Image description

জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের জ্যেষ্ঠতা (গ্রেডেশন) তালিকা তৈরি ও গেজেট প্রকাশ নিয়ে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। নিয়মমাফিক জ্যেষ্ঠতা না মেনে তৈরি করা নতুন এ তালিকায় বিগত স্বৈরাচারী সরকারের অনুগত কয়েকজন কর্মকর্তাকে শীর্ষস্থানে রেখে পুনর্বাসন করা হয়েছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বঞ্চিত কর্মকর্তারা। বিপরীতে দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত ও যোগ্য কর্মকর্তারা আবার পিছিয়ে পড়েছেন।

অভিযোগ রয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রণীত আগের সঠিক ও পরিমার্জিত গ্রেডেশন তালিকাকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে সম্পূর্ণ বিতর্কিত প্রক্রিয়ায় নতুন এ প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। পদোন্নতিবঞ্চিত একাধিক কর্মকর্তার দাবি, নিয়ম লঙ্ঘন করে জ্যেষ্ঠদের পেছনে ফেলে জুনিয়রদের সামনে আনা হয়েছে। এর নেপথ্যে অনৈতিক আর্থিক লেনদেন ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো ঘটনা ঘটেছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

তবে বিতর্কিত এই তালিকা ও প্রজ্ঞাপনের বিষয়ে জানতে চাইলে সংসদ সচিবালয়ের মানবসম্পদ বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও সুবিধাপ্রাপ্তরা বিষয়টি এড়িয়ে যান। তারা এটিকে ‘সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া’ বলে দাবি করেন। অন্যদিকে বিশেষজ্ঞরা জানান, প্রশাসনিক জ্যেষ্ঠতার তালিকায় কেবল জ্যেষ্ঠতাই একমাত্র মানদণ্ড হওয়া উচিত।

জাতীয় সংসদ সচিবালয় ও সাম্প্রতিক প্রকাশিত দুটি গ্রেডেশন তালিকা পর্যালোচনা করে এসব তথ্যের সত্যতা মিলেছে।

সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সরকার প্রণীত গ্রেডেশন তালিকায় আবদুল মুনিম তালিকার ১ নম্বরে ছিলেন। গেজেটভুক্ত নতুন প্রণীত তালিকায় তার অবস্থান ২ নম্বরে। অনুরূপভাবে আগের ৫ নম্বরে থাকা কর্মকর্তার অবস্থান এখন ১০ নম্বরে। একই ভাবে যিনি ৬ নম্বরে ছিলেন, ক্রমসংখ্যা পিছিয়ে তার অবস্থান ঠেকেছে ১২তম নম্বরে। ঠিক একই ভাবে তালিকায় ৭ নম্বরের ব্যক্তি ১৩ এবং ৮ নম্বরে থাকা কর্মকর্তার ঠাঁই হয়েছে ১৪ নম্বরে।

সংসদ সচিবালয়ের ‘স’ ‘ম’ এবং ‘নি’ আদ্যাক্ষরের কর্মকর্তা নাম-পরিচয় গোপন রাখার শর্তে আমার দেশকে বলেছেন, বর্তমান তালিকায় যিনি ১ নম্বরে উঠে এসেছেন, ইউনূস সরকারের আমলে করা সমন্বিত জ্যেষ্ঠতার তালিকায় তার অবস্থান ছিল ১১তম। এই ১১তম কর্মকর্তা রাহাত আরা ইমাম প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন সংসদে। রাতের অন্ধকারে গ্রেডেশন তালিকা করে ত্বরিত গেজেট জারির ফলে সিনিয়র হওয়া সত্ত্বেও তাদের চাকরি করতে হবে জুনিয়র এই রাহাত আরার অধীনে। অথচ প্রশাসনিক কর্মকর্তা ওই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের অধীন দীর্ঘদিন চাকরি করেছেন।

তারা আরো অভিযোগ করেন, নতুন তালিকার পদোন্নতির ক্ষেত্রে ১ নম্বরে আনতে নজিরবিহীন অনিয়মের আশ্রয় নিতে হয়েছে সংসদ সচিবালয়ের নীতিনির্ধারকদের। তার জন্যই পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করে প্রথমে তাকে বঞ্চিতদের তালিকায় নেওয়া হয়। এরপর ওই প্রজ্ঞাপনে প্রথমে কমিটি অফিসার হিসেবে পদোন্নতি এবং পরে ওই একই প্রজ্ঞাপনে তাকে সিনিয়র কমিটি অফিসার পদে পদায়ন দেখানো হয় বলে সংক্ষুব্ধরা অভিযোগে জানিয়েছেন। নতুন গেজেটভুক্ত গ্রেডেশন তালিকায় শীর্ষস্থান পাওয়া সিনিয়র কমিটি অফিসার রাহাত আরা ইমাম আমার দেশকে বলেন, গ্রেডেশন তালিকা প্রণয়ন করেছে মানবসম্পদ বিভাগ। এ বিষয়ে তারাই ব্যাখ্যা দিতে পারবে। তিনি দাবি করেন, অতীতে তাকে যথাসময়ে পদোন্নতি দেওয়া হয়নি এবং সে কারণেই বর্তমান অবস্থান নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে মন্তব্য করতে চান না।

