সবুজ পাহাড়ের আড়ালে চলছে অদৃশ্য শাসনব্যবস্থা। সৌন্দর্যের আড়ালে গড়ে উঠেছে রক্তাক্ত এক বাস্তবতা। আইন নয়, অস্ত্রের শক্তিতে প্রভাব বিস্তার করছে সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো। বন্দুকের নলের সামনে অসহায় সাধারণ মানুষ, আর ভয়-আতঙ্কের ওপর দাঁড়িয়ে বিস্তৃত হচ্ছে আধিপত্যের লড়াই। সংঘর্ষ, অপহরণ, পথরুদ্ধ করে চাঁদাবাজি ও অবৈধ অস্ত্রের ছায়ায় দিন কাটছে বহু মানুষের। ভয় এবং অনিশ্চয়তা সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী। পার্বত্য চট্টগ্রামের সক্রিয় বিভিন্ন আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন এ কাজ করছে। গত এক বছরেই পার্বত্য চট্টগ্রামে ১০৫টি সংঘর্ষে প্রাণ গেছে ২৬ জনের। একই সময়ে অপহরণের শিকার হয়েছেন ৪৮ জন।
বছরে এক হাজার কোটি টাকার বেশি চাঁদাবাজির অভিযোগও উঠে এসেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। সূত্র জানায়, পাহাড়ে বর্তমানে ৬টি সংগঠন কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে-পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস মূল), জেএসএস (সংস্কার), ইউনাইটেড পিপল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ মূল), ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) জেএসএস (মূল), কুকিচিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) এবং মারমা ন্যাশনাল পার্টি (এমএনপি) অন্যতম। এসব সংগঠনের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার কেন্দ করে সংঘর্ষ বাড়ছে। এর মধ্যে জেএসএস (মূল) এবং ইউপিডিএফের (মূল) সংঘর্ষ সবচেয়ে বেশি। সংঘর্ষের বেশির ভাগ ঘটনাই সীমান্তবর্তী এলাকায় হওয়ায় নিরাপত্তা বাহিনী পৌঁছানোর আগেই সশস্ত্র সদস্যরা সীমান্ত পেরিয়ে পালিয়ে যায়।
চাঁদাবাজি বছরে এক হাজার ৫৪ কোটি টাকা : সূত্র জানায়, পাহাড়ে চলাচলকারী যানবাহন, বাজার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, ঠিকাদার, উন্নয়ন প্রকল্প, এমনকি কৃষকদের কাছ থেকেও নিয়মিত চাঁদা আদায় করা হয়। এতে বিভিন্ন সংগঠনের বার্ষিক চাঁদাবাজির পরিমাণ এক হাজার ৫৪ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। যেসব সংগঠন চাঁদাবাজি করছে এর মধ্যে রয়েছে-জেএসএস (মূল) ৩৭৫ কোটি টাকা, ইউপিডিএফ ৩১৪ কোটি টাকা, ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) ১৮১ কোটি, জেএসএস (সংস্কার) ১৭৮ কোটি, কেএনএফ দুই কোটি এবং এমএনপি দুই কোটি টাকা চাঁদাবাজি করছে। জেলাভিত্তিক হিসাবে রাঙামাটিতে ৭৩৪ কোটি টাকা, খাগড়াছড়িতে ২৫৮ কোটি টাকা এবং বান্দরবানে ৬২ কোটি চাঁদা আদায় হয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কেএনএফের তৎপরতা কিছুটা কমেছে।
হত্যা ও অপহরণ : সূত্র জানায়, গত এক বছরেই পার্বত্য চট্টগ্রামে ১০৫টি সংঘর্ষে প্রাণ গেছে ২৬ জনের। একই সময়ে অপহরণের শিকার হয়েছেন ৪৮ জন। নিহতদের মধ্যে ২৪ জন উপজাতি ও দুজন বাঙালি। আহতদের মধ্যে ১৬ জন উপজাতি ও ২৩ জন বাঙালি। চাঁদা আদায় ও সংগঠনগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব কেন্দ্র করে অপহরণের ঘটনা বাড়ছে। গত এক বছরে ৪৮ জনকে অপহরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৯ জন উপজাতি এবং ২৯ জন বাঙালি। অপহৃতদের মধ্যে ব্যবসায়ী, বাগান ব্যবস্থাপক, নির্মাণ শ্রমিক, মোবাইল টাওয়ার মেকানিক ও গাড়িচালকরাও রয়েছেন।
আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ : সূত্র জানায়, মিয়ানমারের বিদ্রোহী সংগঠন আরাকান আর্মি ইউপিডিএফ (মূল) ও কেএনএফের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। কেএনএফ সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়া, অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহ এবং সীমান্ত ব্যবহার করে রসদ সংগ্রহ করা হচ্ছে।
