পাহাড়ে আরও ভয়ংকর হয়ে উঠছে সশস্ত্র সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। তবে নিরাপত্তা বাহিনীর টানা অভিযানের পর এবার তারা কৌশল পালটাচ্ছে। মিয়ানমারের সশস্ত্র সংগঠন আরাকান আর্মির (আরশা) সঙ্গে যুক্ত হয়ে সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালাচ্ছে। আরশার কাছ থেকে তারা অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ পাচ্ছে। এছাড়াও কুকিচিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) সঙ্গে আরাকান আর্মির সম্পৃক্ততা মিলেছে। তবে ইউডিএফের অস্ত্রের মূল চালান আসছে ভারত থেকে। তাদের কার্যক্রম সরাসরি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ করছে। তবে ছদ্মনামে কেএনএফের কেউ কেউ অপরাধ স্বীকার করলেও ইউপিডিএফের কোনো নেতা এ ব্যাপারে কথা বলতে চাননি।
চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি ভারতের মিজোরামের আইজল ও মামিত জেলার সীমান্ত এলাকা থেকে যৌথ অভিযানে বিএসএফ এবং মিজোরাম পুলিশ রাঙামাটির বাঘাইছড়ির কয়েকজনকে গ্রেফতার করে। এরা হলেন-আপন চাকমা, নিহার রঞ্জন চাকমা ও মনি কারবারী চাকমা। গ্রেফতারের সময় তিনজনই সশস্ত্র ছিলেন। ভারতে গণমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়ায় এই সংবাদ প্রকাশিত হয়। এরপর তাদের দেওয়া তথ্যে গহিন জঙ্গল থেকে ১ হাজার ৭৯৯ রাউন্ড গুলি এবং একে-৪৭ রাইফেল উদ্ধার করা হয়।
সূত্র বলছে, বর্তমানে পাহাড়ে নিরাপত্তা বাহিনীর লাগাতার অভিযানে কৌশল পালটে ইউপিডিএফ দেশবিরোধী ও বিদেশি অন্যান্য সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে হাত মেলাচ্ছে। সম্প্রতি মিয়ানমার ভিত্তিক সশস্ত্র সংগঠন আরাকান আর্মি এবং বান্দরবানের পার্বত্য অঞ্চলের নব্য সন্ত্রাসী সংগঠন কেএনএফের সঙ্গে ইউপিডিএফের গভীর গোপন আঁতাতের খবর পাওয়া গেছে। ২৮ জুন রুমা-বিলাইছড়ি সীমান্তবর্তী রেতলাং পাহাড়ে কেএনএফের ঘাঁটিতে ইউপিডিএফের উপস্থিতি এবং পরবর্তী সেনা অভিযান তাদের এই নতুন সমঝোতার তথ্য মিলেছে। এক্ষেত্রে দীর্ঘদিন থেকে জেএসএস সন্তুলারমা বিরোধী শক্তিগুলোর সঙ্গে ইউপিডিএফ জোট করার চেষ্টা করে আসছে। কিন্তু নিরাপত্তা বাহিনী বিভিন্ন সময়ে ইউপিডিএফের গোপন আস্তানাগুলোতে অভিযান চালিয়েছে। এ সময় বিপুল পরিমাণ আধুনিক অস্ত্র, গোলাবারুদ, দেশবিরোধী বইপত্র, মানচিত্র এবং যোগাযোগের জন্য ব্যবহৃত নানা আধুনিক ডিজিটাল ডিভাইস উদ্ধার করেছে। এছাড়াও সাম্প্রতিক সময়ে আত্মসমর্পণ করা দুই বাহিনীর বেশ কয়েক সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেছে যুগান্তর।
ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলো ইউপিডিএফের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ইউপিডিএফ সভাপতি প্রসীত বিকাশ খীসা, সাধারণ সম্পাদক রবি শংকর চাকমা, কেন্দ্রীয় সদস্য উজ্জ্বল স্মৃতি চাকমা, কেন্দ্রীয় সহসভাপতি নতুন কুমার চাকমাসহ প্রথম সারির শীর্ষ নেতারা বাংলাদেশে বহু মামলার আসামি হয়ে ভারতে আত্মগোপন করে আছেন। সরকার এবং আদালত থেকে ইউপিডিএফের শীর্ষ নেতাদের একাধিকবার আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিলেও তারা আমলে নিচ্ছে না। তাদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং ও চাঁদাবাজির গুরুতর মামলায় সাজা হওয়া সত্ত্বেও সীমান্তের ওপারে বসে নিজেদের সন্ত্রাসী সাম্রাজ্য পরিচালনা করছেন।