জ্যেষ্ঠতার তালিকায় কাটাছেঁড়া নিয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার আমার দেশকে বলেন, যোগ্যতা ও দক্ষতা দেখে পদোন্নতি হওয়া উচিত। কারণ, বর্তমানে মেধাশূন্যতার কারণে প্রশাসনে সংকট দেখা দিয়েছে। সেটার পুনরাবৃত্তি ঘটলে বিএনপি সরকারকে এর মাশুল গুনতে হবে।

এদিকে, জাতীয় সংসদ সচিবালয়ে জাতীয় বেতন স্কেল-২০১৫-এর পঞ্চম গ্রেডভুক্ত উপসচিব ও সমমান পদে পদোন্নতির লক্ষ্যে প্রণীত সমন্বিত চূড়ান্ত জ্যেষ্ঠতা তালিকায় চরম অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। গত ২৩ জুলাই প্রকাশিত বাংলাদেশ গেজেট বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, খসড়া তালিকার ১১ নম্বর ক্রমিকে থাকা সিনিয়র কমিটি অফিসার রাহাত আরা ইমামকে চূড়ান্ত তালিকায় ১ নম্বরে তুলে আনা হয়েছে। গত ১১ জুন জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে তার ষষ্ঠ গ্রেডে যোগদানের তারিখ প্রকৃত সময় (২৯ মার্চ ২০২৩) থেকে দুই বছর এগিয়ে দেখানোর কারণে তিনি জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের টপকে শীর্ষে উঠে আসেন। এমনকি নবম গ্রেডে তার মূল যোগদানের তারিখ ২২ জুন ২০১৫ হলেও তা ২৪ ডিসেম্বর ২০১৩ দেখানো হয়েছে। আইন ও নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে প্রজ্ঞাপনে কীসের ভিত্তিতে দিনক্ষণ পরিবর্তন করা হয়েছে, তার কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকারের উচ্চপদস্থ এক স্বজনের প্রভাব খাটিয়ে তিনি এই অতিরিক্ত জ্যেষ্ঠতার সুবিধা বাগিয়ে নিয়েছেন।

একই ভাবে খসড়া তালিকার ১২ নম্বরে থাকা উত্তম অধিকারীকে চূড়ান্ত তালিকায় ৬ নম্বরে আনা হয়েছে। বিপরীতে ২০১৯ সাল থেকে ষষ্ঠ গ্রেডভুক্ত ফিডার পদে কর্মরত সাব্বির মাহমুদ, নীলুফার ইয়াসমিন, মো. আরিফ ও রায়হানা ইয়াসমিনÑএই চার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে খসড়া তালিকার ৫ থেকে ৮ নম্বর ক্রমিক থেকে পিছিয়ে চূড়ান্ত তালিকায় যথাক্রমে ১০, ১২, ১৩ ও ১৪ নম্বরে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। তাদের পেছনে ফেলে ২০২১ ও ২০২৩ সালে ষষ্ঠ গ্রেডে পদোন্নতি পাওয়া উত্তম অধিকারী, আসিফ হাসান, মফিজুর রহমান, কফিলউদ্দীন মাহমুদ ও নীহার মণ্ডল সমন্বিত চূড়ান্ত জ্যেষ্ঠতা তালিকার সামনের সারিতে জায়গা করে নিয়েছেন।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিধি শাখার অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের মতে, ফিডার পদে (যে পদ থেকে পদোন্নতি দেওয়া হয়) যিনি জ্যেষ্ঠ, পদোন্নতির জ্যেষ্ঠতা তালিকায়ও তিনি অগ্রাধিকার পাবেনÑএটাই মূল নিয়ম। ফিডার পদে জুনিয়র কর্মকর্তাদের তালিকায় এগিয়ে রাখা চাকরি বিধিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তাছাড়া সংসদ সচিবালয় কর্মকর্তা ও কর্মচারী বিধিমালা অনুযায়ী ২০২১ সালের ২৫ অক্টোবরের আগে ‘সিনিয়র প্রটোকল অফিসার (এক্সটারনাল অ্যাফেয়ার্স)’ নামে কোনো পদের অস্তিত্বই ছিল না। অথচ এই পদে ২০২১ সালের পর পদোন্নতি পাওয়া কর্মকর্তা কীভাবে তার আগের পদোন্নতিপ্রাপ্তদের চেয়ে জ্যেষ্ঠ হন, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। বিধিমালা অনুযায়ী উপসচিব পদে পদোন্নতির জন্য ফিডার পদে তিন বছরের অভিজ্ঞতাসহ নবম থেকে ষষ্ঠ গ্রেডে মোট ১০ বছরের অভিজ্ঞতা প্রয়োজন, যা বঞ্চিত চার কর্মকর্তা অনেক আগেই অর্জন করেছেন।

