জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট আসন্ন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রমকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
আজ রোববার মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার বাসভবনে ১১ দলীয় জোটের বৈঠক শেষে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বৈঠকে উপস্থিত ১১ দলীয় ঐক্যের এক শীর্ষ নেতা চরচাকে বলেন, অলি আহমদের নামই একমাত্র প্রার্থী হিসেবে প্রস্তাব করা হয়। পরে সব দলের সম্মতিতে সেই নাম অনুমোদন করা হয়।
১১ দলীয় ঐক্যের আরেক শীর্ষ নেতা চরচাকে বলেন, জামায়াতে ইসলামী অলি আহমদের নামই প্রস্তাব করেছিল। তার ভাষায়, “জামায়াত আসলে মুক্তিযুদ্ধের বিষয়টি সামনে আনতে চায়। এটাই তাদের কৌশলগত কারণ।”
গত শনিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে আসন্ন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় দলটি। পরে রোববার ১১ দলীয় ঐক্যের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে অলি আহমদকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত নেয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান।
বৈঠক শেষে ১১ দলীয় নেতাদের সঙ্গে সংবাদ সম্মেলনে প্রার্থী হিসেবে অলি আহমদের নাম ঘোষণা করেন এনসিপির আহ্বায়ক ও সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, “১১ দল আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমাদের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী হবেন এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ।”
কিন্তু অলি আহমদের বাইরে অন্য কোনো প্রার্থীর নাম কি ১১ দলের বৈঠকে আলোচনায় ছিল? জামায়াতে ইসলামীর এক নির্বাহী পরিষদ সদস্য চরচাকে বলেন, “মনে হয় না যে, আর কারও নাম ছিল। একটি নামই ছিল।” আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের নামও ১১ দলের বিবেচনায় ছিল–এমন গুঞ্জন নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, “আমরা তো শুনিনি। আপনারা শুনেছেন, ভালো কথা। আমি ১১ দলীয় জোটের বৈঠকে ছিলাম না।”
শনিবার জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের বৈঠকে প্রার্থী নিয়ে আলোচনা হয়েছিল কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, “বৈঠকে তো আলোচনা হয়েছে। আরও কত কিছু হতে পারে। সেখানেও অলি আহমদের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।”
তবে জামায়াতের এই নেতা জানান, দলীয় বৈঠকে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে ১১ দলীয় জোটের বৈঠকে। তিনি বলেন, “আমাদের দলীয় বৈঠকে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। আমরা তো জাস্ট আলোচনা করছি। সেটা আমাদের দলীয় সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা। আমরা তো ১১ দলীয় জোটের সিদ্ধান্ত একাই নিতে পারি না।”
১১ দলীয় বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন–ঐক্যের এমন একজন শীর্ষ নেতা চরচাকে বলেন, “বৈঠকে অলি আহমদের নামই প্রস্তাব হয়েছে এবং সেটাই পাস হয়েছে।” তিনি বলেন, “একজন এই নামটি বৈঠকে প্রস্তাব করেন। তখন আমরা সবাই সেটিকে সমর্থন করি।”
ওই নেতা জানান, সব দলই অলি আহমদের বিষয়ে সম্মত ছিল। তার ভাষায়, “বৈঠকে আর কারও নাম প্রস্তাবেই আসেনি। ১১ দলের মধ্যে আমাদের কোনো প্রার্থী ছিল না। ১১ দল মিলে যে নাম এসেছে, আমরা সেটাকেই সমর্থন দিয়েছি।”
আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের নাম প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় ছিল–এমন খবরের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এগুলো তো আপনারা মিডিয়ায় লিখেছেন যে, অমুক অমুক তালিকায় আছে। কিন্তু আমরা তো সে বিষয়ে কিছুই জানি না।”
তবে জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগর উত্তরের এক নেতা চরচাকে বলেন, “জামায়াতে ইসলামীর চিন্তায় ছিল দুজন প্রার্থী। তাদের মধ্যে একজন দৈনিক আমার দেশ-এর সম্পাদক মাহমুদুর রহমান এবং অন্যজন কর্নেল (অব.) অলি আহমদ।”
তিনি বলেন, “হয়তো আলোচনার আগেই মাহমুদুর রহমান বিভিন্ন কারণ বিশ্লেষণের ফলে বাদ পড়ে যান। আমরাও ভেবেছিলাম, অলি আহমদ সাহেবই সিদ্ধান্তে গৃহীত হবেন। কারণ, মাহমুদুর রহমান রাজি হওয়ার কথা নয়।”
১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী হিসেবে মনোনীত হওয়ার পর জোটের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এলডিপি চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। তিনি বলেন, “আমি সমগ্র জাতির কাছে কৃতজ্ঞ। ১১ দলীয় ঐক্যজোটের সকলের কাছে কৃতজ্ঞ। আমাদের সকল নেতা-কর্মীর কাছে কৃতজ্ঞ। আপনাদের মাধ্যমে আমরা জাতিকে বলতে চাই, আমরা আমাদের জায়গা থেকে এই জাতির সঙ্গে কখনো বেইমানি করব না।”
