Image description

প্রায় ৪ হাজার ৭০০টি স্থানীয় সরকার আইনিভাবে নির্বাচনের যোগ্য ও নির্বাচন কমিশনের (ইসি) প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও চলতি বছরে ভোটগ্রহণের সম্ভাবনা কম। এর পরিবর্তে, দলীয় মনোনয়ন, স্থানীয় রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ এবং অভ্যন্তরীণ সাংগঠনিক বিষয়গুলো সমাধানের সময় দিতে নতুন নির্বাচিত বিএনপি সরকার আগামী বছরের শুরুর দিকে ধাপে ধাপে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করার পরিকল্পনা করছে বলে একাধিক সরকারি সূত্রে জানা গেছে।

সূত্রগুলো জানায়, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠনের পর বিএনপি এখনো তাদের দলীয় কর্মকাণ্ড পুরোপুরি গুছিয়ে উঠতে পারেনি। সরকার পরিচালনার পাশাপাশি সংসদ নির্বাচনে তৈরি হওয়া স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব, প্রার্থী বাছাই ও মনোনয়নসংক্রান্ত জটিলতা তাদের সামাল দিতে হচ্ছে।

মূলত এসব বিবেচনা থেকেই স্থানীয় নির্বাচন আগামী বছর পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথমে ধাপে ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং এরপর অন্যান্য স্থানীয় সরকার সংস্থায় ভোট হবে।

সম্প্রতি স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আগামী বছরের শুরুর দিকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

তিনি উল্লেখ করেন, নির্বাচিত চেয়ারম্যান ও সদস্যদের ক্ষমতায়ন এবং উন্নয়নমূলক কাজে তাদের সম্পৃক্ত না করলে স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা সম্ভব নয়।

ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের পর বিএনপি সরকার অবশ্য ইঙ্গিত দিয়েছিল, খুব দ্রুতই স্থানীয় নির্বাচন আয়োজন করা হবে।

পরবর্তীতে সংসদে মির্জা ফখরুল জানান, বন্যা ও তীব্র দাবদাহ বিবেচনায় নিয়ে সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবরের মধ্যে ধাপে ধাপে নির্বাচন শুরু হতে পারে।

সেই ঘোষণার আলোকেই অক্টোবরে ভোট শুরুর জন্য প্রস্তুতি নেয় নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার সম্প্রতি জানিয়েছিলেন, কমিশন সম্পূর্ণ প্রস্তুত এবং অক্টোবরে প্রথম ধাপের ভোট গ্রহণ সম্ভব, যার তফসিল আগস্টেই ঘোষণা করা যেতে পারে।

ইসি আগামী ৩১ আগস্ট হালনাগাদ চূড়ান্ত ভোটার তালিকা এবং ২৭ আগস্ট ভোটকেন্দ্রের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পরিকল্পনাও প্রকাশ করেছিল।

তবে ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ গত সপ্তাহে জানান, স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে সরকার এখনো কমিশনকে কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেয়নি।

তিনি বলেন, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা থেকে ভোটগ্রহণের দিনের মধ্যে সাধারণত ৪৫ দিনের ব্যবধান থাকে। আবার ভোটার তালিকা চূড়ান্ত ও মুদ্রণ করতে আরও দেড় মাস সময় লাগে। সার্বিকভাবে প্রস্তুতির জন্য প্রায় তিন মাস সময়ের প্রয়োজন হয়।

প্রায় ৪,৭০০টি সংস্থা নির্বাচনের যোগ্য
ইসি কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমানে প্রায় ৪,৭০০টি স্থানীয় সরকার সংস্থা নির্বাচনের আইনি সময়সীমার মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ১৩টি সিটি করপোরেশন, ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ, ৩৩০টি পৌরসভা, ৩ হাজার ৮০০টিরও বেশি ইউনিয়ন পরিষদ এবং ৬১টি জেলা পরিষদ।

আইন অনুযায়ী পরিষদ বিলুপ্ত হওয়ার ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় ভোটগ্রহণ নিয়ে রাজনৈতিক মতভেদের কারণে নির্ধারিত সময়ে ভোট করা সম্ভব হয়নি।