সরেজমিন অনুসন্ধান : কেএনএফের সাবেক নেতা কেরোলিন বম (ছদ্মনাম)। বান্দরবানের কোনো এক গোপন জায়গায় কথা হয় তার সঙ্গে। ক্যামেরায় ধারণ করা হয় ভিডিও। তিনি বলেন আমি কুকিচিন ডেভেলপমেন্ট অরগানাইজেশনের সদস্য ছিলাম। পরে সংগঠনের নাম পরিবর্তন হয়। প্রশিক্ষণ নিয়েছি মিয়ানমার এবং ত্রিপুরায়। ২০০৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১৬ বছর কাজ করি। কিন্তু ২০২৪ সালের ৭ জুন সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছি। এখন ভালো আছি। তবে নিরাপত্তাসংক্রান্ত সমস্যা আছে। প্রকাশ্যে বের হই না। কেএনএফের সাবেক সদস্য কেটফিশ (ছদ্মনাম)। বয়স ৩২ বছর। ২০২২ সালে যোগ দেন এই সশস্ত্র সংগঠনে। একান্ত আলাপে তিনি বলেন ‘২০২২ সালে কেএনএফে যোগ দিয়েছি। ট্রেনিং করেছি ৩ থেকে ৪ মাস। ট্রেনিং অস্ত্র চালানো শেখানো হতো। এরপর কাজ করেছি। আমার স্ত্রীও এই সংগঠনের সদস্য। ওই খানে তার সঙ্গে পরিচয়। বর্তমানে সেও ছেড়ে এসেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিয়ম অনুসারে কোনো রাজনৈতিক দল দেশে বৈধ কার্যক্রম চালাতে হলে নির্বাচন কমিশনের নিয়ম মেনে নিবন্ধিত হয়। কিন্তু ইউপিডিএফ তাদের নামে ডেমোক্রেটিক শব্দটি রাখলেও কোনো ধরনের সরকারি নিবন্ধনের তোয়াক্কা করে না। তারা একটি অবৈধ ও অস্ত্রধারী বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপ হিসাবে নিজেদের তৈরি করে। পাহাড়ে এক প্রকার স্বেচ্ছাচারী শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করছে। পার্বত্য অঞ্চলের হাজারো পাহাড়ি ও বাঙালি মানুষ আজ এই সশস্ত্র চক্রান্ত থেকে স্থায়ী মুক্তি চায়।
১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর পুরো দেশ যখন পাহাড়ে শান্তির স্থায়ী সূচনার প্রত্যাশা করছিল, ঠিক তখনই সেই চুক্তিকে প্রত্যাখ্যান করে জন্ম নেয় ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। ১৯৯৮ সালের ২৬ ডিসেম্বরে ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে পিসিপির সাবেক সভাপতি প্রসীত বিকাশ খীসাকে প্রধান করে আত্মপ্রকাশ ঘটে এই সংগঠনটির।
গণতান্ত্রিক অধিকার ও পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের বুলি ছড়িয়ে এটি যাত্রা শুরু করলেও বাস্তবিক অর্থে পথচলার শুরু থেকেই সংগঠনটি বেছে নেয় অসাংবিধানিক ও সশস্ত্র সংঘাতের পথ। পাহাড়ে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে এবং বিশাল সামরিক ব্যয়ের রসদ জোটাতে ইউপিডিএফ শুরু থেকেই গড়ে তোলে চাঁদাবাজির এক বিশাল নেটওয়ার্ক। সাধারণ পাহাড়ি ও বাঙালি ব্যবসায়ী, কাঠ-বাঁশ, ঠিকাদার, পরিবহণ চালক থেকে শুরু করে দিনমজুর সবাইকেই প্রতি মাসে নির্দিষ্ট হারে চাঁদা দিতে বাধ্য করা হয়। বছরে এই চাঁদাবাজি হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। এই অর্থ ব্যবহৃত হয় ভারতে আলিশান জীবন, অবৈধ অস্ত্র ও গোলাবারুদ কেনায়।
পাহাড়ি জনগণের অধিকার রক্ষার কথা বলে সংগঠনটি কাজ শুরু করলেও ২০০১ সালের ১৬ ডিসেম্বর তাদের প্রকৃত সন্ত্রাসী চেহারা উন্মোচিত হয়। ওইদিন রাঙামাটির নানিয়ারচরে ডেনমার্কের উন্নয়ন সংস্থা ড্যানিডার অর্থে পরিচালিত সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের তিন ইউরোপীয় কর্মকর্তা অপহৃত হন। কেমসেক্স ইন্টারন্যাশনাল নামক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে রাঙামাটি-মহালছড়ি সড়কের কাজ পরিদর্শনে গিয়ে তারা এই অপহরণের শিকার হন। সে সময় যা দেশ ও বিদেশে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছিল। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করার পর প্রায় তিন কোটি টাকা মুক্তিপণ নিয়ে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে যে গভীর ষড়যন্ত্র ইউপিডিএফ লুকিয়ে রেখেছিল, সেটি প্রকাশ করে সেনা কর্মকর্তা হত্যার মধ্য দিয়ে। ২০০৬ সালের ১৭ ডিসেম্বর নানিয়ারচর বগাছড়িতে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের শর্ত মোতাবেক শান্তি-সম্প্রতি রক্ষায় এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করতে গিয়ে ইউপিডিএফ সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের গুলিতে নির্মমভাবে প্রাণ হারান সেনা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন নুরুল আলম গাজী। ইউপিডিএফের অপরাধ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, গত বছরের ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি ইউপিডিএফের এই একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখতে গিয়ে অন্তত ১৭৪ জন নিরপরাধ বাঙালি ও পাহাড়ি নাগরিককে জীবন দিতে হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও কয়েকশ মানুষ। এছাড়া ২৭৮টিরও বেশি অপহরণের ঘটনায় অন্তত ৩৫০ জন সাধারণ মানুষ তাদের শিকার হয়েছেন। ২০২৫ সালের ২৩ এপ্রিল খাগড়াছড়ি সদর থেকে ৫ পাহাড়ি শিক্ষার্থীকে প্রকাশ্যে অপহরণ করে ইউপিডিএফ। এ বিষয়ে সারা দেশে সমালোচনার ঝড় উঠে। পরে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর অভিযানে উদ্ধার হয় অপহৃত শিক্ষার্থীরা।
একই ভাবে দলে যোগ না দেওয়ায় ২০১৮ সালের ২৩ নভেম্বর রাঙামাটি সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী মিতালী চাকমাকে অপহরণ করে তিন মাস গণধর্ষণ করে ইউপিডিএফ কর্মীরা। নারীদের ওপর শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার চালানোর অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। আধিপত্য বিস্তার, চাঁদার পয়েন্ট দখল এবং অস্ত্রের রুট নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রতিপক্ষ গ্রুপ জেএসএস সন্তু বা অন্যান্য আঞ্চলিক উপ-দলের সঙ্গে এদের একের পর এক গোলাগুলির ঘটনা ঘটছে। এতে শুধু সন্ত্রাসী নয়, নিহত হচ্ছেন পথচারী এবং শিশুরাও।
পানছড়ির রূপসীর মা, বালাতি ত্রিপুরা ও বাঘাইছড়ির শিশু রোমিও ত্রিপুরাসহ নাম না জানা কত প্রাণ কেড়ে নিয়েছে বন্দুকের নল। খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি জেলার বেশ কয়েকটি উপজেলায় চাঁদাবাজি ও এলাকায় আধিপত্যকে কেন্দ্র করে চলা এই সংঘর্ষ পার্বত্য চট্টগ্রামকে শান্তি-সম্প্রীতি ও উন্নয়নের অগ্রযাত্রা থেকে বঞ্চিত করেছে। এই এলাকাগুলো যুদ্ধ কবলিত এলাকায় পরিণত হয়েছে। যেখানে প্রতিনিয়ত মৃত্যু ডাকে। মানুষ নিরাপত্তাহীন। ইউপিডিএফ নেতা মাইকেল চাকমার বিরুদ্ধে রয়েছে চাঁদাবাজির মামলার ৮ বছরের সাজা। এক অপরাধের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন তিনি।
পার্বত্য চট্টগ্রামকে অস্থিতিশীল করতে বিভিন্ন ধরনের উসকানিমূলক মন্তব্য করেন। এতে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। অন্যদিকে ইউপিডিএফের কেন্দ্রীয় সশস্ত্র বিভাগের নেতা সজিব চাকমা ও কেন্দ্রীয় চিফ কালেক্টর রবি চন্দ্র অর্কিড পুরো পার্বত্য চট্টগ্রামে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করে সন্ত্রাস চালিয়ে যাচ্ছে। এখানে সেনাবাহিনী না থাকলে হয়তো এতদিন বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত বলতে আর কিছুই থাকত না। পুরোটাই ভারতে চলে যেত, না হয় তাদের স্বপ্নের ‘জুম্মল্যান্ড’ হয়ে যেত।