দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে বাংলাদেশে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ও রাজপথের সংগ্রামে প্রথম সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শ্যামল মালুম। বিগত জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ছাত্রদলের হয়ে রাজপথে ছিলেন এই ছাত্রনেতা। সম্প্রতি অতিথি হয়ে এসছিলেন এশিয়া পোস্টের ধারাবাহিক অনুষ্ঠান আলাপনে। দীর্ঘ এই রাজনৈতিক লড়াই, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান, ছাত্ররাজনীতির গুণগত পরিবর্তন এবং দলের ভবিষ্যৎ ভিশন নিয়ে কথা বলেছেন। সঞ্চালনা করেছেন রাহাত রূপান্তর।
এশিয়া পোস্ট: আপনি দীর্ঘদিন ধরে ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন এবং এবার সভাপতি পদপ্রত্যাশী। আপনার ছাত্ররাজনীতিতে আসার শুরুর গল্প এবং রাজনৈতিক দীক্ষা সম্পর্কে জানতে চাই।
শ্যামল মালুম: আমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেশন ২০০৭-০৮। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার প্রথম দিক থেকেই আমি ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত ছিলাম। আমার গ্রামের বাড়ি নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ থানায়। আমার জন্ম যেখানে, আমাদের সেই গ্রামে ঐতিহাসিকভাবেই সিংহভাগ মানুষ বিএনপির রাজনৈতিক আদর্শের সমর্থক। ফলে ছোটবেলা থেকেই আমি এই রাজনৈতিক ঘরানা দেখে বড় হয়েছি। আমার যে রাজনৈতিক গ্রুমিং বা হাতেখড়ি, তা মূলত আমার নিজস্ব গ্রাম এবং এলাকা থেকেই হয়েছে। কলেজ শেষ করে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম, তখন প্রথম থেকেই আমি ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের খোঁজখবর নেওয়া শুরু করি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার নিজের এলাকার বেশ কয়েকজন বড় ভাই তখন ছাত্রদল করতেন। তাদের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। সেখান থেকে আমি ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে পড়ি এবং এখন পর্যন্ত রাজপথের সেই ধারাতেই পথ চলছি।
এশিয়া পোস্ট: দেশের এত বড় বড় ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে ছাত্রদলের কোন বিশেষ দিকটি আপনাকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করেছিল, যার কারণে আপনি অন্য কোনো দল না করে ছাত্রদলকেই বেছে নিলেন?
শ্যামল মালুম: আসলে ছাত্ররাজনীতিতে বা বিএনপির রাজনীতিতে আমার যেভাবে আগমন ঘটেছে, তা ছোটবেলা থেকেই পারিবারিকভাবে গড়ে উঠেছে। তাই আলাদা করে কোনো বিশেষ কারণ বা তাত্ত্বিক ব্যাকরণ খোঁজার সুযোগ বা প্রয়োজন আমার হয়নি। শৈশব থেকে যারা একটি সংগঠনের আবহ ও আদর্শের সঙ্গে বড় হয়, তাদের মনে দলটির প্রতি গভীর ভালোবাসা ও আবেগ তৈরি হয়। পাশাপাশি পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি ও পরিবেশের কারণে অনেকেই এই পথে চলে আসেন। পরবর্তীতে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতিতে সরাসরি যুক্ত হলাম, তখন দিনদিন আমার বোঝার পরিধি আরও বিকশিত হয়েছিল। আমি যে আদর্শিক সংগঠনে যুক্ত আছি, সেটি আসলে কতটা যৌক্তিক ও ইতিবাচক, তা গভীর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মূল্যায়ন করার সুযোগ পেয়েছিলাম। আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই, তখন ওয়ান-ইলেভেনের সরকার অর্থাৎ ফখরুদ্দিন-মইনুদ্দিনের শাসনকাল ছিল। সেই সময়ে ক্যাম্পাসে ছাত্রদল, ছাত্রলীগ এবং অন্যান্য ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে একটি রাজনৈতিক সহাবস্থান বা সমান্তরাল অবস্থান ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে আমরা দেখলাম, ২০০৯ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর পুরো বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ বদলে গেল। ছাত্রলীগ একে একে দেশের সব শিক্ষাপীঠের ক্যাম্পাস একচ্ছত্রভাবে দখল করে নিল এবং অন্য কোনো ছাত্র সংগঠনকে ন্যূনতম রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা তো দূরের কথা, ক্যাম্পাসে প্রবেশের অধিকার পর্যন্ত দেয়নি।
এশিয়া পোস্ট: বিগত ১৭ বছর আওয়ামী শাসনামলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে বিরোধী দলের রাজনীতি করা কতটা কঠিন ছিল এবং এটি আপনার শিক্ষাজীবনে কী প্রভাব ফেলেছিল?