সরেজমিন অনুসন্ধান : কেএনএ (কুকিচিন ন্যাশনাল আর্মি) সাবেক সদস্য জোসেফ বম (নিরাপত্তাজনিত কারণে ছদ্মনাম)। রুমা থানার এক গোপন আস্থানায় কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি জানান, ২০২২ সালে কেএনএ’র সঙ্গে যুক্ত হই। ট্রেনিং নিয়েছি। টাইগার পাড়ায় একটি মিনি ক্যাম্প ছিল। সেই ক্যাম্প থেকেই এলাকার মানুষের কাছ থেকে টাকা পয়সা (চাঁদা) নেওয়া হতো। বাজার থেকে টাকা নেওয়া হতো। তিনি জানান, এই এলাকার বেশির ভাগ মানুষ নিরীহ ও গরিব। এদের অনেকের ওপর অত্যাচার করা হয়েছে। কেউ এলাকা ছেড়ে অন্য জায়গায় চলে গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছে জোসেফ বম। প্রশ্ন ছিল, এখন কেমন আছেন? জবাবে তিনি বলেন, এখন মোটামুটি শান্তিতে আছি। আমি আর তাদের সঙ্গে জড়িত নই। তবে কিছুটা ভয়ে আছি। তারা আমার ওপর আক্রমণ করতে পারে।
জেএসএসের সাবেক সদস্য থেইন মং মারমা (ছদ্মনাম)। বয়স ৩৭ বছর। তিনি বলেন, ২০২২ সালের শুরুর দিকে জেএসএসে যোগ দিয়েছি। এরপর ভারতের ভেতরে একটি পাহাড়ে ১৫ দিন ট্রেনিং নিয়েছি। বিভিন্ন জায়গায় কাজ করেছি। ট্রেনিং নেওয়ার পর শুরু করেছিলাম খাগড়াছড়ি থেকে। পরে রাঙ্গামাটিতে আসি। সেখানে নৌকার মধ্যে অনেক দিন ছিলাম। ওই সময়ে আমার দায়িত্ব ছিল রান্না করা। বাবুর্চি হিসাবে কাজ করেছি। দুটি গ্রুপের রান্না করেছি। যারা অবিবাহিত তাদের থাকা খাওয়ার পর দল থেকে ৫০০ টাকা পকেট খরচ দিত। আমাকে বাড়িতে পাঠানোর জন্য ১৫শ টাকা দিত। তিনি বলেন, যাদের পরিবার আছে তাদেরকে বেশি দিত। সেটা দেড় থেকে দুই হাজার টাকার মতো। ছেলে-মেয়ে থাকলে আরেকটু বেশি। এভাবে আমি চার বছর তাদের সঙ্গে কাজ করেছি। এখন আর তাদের সঙ্গে যোগাযোগ নেই। ৯ মাস আগে সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে এসেছি। এখন ভালোই আছি। জুম চাষ করে খাই।’
উন্নয়ন প্রকল্পেও বাধা : ডকুমেন্টে বলা হয়েছে, চাহিদামতো চাঁদা না পেলে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে বাধা দেওয়া হয়। ঠিকাদার, শ্রমিক ও যানবাহনের চালকদের ভয়ভীতি দেখানো হয়। এতে সরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ব্যাহত হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক প্রচারণা : সূত্র জানায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বাংলাদেশ ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘের আদিবাসীবিষয়ক স্থায়ী ফোরামে (ইউএনপিএফআইআই) বাংলাদেশবিরোধী বক্তব্য উপস্থাপন করছে।
তবে সন্ত্রাসের বিষয়টি মানতে নারাজ পুলিশ। জানতে চাইলে বান্দরবানের পুলিশ সুপার (এসপি) মো. ওহাবুল ইসলাম খন্দকার যুগান্তরকে বলেন, আমরা নিরাপদে আছি। এখানে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত কোনো সমস্যা নেই। তিনি বলেন, আমি তিন মাস এখানে আছি। কিন্তু সেরকম কোনো সমস্যা দেখিনি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এক বছরে ২৬ জন নিহত হওয়ার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু সমতলে এর চেয়ে বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে। আর চাঁদাবাজির বিষয়ে যেসব কথা বলা হচ্ছে, তাও সমতলের চেয়ে বেশি না। পুলিশ সুপার বলেন, পাহাড়ে যে দুর্ঘম পথ, সেই পথ বেয়ে অস্ত্র আসা কঠিন।
মূল শহর পর্যন্ত আসতে অনেক চেকপোস্ট পাড়ি দিতে হয়। এই চেকপোস্ট দিয়ে অস্ত্র আসতে পারে না। মানুষ কেন থানায় কম যাচ্ছে, এ প্রশ্নের জবাবে ওহাবুল ইসলাম খন্দকার বলেন, এখানে অনেক সমস্যা হেডম্যানের মাধ্যমে সমাধান হয়ে যায়। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই থানায় আসার প্রয়োজন হয় না। তবে অস্বাভাবিক পরিস্থিতির কথা মানতে নারাজ পুলিশ। এ ব্যাপারে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান সন্তু লারমার মন্তব্য পাওয়া যায়নি।