দীর্ঘ তিন বছর পর অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) সিনেট অধিবেশনে ৫০৩ কোটি ৪৭ লাখ ৩৭ হাজার টাকার বাজেট অনুমোদন হয়েছে। নতুন বাজেটে টিএসসি, আবাসিক হল, আধুনিক গবেষণাগার, হাসপাতাল ও স্টেডিয়ামসহ একাধিক বড় উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরা হয়েছে। তবে এসব পরিকল্পনার বিপরীতে গবেষণা অনুদান খাতে মূল বাজেটে রাখা হয়নি কোনো নির্দিষ্ট বরাদ্দ। বিপুল পরিকল্পনা আর সীমিত বরাদ্দের এই সমীকরণে এখন প্রশ্ন, পরিকল্পনার কতটা বাস্তবায়ন করতে পারবে এই প্রশাসন?
শনিবার (৮ আগস্ট) চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৬তম বার্ষিক সিনেট অধিবেশনে এ বাজেট অনুমোদন করা হয়। সকাল সাড়ে ১১টায় অধিবেশনের প্রথম পর্ব এবং দুপুর ২টায় দ্বিতীয় পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-ফোরকান। সভা সঞ্চালনা করেন ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মো. হাছান মিয়া।
একই অধিবেশনে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ৪৮৯ কোটি ৯৯ লাখ ৭৯ হাজার টাকার সংশোধিত রাজস্ব বাজেটও অনুমোদন করা হয়।
বাজেটের ৯৭ শতাংশই আবর্তক ব্যয়ে:
চবির নতুন বাজেটের বড় অংশই যাচ্ছে আবর্তক ব্যয়ে। বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে আবর্তক অনুদান বাবদ ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৮৮ কোটি ৪৮ লাখ ৯ হাজার টাকা। মোট ৫০৩ কোটি ৪৭ লাখ ৩৭ হাজার টাকার বাজেটের হিসাবে এ ব্যয় প্রায় ৯৭ শতাংশ।
এর মধ্যে বেতন-ভাতা বাবদ ২৯৩ কোটি ২০ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ রয়েছে। যা মোট বাজেটের ৫৮ শতাংশ। শুধু শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের বেতন, কর্মচারীদের বেতন, বিশেষ সুবিধা এবং ভাতাসহ এ খাতেই বাজেটের অর্ধেকের বেশি অর্থ চলে যাচ্ছে।
বাজেট নথিতে দেখা যায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষক ছিলেন ৯৭৭ জন। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এ সংখ্যা ১ হাজার ১৬ জনে উন্নীত করায় বাজেট বাড়তি ধরা হয়েছে। একই সময়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা ১ হাজার ৮৯৮ থেকে বেড়ে ১ হাজার ৯৫৪ জন করার পরিকল্পনা প্রশাসনের।
এ ছাড়া পণ্য ও সেবা বাবদ বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৯২ কোটি ২ লাখ ৩৭ হাজার টাকা। পেনশন ও অন্যান্য সুবিধা, গবেষণা অনুদান, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য অনুদানও আবর্তক ব্যয়ের অংশ হিসেবে রাখা হয়েছে।
গবেষণায় বরাদ্দ শূন্য:
বাজেটের সবচেয়ে আলোচিত দিকগুলোর একটি গবেষণা খাত। একটি বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বে তাদের গবেষণা দিয়েই পরিচিতি তৈরি করতে পারে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট নথিতে ‘গবেষণা অনুদান’ খাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের চাহিদা ২৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা দেখানো হলেও মূল বাজেটের বরাদ্দের ঘরে এ খাত ফাঁকা রাখা হয়েছে।
এর আগের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে গবেষণা অনুদান খাতে ১২ কোটি ৭০ লাখ টাকা বরাদ্দ ছিল। তবে মূল বাজেটে শূন্য দেখানো হলেও বাজেট নথির নিচের নোটে বলা হয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের গবেষণা খাতের বরাদ্দ পরবর্তী সময়ে প্রকল্পের মাধ্যমে পরিচালিত হবে। ফলে মূল রাজস্ব বাজেটে এ খাতে সরাসরি বরাদ্দ না থাকলেও পরবর্তী প্রকল্পের মাধ্যমে অর্থায়নের সুযোগ রাখা হয়েছে।