শ্যামল মালুম: ২০০৯ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর পুরো দেশের ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্রলীগের একচ্ছত্র আধিপত্য তৈরি হয়েছিল। এর আগে যখন বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল, আমি যতটুকু প্রবীণদের কাছে শুনেছি, তখনো বিরোধী দলে থাকা সত্ত্বেও ছাত্রলীগ হলের ভেতরে সহাবস্থানে অবস্থান করতে পারত। যেমন—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মহসিন হল, জগন্নাথ হল এবং জহুরুল হক হলের মতো গুরুত্বপূর্ণ হলগুলোতে ছাত্রলীগ অবস্থান করত, আর সরকারি দল হিসেবে ছাত্রদল মহসিন হলে থাকত। কিন্তু ২০০৯ সালের পর ছাত্রলীগ টোটাল রাজনীতিটাকে বদলে দিল।
আমাদের জন্য হলে থাকা, ক্লাস করা এবং পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়া অত্যন্ত কঠিন ও সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছিল। সেটি আমাদের সবার জন্যই অত্যন্ত দুঃসহ একটি সময় ছিল। শিক্ষাজীবনের ত্যাগের কথা যদি বলি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম চার সেমিস্টারে আমার একাডেমিক ফলাফল অত্যন্ত চমৎকার ছিল। আমি বিভাগে মেধা তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে ছিলাম। কিন্তু ২০১২-১৩ সালের পর যখন রাজপথে হরতাল-অবরোধসহ তীব্র আন্দোলন শুরু হলো, তখন আমি নিয়মিত ক্লাসে অংশ নিতে পারতাম না। ক্লাসে উপস্থিতির হার কমে যাওয়ার কারণে স্বাভাবিকভাবেই আমার একাডেমিক ফলাফলে এর বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত স্নাতক (অনার্স) পরীক্ষায় আমার মেধা অবস্থান চতুর্থ হয় এবং স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) পরীক্ষায়ও অনুরূপ ধারাবাহিকতা ছিল। দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের চেয়ে বড় কিছু হতে পারে না। সেই জাতীয়তাবাদী রাজনীতি ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের আদর্শের জন্য আমি এই ত্যাগ স্বীকার করেছি। আমি মনে করি, দেশের অধিকার আদায়ের তুলনায় আমার এই ক্ষতি কিছুই নয়।
এশিয়া পোস্ট: দীর্ঘ ১৭ বছরের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ও রাজপথের সংগ্রামে আপনার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে সবচেয়ে বড় ত্যাগ কী ছিল?
