পিত্তথলিতে পাথর বা গলস্টোন পরিপাকতন্ত্রের একটি পরিচিত সমস্যা। অনেকের শরীরে পাথর থাকলেও দীর্ঘদিন কোনো উপসর্গ দেখা যায় না। তবে পাথর পিত্তনালিতে বাধা সৃষ্টি করলে তীব্র পেটব্যথা, পিত্তথলির প্রদাহ, জন্ডিস, সংক্রমণ এমনকি অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে।
সময়মতো রোগ নির্ণয় ও প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা নিলে পিত্তপাথরজনিত জটিলতা কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
পিত্তথলি কী?
যকৃতের নিচে থাকা ছোট থলির মতো অঙ্গটির নাম পিত্তথলি। যকৃত থেকে তৈরি হওয়া পিত্তরস এটি সাময়িকভাবে জমা রাখে। খাবার হজমের সময়, বিশেষ করে চর্বি হজমে সহায়তা করতে, পিত্তরস ক্ষুদ্রান্ত্রে পৌঁছে যায়।
কীভাবে পাথর তৈরি হয়?
পিত্তরসে কোলেস্টেরল, বিলিরুবিন ও পিত্ত লবণসহ বিভিন্ন উপাদান থাকে। এসব উপাদানের ভারসাম্যে পরিবর্তন হলে ছোট স্ফটিক তৈরি হতে পারে। সময়ের সঙ্গে সেগুলো বড় হয়ে পাথরে পরিণত হয়। অতিরিক্ত কোলেস্টেরল বা বিলিরুবিন, পিত্তথলির স্বাভাবিকভাবে খালি না হওয়া এবং কিছু শারীরিক অবস্থার সঙ্গে পিত্তপাথরের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
পিত্তপাথরের ধরন
পিত্তপাথর সাধারণত কোলেস্টেরল বা রঞ্জকজাত (পিগমেন্ট) পাথর হিসেবে দেখা যায়। কিছু পাথরে একাধিক উপাদানের মিশ্রণও থাকতে পারে।
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
নারী, ৪০ বছরের বেশি বয়সী ব্যক্তি, স্থূলতায় ভোগা মানুষ এবং যাদের পরিবারে পিত্তপাথরের ইতিহাস রয়েছে, তাদের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। দ্রুত ওজন কমে যাওয়া, উচ্চ চর্বিযুক্ত ও কম আঁশযুক্ত খাবার এবং ডায়াবেটিসও ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
এ ছাড়া গর্ভাবস্থা, কিছু হরমোনজনিত বিষয় এবং নির্দিষ্ট কিছু রোগের ক্ষেত্রেও পিত্তপাথরের সম্ভাবনা বাড়তে পারে।
কী কী লক্ষণ দেখা দিতে পারে?
অনেকের ক্ষেত্রে অন্য কারণে করা আলট্রাসাউন্ডে আকস্মিকভাবে পিত্তপাথর ধরা পড়ে। উপসর্গ দেখা দিলে সাধারণত পেটের ওপরের ডান দিকে বা মাঝামাঝি অংশে তীব্র ও স্থায়ী ব্যথা হতে পারে। ব্যথা পিঠ বা অন্য অংশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। বমি বমি ভাব বা বমিও হতে পারে। ভারী খাবারের পর এ ধরনের ব্যথা দেখা দিতে পারে।
কোন লক্ষণগুলো বিপদের সংকেত?
তীব্র বা বাড়তে থাকা পেটব্যথার সঙ্গে জ্বর, কাঁপুনি, জন্ডিস, চোখ বা ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া, গাঢ় প্রস্রাব, ফ্যাকাসে মল কিংবা বারবার বমি হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। এসব লক্ষণ পিত্তনালিতে বাধা, পিত্তথলির প্রদাহ বা অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহের মতো জটিলতার ইঙ্গিত হতে পারে।
কীভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়?
পিত্তপাথর শনাক্তে সাধারণত আলট্রাসাউন্ড করা হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ত পরীক্ষা করে লিভারের কার্যকারিতা, বিলিরুবিনসহ বিভিন্ন বিষয় দেখা হয়। পিত্তনালিতে পাথর থাকার সন্দেহ হলে চিকিৎসক এমআরসিপি, সিটি স্ক্যান বা অন্যান্য পরীক্ষা করতে পারেন। কিছু ক্ষেত্রে ইআরসিপির মাধ্যমে পিত্তনালির পাথর অপসারণও করা যায়।
পিত্তপাথরের চিকিৎসা কী?
