ভবিষ্যতে কোনো নির্বাচিত সরকার যাতে ক্ষমতায় গিয়ে স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে না পারে, সেজন্য প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ দুই মেয়াদে সীমাবদ্ধ করার বিধান সংবিধানে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে সংসদের উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের মধ্যে কার্যকর ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’ নিশ্চিত করার পরিকল্পনাও রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী জনআকাঙ্ক্ষা ও জনপ্রত্যাশা পূরণে রাষ্ট্রকাঠামোর এই গণতান্ত্রিক সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আজ শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবন মিলনায়তনে জুলাই গণঅভ্যুত্থান ২০২৪-এর দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত ‘ফ্যাসিস্ট সরকার পতনে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ভূমিকা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বললেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাদা দল ও ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইউট্যাব) যৌথ উদ্যোগে এ আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন ঢাবি সাদা দলের আহ্বায়ক ও ইউট্যাবের মহাসচিব অধ্যাপক ড. মো. মোর্শেদ হাসান খান। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ধারণ করে ‘ইস্পাতকঠিন’ জাতীয় ঐক্য বজায় রাখতে হবে। একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক চর্চা, সহনশীলতা ও সংস্কারের মাধ্যমে রাষ্ট্রকাঠামোকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদের অধীনে যে অন্তর্বতী সরকার গঠিত হয়েছিল, সেটি ছিল দেশের গণতন্ত্রকামী মানুষের দীর্ঘ আন্দোলনের আকাঙ্ক্ষার ফল। দীর্ঘদিনের জুলুম-নির্যাতন, গুম-খুন ও ভোটাধিকার হরণের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন, বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলোর সংবিধান সময়ের সঙ্গে সমাজের প্রয়োজন ও মানুষের প্রত্যাশার আলোকে সংশোধন করা হয়েছে। বাংলাদেশেও গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী জনআকাঙ্ক্ষা ও জনপ্রত্যাশা পূরণে সংবিধান গণতান্ত্রিক উপায়ে সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষার্থী ও তরুণদের উদ্দেশ্যে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, রাজনৈতিক অপরিপক্বতার পরিচয় দিয়ে উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়া উচিত নয়। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের ফাঁদে ফেলার অপচেষ্টা চলছে। শিক্ষার্থীদের ধৈর্য, সহনশীলতা ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে প্রতিবাদ করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তরুণ প্রজন্মকে দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্মাণে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের তাগিদ দেন।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক হবে সমতার ভিত্তিতে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন, দুই দেশের সম্পর্ক হতে হবে পারস্পরিক মর্যাদা, সম্মান ও সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে। ভারতের মাটিতে বসে দণ্ডিত ও পলাতক আসামি শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশবিরোধী বক্তব্য বা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর সুযোগ দেওয়া এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক প্রত্যাশা করা দুটি অবস্থান পরস্পরবিরোধী। আমাদের প্রত্যাশা ভারত সরকার বিষয়টি অনুধাবন করবে এবং ‘হাসিনা কার্ড’ খেলা বন্ধ করবে।
আলোচনা সভায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের সদস্যরাও বক্তব্য দেন। শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের ভাই মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ, শহীদ ওয়াসিম আকরামের পিতা শফিউল আলম, শহীদ আবু সাঈদের ভাই মো. আবু হোসেন এবং শহীদ একরামুল হক সাজিদের মা নাজমা খাতুন লিপি অনুষ্ঠানে তাদের অনুভূতি তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আত্মোৎসর্গকারী শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়। পরে শহীদ পরিবারের সদস্যদের হাতে বিশেষ সম্মাননা স্মারক তুলে দেওয়া হয়। আলোচনা সভা শেষে জুলাই গণঅভ্যুত্থান উপলক্ষে আয়োজিত বিশেষ আলোকচিত্র প্রদর্শনী ঘুরে দেখেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।