শ্যামল মালুম: একটি প্রচলিত কথা আছে, ‘সংসার আর রাজনৈতিক সাধনা একসঙ্গে চলে না।’ যারা জীবন বাজি রেখে রাজপথের রাজনীতি করেন, তাদের স্বাভাবিক পারিবারিক জীবন অনেক ক্ষেত্রেই থাকে না। আমাদের সংগঠনের অনেক নেতাকর্মীর বিয়ের বয়স পেরিয়ে গেছে, কেউ কেউ এখনও সংসার শুরু করতে পারেননি। কারণ, আন্দোলন-সংগ্রামের চাপ তাদের ব্যক্তিগত জীবনের সুযোগগুলো সীমিত করে দিয়েছে। আমরা যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি, তাদের পরিবার স্বাভাবিকভাবেই অনেক প্রত্যাশা নিয়ে আমাদের বড় করেছে। পরিবারের আশা থাকে, পড়াশোনা শেষ করে আমরা ভালো কোনো চাকরিতে যাব, সংসারের দায়িত্ব নেব। কিন্তু রাজনৈতিক জীবনে আমাদের ক্ষেত্রে অনেক সময় ঘটেছে উল্টোটা। নিজের খরচ চালানোর পাশাপাশি সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনার জন্যও পরিবার থেকেই অর্থ এনে ব্যয় করতে হয়েছে।
গত ১৭ বছরের সময়টা মোটেও সহজ ছিল না। আন্দোলনের মুহূর্তে আমার সঙ্গে ৩০০, ৪০০ কিংবা ৫০০ কর্মী সক্রিয় থাকতেন। তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা ও দেখভালের জন্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হতো। সেই ব্যয়ের একটি বড় অংশই পরিবার থেকে এনে বহন করতে হয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া তো দূরের কথা, আমরা সামাজিকভাবেও অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলাম। স্বৈরাচারী আমলে বিরোধী দলের রাজনীতি করাটা অনেকের কাছে ঝুঁকিপূর্ণ বিষয় ছিল। আত্মীয়স্বজনের অনেকেই আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে সংকোচ বোধ করতেন। আমরাও সচেতনভাবে অনেককে এড়িয়ে চলতাম, যাতে আমাদের রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তারা কোনো সমস্যায় না পড়েন।
আমার বাড়ি রূপগঞ্জে, ঢাকার খুব কাছেই। কিন্তু এত কাছের দূরত্বও তখন অনেক বড় হয়ে গিয়েছিল। বছরে সাধারণত দুই ঈদের সময় ছাড়া বাড়ি যাওয়া হতো না। বিশেষ প্রয়োজন না হলে এলাকায় যেতাম না। কারণ আমার রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে পরিবারের সদস্যরা যেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের রোষানলে না পড়েন, সেটিই ছিল সবচেয়ে বড় উদ্বেগ। দেশের মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে এটুকু ত্যাগ করতেই হয়েছে।
এশিয়া পোস্ট: একসময় ছাত্রদলের রাজনীতিতে বিবাহিতদের জন্য কঠোর বিধিনিষেধ ছিল। সেই সিদ্ধান্তের পেছনের বাস্তবতা কী ছিল?
শ্যামল মালুম: ২০২০ সালে খোকন-শ্যামল কমিটি গঠনের সময় একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল যে, বিবাহিত কেউ ছাত্রদলের কমিটিতে থাকতে পারবেন না। এর পেছনে গভীর বাস্তবতা ও নৈতিক বিবেচনা ছিল। সেই সময় পরিস্থিতি এমন ছিল, কোনো নেতাকর্মী কখন গুম হবেন, গ্রেপ্তার হবেন কিংবা নিহত হবেন, তার কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। এমন অনিশ্চিত বাস্তবতায় একজন মেয়েকে বিয়ে করে তার ভবিষ্যতের দায়িত্ব নেওয়াটা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। কারণ আপনি কখন কারাগারে যাবেন বা কত দিন নিখোঁজ থাকবেন, তা কেউ জানত না। তখন আপনার অনুপস্থিতিতে আপনার স্ত্রী ও পরিবারের দায়িত্ব কে নেবে, সেটিও একটি বড় প্রশ্ন ছিল।
আমাদের চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে সে সময় অসংখ্য কারাবন্দি, গুমের শিকার, আহত ও পঙ্গু নেতাকর্মীর পরিবারের দায়িত্ব নিতে হয়েছে। কারও ব্যবসা কেড়ে নেওয়া হয়েছে, কেউ পুলিশের গুলিতে পঙ্গু হয়েছেন, কেউ বছরের পর বছর কারাগারে থেকেছেন। সেই বাস্তবতা থেকেই বিবাহিতদের বিষয়ে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতি অনেকটাই পরিবর্তিত হয়েছে। সেই ভয়াবহ অনিশ্চয়তা এখন আর নেই। ফলে বিবাহিতদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণের বিষয়ে দল বর্তমানে অনেক বেশি সহনশীল অবস্থানে রয়েছে।
এশিয়া পোস্ট: দীর্ঘ এই আন্দোলন-সংগ্রামের জীবনে সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত কোনটি?