এদিকে সিনেট অধিবেশনে উপাচার্য লিখিত বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কার্যক্রমে গত অর্থবছরের অর্থায়নের তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শিক্ষকদের গবেষণার জন্য ১০ কোটি টাকা অনুদান দেওয়া হয়েছে। এমফিলসহ অন্যান্য গবেষণা কার্যক্রমে ৬৭ লাখ টাকা এবং পিএইচডি ও মাস্টার্স থিসিসে অনুদান চলমান রয়েছে। আগামী অর্থবছরে গবেষণা অনুদানের জন্য ইউজিসির কাছে ২৯ কোটি টাকার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
মূলধন খাতে চাহিদার অর্ধেকেরও কম:
বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী সম্পদ ও অবকাঠামোগত বিভিন্ন খাতে ব্যয়ের জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মূলধন অনুদান রাখা হয়েছে ১৪ কোটি ৯৯ লাখ ২৮ হাজার টাকা। তবে এসব খাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট চাহিদা ছিল ৬৮ কোটি ১০ লাখ টাকা।
এর মধ্যে ল্যাবরেটরি ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি কেনার জন্য চাহিদা ছিল ৩৫ কোটি ১০ লাখ টাকা, বিপরীতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৮ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। যানবাহন খাতে ২০ কোটি টাকার চাহিদার বিপরীতে বরাদ্দ ২ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতে ৮ কোটি টাকা চাহিদার বিপরীতে বরাদ্দ ২ কোটি টাকা। অন্যান্য মূলধন খাতে ৫ কোটি টাকার চাহিদার বিপরীতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২ কোটি টাকা। অর্থাৎ গবেষণা, ল্যাবরেটরি ও তথ্যপ্রযুক্তির মতো উন্নয়নমূলক খাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের চাহিদার তুলনায় বরাদ্দের বড় ঘাটতি রয়েছে।
আয়ের ৯৩ শতাংশই ইউজিসি থেকে:
চবির ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের অর্থের বড় অংশই আসবে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) মাধ্যমে। বাজেট নথি অনুযায়ী, ইউজিসি থেকে অনুদান হিসেবে ৪৬৭ কোটি ৪৭ লাখ ৩৭ হাজার টাকা পাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এটি মোট বাজেটের প্রায় ৯৩ শতাংশ। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আয় ধরা হয়েছে ৩৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট বাজেটের মাত্র ৭ শতাংশের মতো অর্থ নিজস্ব উৎস থেকে আসবে।
টিএসসিতে নির্মাণে বরাদ্দ ৫০ কোটি:
বাজেটে সরাসরি টিএসসি নির্মাণের পুরো অর্থ না থাকলেও চলতি অর্থবছরে ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) নির্মাণে ৪৯ কোটি ৩৩ লাখ ৬৭ হাজার টাকার উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রণয়ন করা হয়েছে। একই সঙ্গে একাডেমিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং গবেষণা সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ৬৭৮ কোটি ১৪ লাখ ৫৪ হাজার টাকার আরেকটি ডিপিপি পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে বলে অধিবেশনে জানানো হয়।
এ ছাড়া প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে শিক্ষার্থীবান্ধব ক্যাম্পাস গড়ে তোলার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা জানান উপাচার্য। এর আওতায় ১০টি ১০ তলা আবাসিক হল, বিদেশি শিক্ষার্থী ও গবেষকদের জন্য হল, একাধিক একাডেমিক ভবন, ব্লু-ইকোনমি রিসার্চ সেন্টার, কেন্দ্রীয় জাদুঘর, গ্রন্থাগারের দ্বিতীয় ভবন, স্টেডিয়াম, সুইমিং পুল, আধুনিক গবেষণাগার, ৫০ শয্যার হাসপাতাল, ডে-কেয়ার সেন্টার, টিচার্স ডরমিটরি, ওয়াকওয়ে ও ফুডকোর্ট নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চক্ষমতার ওয়াই-ফাই, আইওটি সেন্সর, নিরাপত্তা