যাদের পিত্তথলিতে পাথর রয়েছে কিন্তু কোনো উপসর্গ নেই, তাদের অনেকেরই তাৎক্ষণিক চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পর্যবেক্ষণে রাখা যেতে পারে।
অন্যদিকে বারবার ব্যথা বা পিত্তপাথরজনিত জটিলতা দেখা দিলে পিত্তথলি অপসারণের অস্ত্রোপচার—কোলেসিস্টেকটমি—প্রধান চিকিৎসা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বর্তমানে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ল্যাপারোস্কোপিক বা ‘কিহোল’ সার্জারির মাধ্যমে এটি করা হয়।
কখন জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন?
পিত্তথলিতে তীব্র প্রদাহ, পিত্তনালিতে বাধা, জন্ডিস, সংক্রমণ বা অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহ হলে দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে। এসব অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি ও জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।
ওষুধে কি পাথর গলে যায়?
কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কোলেস্টেরল পাথর গলানোর জন্য ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে এটি সবার জন্য কার্যকর নয় এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এ ধরনের ওষুধ ব্যবহার করা উচিত নয়। পাথর পুনরায় তৈরি হওয়ার ঝুঁকিও থাকতে পারে। উপসর্গযুক্ত পিত্তপাথরের ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারই সাধারণত প্রধান চিকিৎসা।
পিত্তথলি অপসারণের পর স্বাভাবিক জীবন সম্ভব?
পিত্তথলি শরীরের জন্য অপরিহার্য অঙ্গ নয়। এটি অপসারণের পরও যকৃত পিত্তরস তৈরি করতে থাকে এবং তা সরাসরি ক্ষুদ্রান্ত্রে প্রবাহিত হয়। ফলে অধিকাংশ মানুষ পিত্তথলি ছাড়াই স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।
ল্যাপারোস্কোপিক অস্ত্রোপচারে সাধারণত ছোট ছিদ্রের মাধ্যমে পিত্তথলি অপসারণ করা হয়। এটি প্রচলিত ও তুলনামূলক দ্রুত সেরে ওঠার পদ্ধতি হলেও অন্য সব অস্ত্রোপচারের মতো এরও কিছু ঝুঁকি রয়েছে।
পিত্তপাথর প্রতিরোধে কী করবেন?
সব ক্ষেত্রে পিত্তপাথর প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। তবে ঝুঁকি কমাতে—
স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখতে হবে।
দ্রুত ও অতিরিক্ত ওজন কমানোর চেষ্টা এড়িয়ে চলতে হবে।
নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়াম করতে হবে।
ফল, শাকসবজি, পূর্ণ শস্য ও আঁশযুক্ত খাবার বেশি খেতে হবে।
অতিরিক্ত চর্বি ও অস্বাস্থ্যকর খাবার কমাতে হবে।
ডায়াবেটিস থাকলে তা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা
ভুল ধারণা: পিত্তথলিতে পাথর থাকলেই অস্ত্রোপচার করতে হয়।
বাস্তবতা: উপসর্গহীন পিত্তপাথরের ক্ষেত্রে অনেক সময় চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না।
ভুল ধারণা: ঘরোয়া বা বিকল্প চিকিৎসায় নিশ্চিতভাবে পাথর গলে যায়।
বাস্তবতা: এ ধরনের চিকিৎসা নেওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। নিজে নিজে চিকিৎসা করলে জটিলতা দেরিতে শনাক্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
ভুল ধারণা: পিত্তথলি অপসারণ করলে সারাজীবন হজমের সমস্যা হবে।
বাস্তবতা: অধিকাংশ মানুষ পিত্তথলি অপসারণের পর স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।
কখন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
পেটের ওপরের ডান দিকে তীব্র ব্যথা, কয়েক ঘণ্টা ধরে না কমা ব্যথা, জ্বর, বারবার বমি, জন্ডিস, চোখ হলুদ হয়ে যাওয়া বা গাঢ় রঙের প্রস্রাবের মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে তীব্র ব্যথার সঙ্গে জ্বর বা জন্ডিস থাকলে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে।
পিত্তথলিতে পাথর সাধারণ সমস্যা হলেও তা সবসময় উপেক্ষা করার মতো নয়। উপসর্গ দেখা দিলে সঠিক সময়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। পেটের ওপরের ডান দিকে বারবার ব্যথা হলে নিজে থেকে ওষুধ না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।