Image description

রাজধানীতে গণপরিবহণের বাসগুলো সুশৃঙ্খলভাবে না চালানোয় যানজট বাড়ছে। গণপরিবহণের বিশৃঙ্খলায় যানজটের পাশাপাশি প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে। অকালে ঝরে যাচ্ছে বহু প্রাণ। পঙ্গুত্ববরণ করে শত শত মানুষ দিনের পর দিন দুর্বিষহ জীবনযাপন করছে। গণপরিহণের শৃঙ্খলা ফেরাতে বিভিন্ন সময়ে নানা উদ্যোগ নিলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। ‘বাস রুট রেশনালাইজেশন’ করার উদ্যোগও বাস্তবায়ন করা হয়নি। গণপরিবহণ বিশেষজ্ঞদের অভিমত, এর সমাধানে খুব একটা কারিগরি দিক নেই। রাজনৈতিক সদিচ্ছায় এর সমাধান সম্ভব।

গণপরিবহণ বিশেষজ্ঞরা জানান, পৃথিবীর উন্নত দেশের শহরগুলোতে ‘বাস রুট রেশনালাইজেশন’ গণপরিবহণের বাসগুলো শৃঙ্খলায় এনেছে। এতে সড়কে কোম্পানিভিত্তিক বাস চলাচল করে এবং যাত্রী উঠানোয় কোনো প্রতিযোগিতা থাকে না। যাত্রী পরিবহণের আয়-প্রাপ্যতা অনুযায়ী মালিকরা পান। এ কারণে সড়কে বাস চলাচলের দৃশ্য বদলে যায়। তারা বলেন, রাজধানী ঢাকার বাসের শৃঙ্খলা ফেরানোর কৌশল বিষয়ে উন্নতমানের বিভিন্ন গবেষণা হলেও সেগুলোর কোনো বাস্তবায়ন নেই। বিগত সরকারগুলো উদ্যোগ নিলেও রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে তা আলোর মুখ দেখেনি। এর ফলে এখনো নগরীতে বাসের বিশৃঙ্খল অবস্থা দেখা যাচ্ছে। নতুন সরকার নতুন বাস কেনার কথা বললেও বাস রুট রেশনালাইজেশনে বাস্তবায়নে কোনো ঘোষণা বা উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. মো. হাদীউজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, রাজধানীর বাসগুলো যেভাবে চলছে-এটাকে কোনো সিস্টেম বলা যায় না। বিশৃঙ্খলভাবে যে যেভাবে পারছে বাস চালাচ্ছে। মালিকরা বাসচালককে কন্ট্রাকে বাস দিচ্ছেন; চালককে নিজের ও মালিকের আয় করতে হচ্ছে। এজন্য চালকের মধ্যে অস্থিরতা ও তাড়াহুড়া কাজ করে। তিনি বলেন, বাস শহরের বড় গণপরিবহণ। পৃথবীর উন্নত শহরগুলোতে বাসগুলোকে সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করা হয়। এ পদ্ধতিকে ‘বাস রুট রেশনালাইজেশন’ বলা হয়। এটি খুব কারিগরি বিষয় নয়-এটি একটি ব্যবস্থাপনা। এজন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা। এটা কার্যকর করা গেলে ঢাকা শহরের বাসের চেহারা বদলে যাবে। বাস শহরের জন্য বোঝা বা সমস্যা হবে না। বরং বাস আশীর্বাদ হয়ে নগরবাসীকে সেবা দেবে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সদস্য ও পরিকল্পিনাবিদ মুনতাসির মামুন যুগান্তরকে বলেন, মানসম্মত, নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবহণের অভাবে ঢাকার অভ্যন্তরীণ পরিবহণব্যবস্থা ক্রমেই সংকটের মুখে পড়ছে। তিনি বলেন, পৃথিবীজুড়ে বড় বড় নগরীতে গণপরিবহণ হলো বাস। উন্নত শহরগুলোতে বাস রুট রেশনালাইজেশনের মাধ্যমে বাসগুলোকে শৃঙ্খলায় আনা হয়েছে। কিন্তু ঢাকার ক্ষেত্রে তা করা হচ্ছে না। বাস পরিচালনা ব্যবস্থা উন্নতকরণ এবং গুণগতমান উন্নত না করলে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে না। এখন বাসগুলো খেয়ালখুশিমতো চলছে। এভাবে একটা শহরের বাস চলাচল করতে পারে না।

ঢাকা পরিবহণ সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) তথ্য অনুযায়ী, দৈনিক রাজধানীতে প্রায় ৪ কোটি ট্রিপ (যাওয়া বা আসা) হয়। এর মধ্যে বর্তমানে বাসে চলাচল করে ৭ শতাংশ, ২০০৯ সালে যেটা ছিল প্রায় ২৮ শতাংশ। বর্তমানে মেট্রোপরিবহণ করছে মোট যাত্রীর ১ শতাংশ। বিদ্যমান মেট্রোর মতো আরও ৯টি মেট্রোযুক্ত হলে তাতে যাত্রীপরিবহণ করবে ১০ শতাংশ। ঢাকায় এখন হেঁটে গন্তব্যে যায় প্রায় ৪০ শতাংশ ট্রিপ।

সংশ্লিষ্টরা জানান, গণপরিবহণের বিশৃঙ্খলায় ঢাকায় যানজট বাড়ছে। এ অবস্থার উত্তরণে বিগত সরকার ‘বাস রুট রেশনালাইজেশন বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়। নানামুখী চাপ ও কিছু ক্ষেত্রে ভুলপথে কার্যক্রম পরিচালনায় বিশ্বে স্বীকৃত এ পদ্ধতি ঢাকায় বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জে পড়ে। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার বাস রুট রেশনালাইজেশন নিয়ে কিছু আলাপ-আলোচনা করলেও সেটির কোনো বাস্তবায়ন দেখা যায়নি। তারা আরও জানান, বাস রুট রেশনালাইজেশনের পদ্ধতিতে সমন্বয় করে কর্তৃপক্ষের বেঁধে দেওয়া রুটে শুধু নির্ধারিত কোম্পানির বাস চলাচল করে। ওই রুটে অন্য কোনো বাস চলাচল করে না। এতে সড়কে অসুস্থ প্রতিযোগিতা থাকে না।

যাত্রীরা শৃঙ্খলভাবে টিকিট কেটে বাসে চলাচল করেন। অর্জিত মুনাফা কোম্পানিগুলো সমানভাবে ভাগ করে দেওয়া হয়। এ সুবিধা পেতে সব রুটে একত্রে তা চালু করতে হয়। তারা বলেন, ঢাকার বাস রুট রেশনালাইজেশনের ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত পদ্ধতি না মেনে তিনটি রুটে ঢাকা নগর পরিবহণ নামে বাস চালু করলেও সফলতা মেলেনি। এজন্য তিনটি রুটে ইতোমধ্যে বাস চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। লাভজনক না হওয়ায় শুরুতে সব রুট থেকে বেসরকারি বাস চলে যায়। এরপরও বিআরটিসির বাস দুটি রুটে চললেও লোকসান হওয়ায় তা বন্ধ হয়ে গেছে। সফলতা পেতে হলে ভুল সংশোধন করে সঠিকভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলম যুগান্তরকে বলেন, সড়কের শৃঙ্খলা, যানজট নিয়ন্ত্রণ ও বাসের চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হলে বাস রুট রেশনালাইজেশনের কোনো বিকল্প নেই। এ বিষয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা চলছে।

ডিটিসিএর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও ডেপুটি ট্রান্সপোর্ট প্ল্যানার ধ্রুব আলম বলেন, বাস রুট বাস্তবায়নের সব ধরনের গবেষণা ও কলাকৌশল সরকার বিভিন্ন সময়ে বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে করেছে। বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার অবকাঠামোগত কিছু কার্যক্রম চলমান রয়েছে। বাকি কার্যক্রম সরকারের নির্দেশনার আলোকে বাস্তবায়িত হলে সমস্যার সমাধান ঘটবে।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের দায়িত্বপ্রাপ্তরা জানান, ২০১৫ সালে প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক ঢাকায় বাস রুট রেশনালাইজেশন বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেন। সে সময় তিনি ২৫টি সভা করে বাস মালিকদের রাজি করিয়েছিলেন। তখন সিদ্ধান্ত হয়েছিল-ঢাকার ১৭৪টি বাস রুটকে ২২টিতে এবং সহস্রাধিক বাস কোম্পানিকে ছয়টিতে নামিয়ে আনা হবে। একই সঙ্গে ৩ হাজার ৭৬৬টি ফিটনেসবিহীন লক্কড়-ঝক্কড় বাস সড়ক থেকে তুলে নেওয়া হবে। পরিবর্তে ঢাকায় আধুনিকমানের ৪ হাজার বাস নামানো হবে। পরিবেশবান্ধব ও দক্ষতার সঙ্গে গণপরিবহণ ব্যবস্থাপনার জন্য চারটি আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল, ছয়টি সিটি বাস টার্মিনাল ও দুটি ট্রেনিং একাডেমি তৈরি করা হবে। এসব কাজ করতে ১ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা ব্যয় প্রস্তাব করা হয়।

বলা হয়, ৬৫০ কোটি টাকা নতুন বাস ক্রয়ে বাবদ ভর্তুকি দেওয়া হবে। বাকি টাকা অবকাঠামো উন্নয়নে খরচ হবে। আর বাস মালিকদের নতুন বাস ক্রয়ে সাড়ে ৪ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়া হবে। এক্ষেত্রে বিদেশি ঋণ পাওয়া সম্ভাবনার কথাও আলোচনা হয়েছিল। মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস ও মেয়র মো. আতিকুল ইসলামের সময়ে তারা বাস রুট রেশনালাইজেশন কমিটি মূল জায়গা থেকে সরিয়ে নেয়। এর ফলে পরিবহণ মালিকরা উদ্যোগ বাস্তবায়নে অসহযোগিতা করেন।