শ্যামল মালুম: আমার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় ও আবেগঘন সময় হলো দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো। ২০১৭ সালে তার বিরুদ্ধে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের মামলার শুনানি চলাকালে প্রতিদিন বকশীবাজারের বিশেষ আদালতে উপস্থিত থাকতে হতো। আমরা ফজরের নামাজের পরই হাইকোর্ট এলাকায় প্রবেশ করতাম। কারণ, পুরো এলাকা পুলিশের নিয়ন্ত্রণে থাকত এবং সাধারণ মানুষের প্রবেশ ছিল অত্যন্ত সীমিত।
আমরা আগে থেকেই অবস্থান নিয়ে ম্যাডামের গাড়িবহরের জন্য অপেক্ষা করতাম। তিনি আদালতে আসতেন, শুনানি শেষে দুপুরের দিকে বের হতেন, আর আমরা তার সঙ্গে থাকতাম। এই পুরো সময়জুড়ে প্রায় প্রতিদিনই পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি, লাঠিচার্জ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটত। নিয়মিতই আমাদের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করা হতো।
রাজপথের সেই লড়াই, ত্যাগ এবং দেশনেত্রীর পাশে থাকার স্মৃতিগুলো আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতির অংশ হয়ে থাকবে।
এশিয়া পোস্ট: ২০১৭ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে বেগম খালেদা জিয়ার শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদনকে কেন্দ্র করে যে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, সেই দিনের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানতে চাই।
শ্যামল মালুম: ২০১৭ সালের মহান শহীদ দিবসে আওয়ামী লীগ সরকারের একটি গভীর ষড়যন্ত্র ছিল, তারা কোনোভাবেই বেগম খালেদা জিয়াকে শহীদ মিনারে প্রবেশ করতে দিতে চায়নি। এর আগে ম্যাডাম মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে কিছু প্রশ্ন তুলেছিলেন, যেটিকে আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত করার চেষ্টা করেছিল। সেই বছর শহীদ মিনারে প্রবেশে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।
আমরা যখন জগন্নাথ হল মোড়ে অবস্থান নিই, তখন ছাত্রলীগ আমাদের ওপর হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ফলে সেখানে আমরা পুষ্পস্তবক অর্পণ করতে পারিনি। পরে খবর পাই, ম্যাডাম গুলশানের বাসভবন থেকে রওনা দিয়েছেন এবং যে কোনো পরিস্থিতিতে শহীদ মিনারে যাবেন। তখন আমরা দ্রুত হাইকোর্ট মোড়ে চলে যাই। সেখানে পুলিশের কাঁটাতার ও লোহার বিশাল ব্যারিকেড ছিল, যেগুলোতে ধারালো আলপিন ও তারকাঁটা লাগানো ছিল।
আমরা জীবন বাজি রেখে পা দিয়ে সেই ব্যারিকেড সরানোর চেষ্টা করি। আমার জুতা ভেদ করে কয়েকটি আলপিন পায়ের ভেতরে ঢুকে যায় এবং রক্তক্ষরণ শুরু হয়। সেই অবস্থাতেই পুলিশ লাঠিচার্জ শুরু করলে আমি ম্যাডামের গাড়ির হ্যান্ডেল শক্ত করে ধরে রাখি। পুলিশ আমাকে মারধর করছিল, কিন্তু আমি হ্যান্ডেল ছাড়িনি। আহত ও রক্তাক্ত অবস্থায় গাড়ির সঙ্গে দৌড়ে হাইকোর্ট থেকে শহীদ মিনার পর্যন্ত পৌঁছাই। সেখানে প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনসিসি সদস্যদের আচরণে অত্যন্ত ব্যথিত হয়েছিলাম। অনেক বাধা ও সংগ্রামের পর সেদিন আমরা ম্যাডামকে নিয়ে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে সক্ষম হই।
এশিয়া পোস্ট: মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে বেগম খালেদা জিয়ার যে বক্তব্য ছিল, তার পক্ষে আপনিও সে সময় লিখেছিলেন। আপনার অবস্থানটি কী ছিল?
শ্যামল মালুম: আমি ইতিহাসের ছাত্র হিসেবে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত নিয়ে পড়াশোনা করেছি। মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন গবেষণা ও মতামত রয়েছে। আমার বক্তব্য ছিল, এ বিষয়ে গবেষণালব্ধ তথ্য ও ঐতিহাসিক দলিলপত্র নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিত। মুক্তিযুদ্ধের পর গবেষক আব্দুল করিম একটি জরিপ পরিচালনা করেছিলেন বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়। এ ছাড়া শহীদের সংখ্যা নিয়ে নানা ঐতিহাসিক ব্যাখ্যাও রয়েছে। আমি তখন সেই তথ্যগুলো নিয়েই লিখেছিলাম।
আরেকটি বিষয় হলো, শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে লন্ডনে পৌঁছানোর পর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। সে সময় শহীদের সংখ্যা নিয়ে কীভাবে বিভিন্ন সংখ্যা প্রচলিত হয়েছে, তা নিয়েও বিভিন্ন গবেষক আলোচনা করেছেন। স্বাধীনতার অন্যতম সংগঠক সিরাজুল আলম খানও এ বিষয়ে তার অবস্থান তুলে ধরেছিলেন। আমি সবসময় ইতিহাসকে গবেষণা ও তথ্যের আলোকে দেখার পক্ষে কথা বলেছি। কোনো বিষয়ে ভিন্নমত থাকতেই পারে, কিন্তু ইতিহাসের প্রশ্নে আলোচনা ও গবেষণার সুযোগ থাকা উচিত বলে আমি মনে করি।
এশিয়া পোস্ট: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্রদলের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা রয়েছে। আপনার দৃষ্টিতে আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে ছাত্রদলের ভূমিকা কী ছিল?
শ্যামল মালুম: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্রদলের ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত বলতে গেলে অনেক সময় প্রয়োজন। সংক্ষেপে বললে, মে মাসের শেষ দিকে হাইকোর্টের রায়ের পর যে কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হয়, তার শুরু থেকেই ছাত্রদল সম্পৃক্ত ছিল।
প্রথম পর্যায়ে, আন্দোলনের সমন্বয়কদের পক্ষ থেকে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তাদের উদ্বেগ ছিল, ছাত্রদলের শীর্ষ নেতারা সরাসরি সামনে এলে সরকার আন্দোলনকে দলীয় আন্দোলন হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ পাবে। সেই কারণে আমরা কৌশলগতভাবে দ্বিতীয় ও তৃতীয় সারির নেতাকর্মীদের সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখি। ৮ জুলাই গঠিত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কমিটিতেও ছাত্রদলের কর্মীরা যুক্ত ছিলেন।
দ্বিতীয় পর্যায়ে, ৬ ও ১১ জুলাই আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানাই। ১৪ জুলাই শেখ হাসিনার বক্তব্যের পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। রাজু ভাস্কর্যের সামনে উচ্চারিত ‘কে বলেছে কে বলেছে, স্বৈরাচার স্বৈরাচার’ স্লোগানটি পরে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
১৫ জুলাই ছাত্রলীগের হামলার পর আমরা সংগঠনের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াই। সে সময় আন্দোলন স্থবির হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। সমন্বয়কদের সঙ্গে আলোচনা করে আমরা সাংগঠনিকভাবে সহায়তা করি। আহতদের হাসপাতালে নেওয়া, নিরাপদ অবস্থানে সরিয়ে নেওয়া এবং ক্যাম্পাসে প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আমাদের নেতাকর্মীরা সক্রিয় ছিলেন।