অলি আহমদ বলেন, “আমরা হারব না জিতব, এটা প্রশ্ন নয়। প্রশ্নটা হচ্ছে, আমরা জনগণের পাশে সবসময় তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য দাঁড়াব। আজকেও সেই মনমানসিকতা নিয়ে আমরা সবাই একসঙ্গে হয়েছি। সর্বসম্মতিক্রমে তারা আমার নাম প্রস্তাব করেছেন। আমি সমগ্র জাতিকে ধন্যবাদ জানাই।”
নিজের যোগ্যতার কথা তুলে ধরেন অলি আহমদ, “আমি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরীক্ষিত একজন লোক, যার বিরুদ্ধে দুর্নীতির কোনো অভিযোগ নেই, শিক্ষাগত যোগ্যতার কোনো অভিযোগ নেই। সুন্দরভাবে জীবনযাপন করেছি বিধায় সবাই সর্বসম্মতিক্রমে আমার নাম প্রস্তাব করেছে।”
নির্দলীয় প্রার্থীর কথাও ভাবা হয়েছিল
১১ দলীয় জোটের একটি দলের আরেক শীর্ষ নেতা চরচাকেকে বলেন, “জামায়াতে ইসলামী একজনের নামই ঠিক করে এসেছিল। তবে আমরা চেয়েছিলাম নির্দলীয় কাউকে দেওয়ার জন্য। কিন্তু নির্দলীয় দিতে গেলে আরেকটি সমস্যা হলো–নির্দলীয় যাদের আমরা ভাবছি, তাদেরও তো রাজি হতে হবে।”
নির্দলীয় প্রার্থী হিসেবে কারও নাম ভাবা হয়েছিল কি না, জানতে চাইলে তিনি কোনো নাম উল্লেখ করেননি। তিনি বলেন, “আমরা বিভিন্নজনের নাম নিয়ে ভেবেছি। তাদের মধ্যে অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি, সিভিল সোসাইটির লোক… এমন কয়েকজনের নাম আলোচনায় আসছে।”
জামায়াতে ইসলামী কেন একমাত্র অলি আহমদের নামই আলোচনায় এনেছে–এমন প্রশ্নের জবাবে ওই শীর্ষ নেতা বলেন, “জামায়াত আসলে মুক্তিযোদ্ধাকে সামনে আনতে চায়। এটাই তাদের কৌশলগত বিষয়। মুক্তিযোদ্ধা রেখে তারা কাজ করতে চায়।”
এই নেতা আরও বলেন, “কর্নেল অলিকে জোটে নেওয়ার সময় হয়তো জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে তার এমন কোনো কমিটমেন্টও ছিল। এমন কিছু থাকতে পারে। হয়তো একটি কমিটমেন্ট ইন্টারনালি ছিল।”
যা বলছেন জোট নেতারা
১১ দলীয় ঐক্যের বৈঠক শেষে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, “আমাদের প্রার্থী দেওয়ার উদ্দেশ্য–এই অংশগ্রহণটাই একটা গুরুত্বপূর্ণ মেসেজ রাজনীতিতে বহন করবে। গণতন্ত্রের জন্য আমরা মনে করি যে, এই প্রক্রিয়াটা অংশগ্রহণমূলক, প্রতিযোগিতামূলক হওয়া উচিত।”
এনসিপির এই নেতা জানান, তাদের প্রাথমিক পরামর্শ ছিল জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করে, সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা এবং সেই আলোকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা। এতে ব্যক্তির চেয়ে প্রক্রিয়াটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠত। কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনা হয়নি। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে দলীয় বিষয়ে পরিণত করা হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন নাহিদ ইসলাম।
আমরা অত্যন্ত আনন্দিত যে, আমাদের বিবেচনায় বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট পদের জন্য সবচেয়ে যোগ্য একজন ব্যক্তিকে মনোনয়ন দিতে পেরেছি।- বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হক
এ সময় জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, “গণতন্ত্রের সৌন্দর্য রক্ষায় ১১ দলের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।” রাজনীতি সর্বক্ষেত্রে স্বচ্ছ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
১১ দলীয় ঐক্যের বৈঠক শেষে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হক জানান, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনের বীর যোদ্ধা, বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ এবং দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পরীক্ষিত ব্যক্তি হিসেবে কর্নেল অলি আহমদকে তারা প্রার্থী করেছেন।
মামুনুল হক বলেন, “আমরা অত্যন্ত আনন্দিত যে, আমাদের বিবেচনায় বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট পদের জন্য সবচেয়ে যোগ্য একজন ব্যক্তিকে মনোনয়ন দিতে পেরেছি।” তিনি বলেন, কর্নেল অলি আহমদ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে আগামীর বাংলাদেশকে সঠিক ধারায় নেতৃত্ব দেবেন।
গত ২৪ জুলাই রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন মো. সাহাবুদ্দিন। নিয়ম অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আয়োজন করতে হয়। গত বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।