বিএনপি সরকার গঠনের পর স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের অনুরোধ জানিয়ে ইসিকে কোনো চিঠি পাঠানো হয়নি। তবুও কমিশন নিজেদের প্রস্তুত দাবি করছে। প্রয়োজনীয় নির্বাচনী সরঞ্জাম কেনা হয়েছে এবং বাজেট বরাদ্দও নির্ধারিত আছে।

এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট নির্বাচন আইন ও বিধিমালার গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিধান সংশোধনের প্রস্তাব প্রস্তুত করছে ইসি, যা সরকার এগোলে দ্রুত চূড়ান্ত করা সম্ভব বলে কর্মকর্তারা জানান।

ইসি সূত্রে জানা গেছে, দেশের সাড়ে চার হাজারের বেশি ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে ৩ হাজার ৮০০টিরও বেশি আগস্টের মধ্যেই নির্বাচনের আইনি যোগ্যতা অর্জন করেছে। বাকি ৮০০টিরও বেশি ডিসেম্বর নাগাদ ধাপে ধাপে যোগ্য হবে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক পৌরসভার মেয়রদের অপসারণের পর প্রায় সবকটি ৩৩০টি পৌরসভা এবং ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদও নির্বাচনের জন্য তৈরি। ৬১টি জেলা পরিষদেও ভোট গ্রহণে কোনো আইনি বাধা নেই।

সিটি করপোরেশনগুলোর অবস্থাও একই। ইসির তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়াদ ২০১৫ সালের ২ জুন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়াদ ১ জুন শেষ হয়েছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়াদ চলতি বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি শেষ হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা ও রংপুর সিটি কর্পোরেশনের মেয়াদ ২০২৭ সালে; সিলেট, রাজশাহী, গাজীপুর, বরিশাল ও খুলনার মেয়াদ ২০২৮ সালে এবং ময়মনসিংহের মেয়াদ ২০২৯ সালে শেষ হওয়ার কথা। তবে মেয়রদের আগে অপসারণ করায় পদগুলো শূন্য হয়ে গেছে, ফলে নির্বাচনে কোনো আইনি জটিলতা নেই।

ইসির কাছে শুধু ইউপির তথ্য
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে স্থানীয় সরকার বিভাগ নির্বাচন কমিশনে কেবল ইউনিয়ন পরিষদ সংক্রান্ত হালনাগাদ তথ্য পাঠিয়েছে।

গত ১০ মার্চ ইসি স্থানীয় সরকার বিভাগের কাছে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদের হালনাগাদ তথ্য চেয়ে ১৫ মার্চের মধ্যে তা জমা দিতে বলেছিল। কিন্তু প্রায় পাঁচ মাস পর কেবল ইউনিয়ন পরিষদের তথ্য পাঠানো হয়।

ইসির জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, ‘চিঠিটি এখনো আমাদের শাখায় পৌঁছায়নি। তবে সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের তথ্যই চাওয়া হয়েছিল।’

কতগুলো ইউপি নির্বাচনের যোগ্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রায় ৪ হাজার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের যোগ্য। তবে এর মধ্যে কিছুর বিরুদ্ধে আদালতে মামলা থাকতে পারে।’

ইসির নির্বাচন শাখার এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, এখন প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে কোন ইউপিগুলো আইনিভাবে যোগ্য এবং কোন ধাপে সেগুলোতে ভোট হতে পারে তা নির্ধারণ করা হবে।

তিনি বলেন, ‘ইউপি নির্বাচন কয়েক ধাপে অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয় সরকার বিভাগের তথ্য স্থানীয় নির্বাচন কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হয়। তারা পরবর্তীতে কমিশনকে জানান কোন এলাকায় কখন ভোটগ্রহণ সুবিধাজনক—কোনগুলো বন্যাপ্রবণ, কোথায় শীতকালে ভোট নেওয়া ভালো আর কোথায় এখনই ভোট করা সম্ভব। এসব বিষয় বিবেচনা করেই ধাপগুলো নির্ধারণ করা হবে।’

স্থানীয় সরকার বিভাগের ইউনিয়ন পরিষদ-১ শাখার উপ-সচিব জিয়াউর রহমান বলেন, ‘আমরা নির্বাচন কমিশনে সব ইউনিয়ন পরিষদের তথ্য পাঠিয়েছি। এখন কমিশনই নির্ধারণ করবে কোনগুলো নির্বাচনের জন্য উপযুক্ত। আমরা কেবল সার্বিক তথ্য প্রদান করেছি।’