১৬ জুলাই শহীদ মিনারের কর্মসূচিতে যখন অনেকেই যেতে ভয় পাচ্ছিল, তখন আমাদের প্রস্তুত করা টিম প্রথম দিকের মিছিলগুলোর একটি নিয়ে সেখানে যায়।
১৮ জুলাই কারফিউ জারির পরও ছাত্রদল ঢাকায় মিছিল বের করে। শান্তিনগর থেকে কাকরাইল পর্যন্ত পুলিশের সঙ্গে একাধিক ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা ব্যবহার করে আমরা যোগাযোগ রক্ষা করি। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন স্থানে অবরোধ কর্মসূচি বাস্তবায়নেও আমাদের নেতাকর্মীরা অংশ নেন।
৪ আগস্ট বাংলামোটর এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে সংঘর্ষপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে ছাত্রদল অবস্থান ধরে রাখে। আর ৫ আগস্ট সেনাপ্রধানের বক্তব্যের পর পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন ঘটে এবং আন্দোলন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে যায়।
এই পুরো আন্দোলনে ছাত্রদলের হাজার হাজার নেতাকর্মী মাঠে ছিলেন। অনেকেই আহত হয়েছেন, অনেকেই গ্রেপ্তার হয়েছেন। আমরা এটিকে ছাত্র-জনতার সম্মিলিত আন্দোলন হিসেবেই দেখি।
এশিয়া পোস্ট: অনেকে মনে করেন, জুলাই আন্দোলনটি শুধু বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে থাকা সমন্বয়কদের একক নেতৃত্বে হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ছাত্রদলের ভূমিকা কি শুধুই সমর্থকের ছিল, নাকি আপনারা নীতিগত নেতৃত্বেও ছিলেন?
শ্যামল মালুম: জুলাই আন্দোলনটি দেশের আপামর জনসাধারণ এবং বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের একটি যৌথ সংগ্রাম ছিল। এটি কারও একক কৃতিত্ব বা কুক্ষিগত করার বিষয় নয়। প্রথম ধাপে কৌশলগত কারণে আমরা পেছনে থাকলেও ১৬ জুলাই থেকে প্রকাশ্য সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছি। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা আমাদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া কোনো বড় কর্মসূচি ঘোষণা করতেন না। যেমন—৬ আগস্টের ঢাকামুখী লংমার্চ কর্মসূচি ৫ আগস্টে নিয়ে আসার পরামর্শ আমরা আমাদের দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনায় দিয়েছিলাম। এর ফলে ৫ আগস্টই শেখ হাসিনার পতন ঘটে। এ ছাড়া দেশজুড়ে লাল প্রোফাইল পিকচার ব্যবহারের যে কর্মসূচি, সেটিও তারেক রহমানের নির্দেশনায় ছাত্রদল প্রথম সমন্বয়কদের কাছে প্রস্তাব করে। এটি ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে মানুষের মধ্যে ব্যাপক ঐক্য তৈরি করেছিল। আমরা সবসময় একটি অভিন্ন ব্যানারের অধীনে কাজ করেছি। ক্রেডিট নেওয়ার চেয়ে স্বৈরাচারের পতনকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছি।
এশিয়া পোস্ট: ৫ আগস্টের পর জাতীয় ঐক্য বা বৈষম্যবিরোধী প্ল্যাটফর্মের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি হওয়ার কারণ কী?