ক্যামেরা ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর রিয়েল-টাইম তথ্যসেবা চালুর কার্যক্রম চলছে বলেও জানান তিনি। পরীক্ষা-সংক্রান্ত কার্যক্রম অটোমেশনের আওতায় আনা এবং স্বাস্থ্যসেবার আধুনিকায়নের পাশাপাশি ৫০ শয্যার মেডিকেল সেন্টার প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরা হয়। তবে নতুন বাজেটে পরবর্তী সমাবর্তন ও কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) নির্বাচনের জন্য কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি।
তিন বছর পর সিনেট, প্রত্যাখান চাকসুর:
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশেষ সিনেট অধিবেশন হয়েছিল ২০২৩ সালের ৩০ জুলাই। এরপর প্রায় তিন বছর পর এবার ৩৬তম বার্ষিক সিনেট অধিবেশন অনুষ্ঠিত হলো। যদিও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ১৯৭৩ অনুযায়ী বছরে অন্তত একবার সিনেট অধিবেশন আয়োজনের বিধান রয়েছে।
চবির সিনেটে ১২টি ক্যাটাগরিতে মোট ১০২টি সদস্য পদ রয়েছে। এর মধ্যে শিক্ষার্থীদের জন্য পাঁচটি পদ নির্ধারিত থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রায় ছয় দশকেও এসব পদে নির্বাচন হয়নি। ফলে এবারের সিনেটেও কোনো নির্বাচিত ছাত্র প্রতিনিধি ছিলেন না। তবে চাকসুর প্রতিনিধিদের পর্যবেক্ষক হিসেবে অধিবেশনে আমন্ত্রণ জানানো হলেও সিনেট অধিবেশন প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা দেয় চাকসু। এদিন সকালে চাকসু কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেওয়া হয়।
চাকসুর অভিযোগ, সিনেটে শিক্ষার্থীদের পাঁচজন নির্বাচিত প্রতিনিধি থাকার বিধান থাকলেও নির্বাচন না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে সরাসরি প্রতিনিধিত্ব থেকে বঞ্চিত। পাশাপাশি আওয়ামীপন্থি এবং জুলাই-আগস্ট আন্দোলন নিয়ে বিতর্কিত অবস্থান নেওয়া শিক্ষকদের সিনেটে অংশগ্রহণের অভিযোগ তুলে অধিবেশন প্রত্যাখ্যান করে সংগঠনটি।
তবে চাকসুর নির্বাচিত ছাত্রদল প্যানেলের এজিএস আইয়ুবর রহমান তৌফিক ও সহক্রীড়া সম্পাদক তামান্না মাহবুব প্রীতি সিনেট অধিবেশনে অংশ নেন।
চাকসুর পক্ষ থেকে পরবর্তী চাকসু, হল সংসদ ও সিনেট নির্বাচন আয়োজনের জন্য বাজেট নিশ্চিত করা, আবাসিক হল সংস্কার ও আবাসন সক্ষমতা বাড়ানো, আবাসন সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের আবাসন ভাতা, শাটল ট্রেন ও বাসসেবা বৃদ্ধি, টিএসসি ও মুক্তমঞ্চ নির্মাণসহ ১৯ দফা দাবি জানানো হয়।
এদিকে সিনেট অধিবেশন ঘিরে ক্যাম্পাসে পৃথক কর্মসূচি পালন করে ছাত্রশিবির, ছাত্রদল, জাতীয় ছাত্রশক্তি ও ভয়েস অব স্টুডেন্ট। শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব না থাকা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং বিতর্কিত শিক্ষকদের অংশগ্রহণের আপত্তি জানিয়ে অবস্থান কর্মসূচি ও বিক্ষোভ মিছিল করে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির চবি শাখা।
এসব কর্মসূচির মধ্যে আওয়ামী লীৃগপন্থি হিসেবে পরিচিত আটজন শিক্ষক সিনেট অধিবেশনে অংশ নিতে পারেননি বলে জানা গেছে।
সভায় শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-আমীন এবং উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মো. সফিকুল ইসলাম। এ ছাড়া সিনেট সদস্য হিসেবে সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম, এরশাদ উল্লাহ, গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী ও সাঈদ আল নোমান বক্তব্য দেন। এ ছাড়া সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদের ডিন, ও সিনেট সদস্যবৃন্দ অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন