বিয়ের পর নানা কারণে পড়ালেখা করতে পারিনি। কিন্তু হাল ছাড়িনি।’ তিনি বললেন, ‘বছর দুয়েক আগে সিদ্ধান্ত নিলাম ছেলের সঙ্গে পরীক্ষা দেবো। পরিবারের সম্মতিতে এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। সেই সিদ্ধান্ত থেকেই চলতি বছর ছেলের সঙ্গে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া।’
নিজের সাফল্যের পাশাপাশি ছেলের ফলাফলও তাকে আনন্দিত করেছে। সাদিয়া বললেন, ‘সবচেয়ে ভালো লাগার বিষয় হলো সংসার সামলিয়ে ও দুই ছেলের পড়ালেখার খোঁজখবর রাখার পাশাপাশি নিজে পড়ালেখা করে জিপিএ ৫ পেয়েছি। সঙ্গে ছেলেরও জিপিএ ৫। মা-ছেলের এমন সাফল্যে আমরা পুরো পরিবার আনন্দিত।’
মায়ের সঙ্গে একই পরীক্ষায় অংশ নেওয়া তানভীর আহমেদের কাছেও বিষয়টি ছিল অন্যরকম অভিজ্ঞতা। তানভীর বললেন, ‘আমি সবচেয়ে সৌভাগ্যবান। মায়ের সঙ্গে এবার এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে দুজনই জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছি। কারণ মায়ের সঙ্গে পরীক্ষা দেওয়ার সৌভাগ্য কয়জনের হয়। আমি সেই সৌভাগ্যবান।’
মায়ের পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের পড়াশোনার কথাও তুলে ধরে তানভীর বললেন, ‘মা সার্বক্ষণিক আমার পড়ালেখার খোঁজখবর রাখতেন। সঙ্গে নিজেও পড়তেন। রাত জেগে আমার পাশে বসে থাকতেন। আমি পড়ালেখা করতাম।’
নিজের এই সাফল্য বাবা-মাকে উৎসর্গ করেছে তানভীর। তার ভাষ্যে, ‘আমার এই কৃতিত্ব আমার বাবা-মাকে উৎসর্গ করছি।’ ভবিষ্যৎ স্বপ্নও রয়েছে তানভীরের। ‘বড় হয়ে আমি একজন ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন দেখছি। এজন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চাই।’
মা-ছেলের এই সাফল্যে সবচেয়ে বেশি খুশি তাদের গৃহশিক্ষক আরিফুল ইসলাম। দীর্ঘদিন ধরে কাছ থেকে তাদের পড়াশোনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। আরিফুল ইসলাম বললেন, ‘আমি চার বছর ধরে তানভীরকে ইংরেজি পড়াই। সঙ্গে তার মাকেও সহযোগিতা করছিলাম।’ মা-ছেলের ফলাফলে নিজের অনুভূতি জানিয়ে তিনি বলেছেন, ‘মা-ছেলে দুইজনের এমন সাফল্যে আমি অনেক খুশি। আমি নিজে এমন ঘটনার সাক্ষী হতে পেরে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছি।’
পরিবার সূত্র জানায়, সাদিয়া বেগমের স্বামী তোফাজ্জল হোসেন একজন সরকারি কর্মকর্তা। স্বামী-সংসার, সন্তান লালন-পালনসহ নানা দায়িত্বের মধ্যেও নিজের পড়াশোনার স্বপ্নকে হারিয়ে যেতে দেননি সাদিয়া। একসময় যে পড়াশোনা বিয়ের পর থেমে গিয়েছিল, দীর্ঘ বিরতির পর সেটিই আবার শুরু করেন তিনি। বয়সের ব্যবধান তাকে থামাতে পারেনি। সংসারের ব্যস্ততাও পারেনি। ছেলের পড়াশোনার খোঁজ নেওয়ার পাশাপাশি নিজের বইও খুলেছেন। ছেলে যখন পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছে, তিনিও নিয়েছেন নিজের প্রস্তুতি। একই বছরে একই পরীক্ষায় বসেছেন মা ও ছেলে।
সাদিয়া বেগম ও তানভীর আহমেদের এই সাফল্য শুধু একটি পরীক্ষার ফল নয়। এটি একটি অসম্পূর্ণ স্বপ্ন পূরণের গল্প। এটি একজন মায়ের নতুন করে শুরু করার গল্প। এটি মা-ছেলের পাশাপাশি এগিয়ে চলার গল্প। জীবনের ব্যস্ততা মানুষকে অনেক দূরে সরিয়ে নিতে পারে। সংসারের দায়িত্বও থামিয়ে দিতে পারে পড়াশোনা। কিন্তু ইচ্ছা থাকলে সেই পথ আবার খুঁজে নেওয়া যায়। সাদিয়া বেগম সেই পথই খুঁজে নিয়েছেন। আর সেই পথের সঙ্গী হয়েছেন তার ছেলে তানভীর।