প্রকাশিত জ্যেষ্ঠতা তালিকা নিয়ে সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি জ্যেষ্ঠতা তালিকায় রাতারাতি সামনে চলে আসা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। আসিফ হাসান সাবেক ডেপুটি স্পিকারের পিএস এবং সাবেক এক হুইপের পিএস হিসেবে ক্ষমতার দাপট দেখিয়েছেন। মফিজুর রহমান ছিলেন মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে কারাবন্দি সাবেক শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনির এপিএস, যার বিরুদ্ধে আগে মাদক সংশ্লিষ্টতার খবরও সংবাদমাধ্যমে এসেছে।

এছাড়া নীহার মণ্ডল ও স্বপন কুমার বিশ্বাস বিগত সরকারের আমলজুড়ে গোপালগঞ্জের আঞ্চলিক পরিচয়ে প্রভাব বিস্তার করেছেন। স্বপন কুমার বিশ্বাস তো নিয়মিত অফিস না করেও ওভারটাইম ও আনুষঙ্গিক সুবিধা ভোগ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। উত্তম অধিকারী সংসদ সচিবের দপ্তরে কর্মরত অবস্থায় নিজের পদোন্নতির জন্য নতুন পদ সৃজন করে নিয়েছেন এবং ২ নম্বর ক্রমিকে থাকা আব্দুল মুনিমও অশুভ প্রভাব খাটানোর অভিযোগে অভিযুক্ত।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জ্যেষ্ঠতা তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে প্রথা অনুযায়ী জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের লিখিত মতামত নেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। শুনানি চলাকালে তড়িঘড়ি করে জনপ্রশাসনের একজন প্রতিনিধিকে ডেকে এনে তাৎক্ষণিক মতামত নেওয়া হয়, যা প্রভাবশালী চক্রটির মাধ্যমে প্রভাবিত ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। লিখিত মতামত নেওয়া হলে তা ভবিষ্যতে আইনি রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করা যেত, যা কৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। অর্থমূল্যের বিনিময়ে ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে চূড়ান্ত তালিকায় নিজেদের নাম উপরে তুলে আনা হয়েছে বলে ক্ষুব্ধ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অভিযোগ করেছেন।

সংসদ সচিবালয়ের সচিব ব্যারিস্টার গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া আমার দেশকে বলেন, নতুন প্রণীত গ্রেডেশন তালিকার বিষয়ে তার কিছুই জানা নেই। তাই নথি দেখা ছাড়া এ বিষয়ে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি। অনুরূপভাবে সংসদ সচিবালয়ের মানবসম্পদ বিভাগের যুগ্ম সচিব মাসুমা খানম গ্রেডেশন তালিকা প্রণয়নের বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দিতে রাজি হননি। আমার দেশকে তিনি বলেন, এটি প্রশাসনিক ও অভ্যন্তরীণ বিষয় হওয়ায় ফোনে মন্তব্য করা সম্ভব নয়। এ বিষয়ে জানতে হলে আপনাকে সরাসরি আমার অফিসে এসে কথা বলতে হবে এবং তথ্য দেওয়া যাবে কি না, তা তখন বিবেচনা করা হবে।

এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান আমার দেশকে বলেন, জ্যেষ্ঠতার তালিকায় যদি প্রকৃত জ্যেষ্ঠতার নীতি অনুসরণ না করা হয়ে থাকে, তবে তা প্রশাসনিক অনিয়ম। আর কোনো আর্থিক বা অন্য ধরনের প্রভাবের মাধ্যমে তালিকা প্রণয়ন হয়ে থাকলে তা দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের শামিল। সেক্ষেত্রে দায়ীদের চিহ্নিত করে জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত।