লোকসানের ঝুঁকি নিয়েই ঢাকা-সিলেট-ম্যানচেস্টার এবং ঢাকা-নারিতা রুটে ফ্লাইট পুনরায় চালু করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। এ দুটি রুট অতীতে টানা লোকসানের কারণে বন্ধ করতে হয়েছিল।
তৎকালীন আওয়ামী লীগের সময়ে সংসদীয় কমিটিতে উঠে আসে, ঢাকা-সিলেট-ম্যানচেস্টার রুটে প্রতি ফ্লাইটে গড়ে এক কোটি ১০ লাখ টাকা এবং ঢাকা-নারিতা রুটে প্রতিটি ফ্লাইটে গড়ে ৯৫ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে।
সূত্র জানায়, নতুন করে বাজার বিশ্লেষণ, যাত্রী চাহিদা ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনার স্পষ্ট মূল্যায়নের প্রমাণ ছাড়াই রুট দুটি পুনরায় চালু করা হয়েছে। এই রুট সচল রাখতে নতুন করে উড়োজাহাজ লিজ নেওয়ার পরিকল্পনাও চলছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে— লোকসানের ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও কেন একই সিদ্ধান্তের পুনরাবৃত্তি? এটি কি কেবল প্রবাসীবান্ধব উদ্যোগ, নাকি এর পেছনে রয়েছে দুর্বল ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, নীতিনির্ধারণের ত্রুটি কিংবা রাজনীতি। কারণ বিমানের ঢাকা-সিলেট-ম্যানচেস্টার রুটের ফ্লাইটে এক বছরে শত শত কোটি টাকা ক্ষতির রেকর্ড রয়েছে।
চার মাস বন্ধ থাকার পর গত ৫ জুলাই চালু হয়েছে আন্তর্জাতিক এই রুটটি। সপ্তাহে দুই দিন— শনিবার ও মঙ্গলবার ২৯৮ আসনের বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার দিয়ে ফ্লাইট পরিচালনা করছে বিমান। কর্তৃপক্ষ বলছে, যুক্তরাজ্যে বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক প্রবাসীর দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এবং সরকারের নির্দেশনায় রুটটি চালু করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, এই ফ্লাইটে ঢাকা থেকে ম্যানচেস্টার যাওয়ার সময় যাত্রী কম হয়। তবে ম্যানচেস্টার থেকে আসার সময় তুলনামূলক বেশি যাত্রী থাকে। গত ৫ জুলাই বিজি-২০২ ফ্লাইটে ঢাকা-ম্যানচেস্টার রুটে যাত্রী ছিল ২০২ জন। ফিরতি ফ্লাইটে যাত্রী ছিল ২৬৫ জন। গত ৭ জুলাই বিজি-২০৭ ফ্লাইটে ঢাকা থেকে ম্যানচেস্টার যাওয়ার সময় যাত্রী ছিল ১৪৬ জন । ফিরতি ফ্লাইটে যাত্রী ছিল ২৬৪ জন। গত ১১ জুলাই বিজি-২০৭ ফ্লাইটে যাত্রী ছিল ১৩১ জন । ফিরতি ফ্লাইট ম্যানচেস্টার-সিলেটে যাত্রী ছিল ২৬০ জন। গত ১৪ জুলাই বিজি-২০৭ ফ্লাইটে ঢাকা-ম্যানচেস্টার যাত্রী ছিল ১৬৫ জন, ফিরতি ফ্লাইটে ছিল ১৭২ জন। ১৮ জুলাই ঢাকা-ম্যানচেস্টার রুটে যাত্রী ছিল ১৪২ জন এবং ম্যানচেস্টার-ঢাকা ফ্লাইটে যাত্রী ছিল ২৫৩ জন। ২১ জুলাই ঢাকা-ম্যানচেস্টার রুটে যাত্রী ছিল ১৪৮ জন এবং ফিরতি ফ্লাইটে যাত্রী ছিল ১৭০ জন।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে উপস্থাপিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকা-ম্যানচেস্টার রুটে প্রতিটি ফ্লাইটে গড়ে এক কোটি ১০ লাখ টাকা লোকসান হচ্ছে। এক বছরে এই রুটে লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮৭ কোটি টাকা। শুধু চলতি বছরের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসেই লোকসান হয়েছে ১৭২ কোটি টাকা।
একই সঙ্গে আরো কয়েকটি আন্তর্জাতিক রুটেও লোকসান হওয়ায় বিমানের সার্বিক আর্থিক ব্যবস্থাপনাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে এই রুট সচল রাখার জন্য বিমান লিজ নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
ঢাকা-ম্যানচেস্টার ফ্লাইট বার বার বন্ধ করা হয়, আবার খোলা হয় কেন— জানতে চাইলে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রীতা আমার দেশকে বলেন, বর্তমান সরকার এভিয়েশন খাতকে আঞ্চলিক এভিয়েশন হাবে রূপান্তর করার লক্ষ্যে কাজ করছে। এ যাত্রায় বিমানকে বিশ্বমানে উন্নীত করা আমাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। বিগত ১ মার্চ ঢাকা-ম্যানচেস্টার ফ্লাইটটি স্থগিত করা হয়। বিমানের এয়ারক্রাফট স্বল্পতাকে ফ্লাইট স্থগিতের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
তিনি আরো বলেন, যুক্তরাজ্যপ্রবাসী বাংলাদেশিদের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে পুনরায় চালু করা হয়েছে ঢাকা-সিলেট-ম্যানচেস্টার ফ্লাইট। এই রুটে ফ্লাইটের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে ইতোমধ্যে বিমান লিজ (উড়োজাহাজ ভাড়া) নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। এর ফলে ভবিষ্যতে এই ফ্লাইট বন্ধ হওয়ার আর কোনো আশঙ্কা থাকবে না।
ঢাকা-ম্যানচেস্টার প্রতি ফ্লাইটে কোটি টাকার বেশি লোকসান হয়। এটি থেকে উত্তরণের জন্য সরকারের কোনো পরিকল্পনা আছে কিনা— জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, সরকার উন্নত যাত্রীসেবা নিশ্চিতকে প্রাথমিক লক্ষ্য হিসেবে নিয়েছে। যুক্তরাজ্যপ্রবাসী বাংলাদেশিদের দাবিকে প্রাধান্য দিয়েই এই রুটটি পুনরায় চালু করা হয়েছে। তবে বিমান স্বল্পতার কারণে শুরুতে সপ্তাহে দুটি ফ্লাইট ফ্রিকোয়েন্সি রেখেছি।
তিনি আরো বলেন, কোনো নতুন রুট চালুর পর সাধারণত প্রথম ৬-৯ মাসে রুটটি বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে না। বাজারে অবস্থান তৈরি, যাত্রীদের আস্থা অর্জন এবং চাহিদা স্থিতিশীল হতে কিছু সময় প্রয়োজন হয়। ঢাকা-ম্যানচেস্টার-ঢাকা রুটের ক্ষেত্রেও প্রাথমিক পর্যায়ে একই ধরনের পরিস্থিতি হতে পারে। তবে কার্যকর বিপণন কৌশল গ্রহণ, যাত্রী সংখ্যা বৃদ্ধি এবং পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে রুটটিকে ধীরে ধীরে লাভজনক পর্যায়ে নিতে পারব বলে আশা করি।
এভিয়েশন খাত-সংশ্লিষ্টদের একাংশের মতে, সমস্যার মূল কারণ যাত্রীর অভাব নয়, বরং ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ ওয়াহিদুল আলম বলেন, ঢাকা-সিলেট-ম্যানচেস্টার রুটে পর্যাপ্ত যাত্রী রয়েছে। এমনকি প্রতিদিন ফ্লাইট পরিচালনাও লাভজনক হওয়ার কথা। তার মতে, সঠিক বিপণন কৌশলের অভাব, সিস্টেম লস, দুর্নীতি এবং পরিকল্পনার ঘাটতির কারণেই লোকসান হচ্ছে।
তিনি বলেন, বিমান মধ্যপ্রাচ্যের রুট নিয়ে সন্তুষ্ট থেকেছে। কিন্তু ইউরোপীয় বাজারকে বাণিজ্যিকভাবে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেয়নি। এদিকে তাদের নজর দেওয়া খুব জরুরি।
নভোএয়ারের প্রধান নির্বাহী মফিজুর রহমানের ভাষায়, এই রুট মূলত রাজনৈতিক কারণে খোলা হয়। সিলেটের প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহল দীর্ঘদিন ধরে এটি সচল রাখার দাবি জানিয়ে আসছে। কিন্তু আগের লোকসানের ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও নতুন মার্কেট স্টাডি ছাড়া রুটটি আবার চালু করা হয়েছে। যাচাই-বাছাই ছাড়া সিদ্ধান্ত নিলে শেষ পর্যন্ত সেই বোঝা বহন করতে হয় দেশের সাধারণ মানুষকে।
বিশ্লেষকদের মতে, কোনো আন্তর্জাতিক রুট চালু বা বন্ধ করার ক্ষেত্রে সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি বাজার বিশ্লেষণ, যাত্রী চাহিদা, রাজস্ব সম্ভাবনা, পরিচালন ব্যয় এবং প্রতিযোগিতামূলক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা হয়। কিন্তু ঢাকা-ম্যানচেস্টার রুটে সেই ধারাবাহিক পরিকল্পনার প্রমাণ খুব একটা দেখা যায়নি। বরং একই রুট বারবার চালু ও বন্ধ হওয়ায় যাত্রীদের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ফের চালু ঢাকা-নারিতা রুট
দীর্ঘ এক বছর বন্ধ থাকার পর গত ২৭ জুলাই আবারও চালু হয়েছে ঢাকা-নারিতা-ঢাকা সরাসরি বিমান চলাচল। শুরুতে সপ্তাহে একদিন পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। তবে রুটটি পুনরায় চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আগের মতোই এর বাণিজ্যিক সম্ভাবনা, পরিকল্পনা এবং লাভজনক হওয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
বিমানের তথ্য অনুযায়ী, বিগত সময় বোয়িং ৭৮৭ উড়োজাহাজে পরিচালিত প্রতিটি নারিতা ফ্লাইটে গড়ে ২৭১টি আসনের মধ্যে প্রায় ৬৯ শতাংশ পূরণ হলেও প্রতিটি ফ্লাইটে গড়ে প্রায় ৯৫ লাখ টাকা লোকসান হয়। সব মিলিয়ে এ রুটে মোট ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় ২১৫ কোটি ৫৮ লাখ টাকা।
রুটটি প্রথম চালু হয়েছিল ১৯৮০ সালে। এরপর বিভিন্ন সময়ে এটি বন্ধ ও পুনরায় চালুর মধ্য দিয়ে গেছে। সর্বশেষ গত বছরের ১ জুলাই ফ্লাইট বন্ধ করে বিমান।
এর আগে দীর্ঘ ১৭ বছর বন্ধ থাকার পর ২০২৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর রুটটি পুনরায় চালু করা হয়েছিল। সে সময় জাপানগামী যাত্রী, বিশেষ করে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ দেখা দেয়। সরাসরি ফ্লাইট চালুর ফলে যাতায়াতের সময় কমে প্রায় সাড়ে ছয় ঘণ্টায় নেমে আসে এবং তৃতীয় দেশের ট্রানজিটের ঝামেলা এড়ানো সম্ভব হয়।
বিমানের অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, রুটটি পুনরায় চালুর আগে যথাযথ বাণিজ্যিক সম্ভাব্যতা ও বাজার বিশ্লেষণ করা হয়নি। এ কারণে রুটটি শুরু থেকেই প্রত্যাশিত যাত্রী পায়নি এবং ধারাবাহিক লোকসানের মুখে পড়ে।
বিমানের একাধিক সূত্রের ভাষ্য, সে সময়কার ব্যবস্থাপনা পরিচালক শফিউল আজিমের উদ্যোগেই নারিতা রুট পুনরায় চালু করা হয়েছিল। তাদের দাবি, বিষয়টি তৎকালীন সরকারের সাফল্য হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও পর্যাপ্ত বাজার গবেষণা ও আর্থিক বিশ্লেষণ ছাড়া সিদ্ধান্ত নেওয়ায় শেষ পর্যন্ত বিমানকে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হয়।
রুটটি পুনরায় চালুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিমানের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, বাজারের বাস্তব চাহিদা ও আর্থিক সম্ভাবনা যথাযথভাবে মূল্যায়ন না করেই রুটটি চালুর অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। এ সিদ্ধান্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত বলেও তিনি মত দেন।
অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ ওয়াহিদুল আলমের মতে, জাপানের মতো গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্যে ফ্লাইট বন্ধ করা বাংলাদেশের বিমান পরিবহন খাতের ভাবমূর্তির জন্য নেতিবাচক। যথাযথ বিপণন, ব্র্যান্ডিং এবং ট্রানজিট যাত্রী আকর্ষণের উদ্যোগ নিলে রুটটি লাভজনক করা সম্ভব ছিল।
তার ভাষ্য, রুটটি চালুর পর নেপাল ও ভারতের কলকাতা থেকেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক যাত্রী ঢাকা হয়ে টোকিও যেতেন। কিন্তু কার্যকর প্রচারের অভাবে বিমান সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারেনি।
বিমানের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) বোসরা ইসলাম আমার দেশকে বলেন, নারিতা ফ্লাইট বন্ধ হওয়ার আগে শেষের ছয়মাস লাভজনক ছিল। কিন্তু উড়োজাহাজের সংকটে রুটটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এই মুহূর্তে সপ্তাহে একটি ফ্লাইট ঢাকা-নারিতা রুটে পরিচালনা করা হচ্ছে। নতুন করে চালু হওয়ার পর এখন পর্যন্ত সব টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে। ভবিষ্যতে ফ্লাইট বাড়ানো হবে।
এই রুটের বিষয়ে বিমানমন্ত্রী আফরোজা খানম রীতা বলেন, ঢাকা-নারিতা ফ্লাইট সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফসল। ভবিষ্যতে এই রুট আর বন্ধ করার প্রশ্নই আসে না। আশা করি, এবার রুটটি লাভজনক হবে।
তিনি আরো বলেন, ঢাকা-নারিতা সরাসরি ফ্লাইট চালুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও জাপানের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরো দৃঢ় হবে এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক ও সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।
বিমান প্রতিমন্ত্রী এম রাশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, জাপানপ্রবাসী ৪৫ হাজার বাংলাদেশির কথা বিবেচনায় রেখে ফ্লাইটটি চালু করা হয়েছে। ফ্লাইটটি যাতে আর কখনোই বন্ধ না হয়, সেজন্য চাহিদা বিবেচনায় শুধু বোয়িং নয়, এয়ারবাসের উড়োজাহাজও বহরে যুক্ত করা হবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ১৯৮০ সালে উড়োজাহাজ স্বল্পতা থাকা সত্ত্বেও শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ক সুদৃঢ় করার জন্য ঢাকা-নারিতা ফ্লাইট চালু করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে ফ্লাইটটি যাত্রী সাধারণের জন্য পুনরায় চালু করা হয়েছে।