শ্যামল মালুম: এই বিভেদের মূল কারণ ছিল কিছু সুযোগসন্ধানী গোষ্ঠীর সংকীর্ণ স্বার্থ এবং একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। ৫ আগস্টের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সার্বজনীন প্ল্যাটফর্মটিকে ইসলামী ছাত্রশিবির নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করে। তারা বিভিন্ন ক্যাম্পাসে এককভাবে এই ব্যানারের কমিটি দিতে শুরু করে। কুয়েটসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আমাদের নেতাকর্মীরা সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময়ে গেলে এই ব্যানারের আড়ালে থাকা শিবিরের কর্মীরা তাদের ওপর হামলা চালায়।
সবচেয়ে বড় ভণ্ডামি ছিল তাদের দ্বিমুখী অবস্থান। তিতুমীর কলেজ, বাংলা কলেজ ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা ‘ক্যাম্পাসে কোনো ছাত্ররাজনীতি থাকবে না’ স্লোগান দেয়। অথচ ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার কিছুদিন পরই দেখা যায়, ওই আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারীরাই শিবিরের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। ছাত্রসমাজ এই ধরনের দ্বিচারিতা কখনোই ভালোভাবে নেয়নি।
এ ছাড়া এক অনুষ্ঠানে আমি প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলমের কাছেও প্রশ্ন তুলেছিলাম, জুলাই আন্দোলনের অন্যতম বড় অংশীদার হওয়া সত্ত্বেও ছাত্রদলকে কেন রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিগুলোতে আমন্ত্রণ জানানো হয় না, অথচ শিবিরের ছদ্মবেশী লোকজনকে নিয়মিত সেখানে দেখা যায়। বৃহত্তর ঐক্যের স্বার্থে আমরা অনেক দিন নীরব থেকেছি।
এশিয়া পোস্ট: ৫ আগস্টের পর ছাত্রদলের রাজনীতিতে আদর্শগত ও কৌশলগত কী ধরনের পরিবর্তন এসেছে?
শ্যামল মালুম: অতীতে ছাত্ররাজনীতিতে পেশিশক্তি, হিরোইজম এবং অস্ত্রনির্ভরতার একটি সংস্কৃতি ছিল। কিন্তু ৫ আগস্টের পর শুধু ছাত্রদল নয়, বিএনপিও উপলব্ধি করেছে যে এই ধারা আর চলতে পারে না। নতুন প্রজন্ম অস্ত্রের রাজনীতি পছন্দ করে না।
আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কর্মকাণ্ডেও এই পরিবর্তনের প্রতিফলন দেখা যায়। তিনি রাষ্ট্রীয় প্রটোকল ছাড়া চলাফেরা করেন, ট্রাফিক আইন মেনে চলেন, সাধারণ মানুষকে সম্মান করেন এবং তরুণদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখেন। ছাত্রদলও সহনশীল ও গণমুখী রাজনীতির এই ধারা অনুসরণ করছে। আমরা শপথ করেছি, কাউকে জোর করে মিছিলে আনব না এবং ছাত্রলীগের মতো সিট দখল বা নির্যাতনের রাজনীতি করব না।
এশিয়া পোস্ট: বিভিন্ন গণমাধ্যমে এখনও বিএনপি বা ছাত্রদলের কিছু নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে আধিপত্য বিস্তার কিংবা চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠে। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?
শ্যামল মালুম: ১৭ বছরের একটি ভঙ্গুর ও দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে রাতারাতি পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। এর জন্য সময় প্রয়োজন। তবে আওয়ামী লীগের আমলের মতো একচ্ছত্র পরিস্থিতি এখন আর নেই। বর্তমানে দেশে বাক্স্বাধীনতা রয়েছে।
আমাদের দলের বা সংগঠনের কারও বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি কিংবা অন্য কোনো অপকর্মের অভিযোগের ন্যূনতম তথ্য পেলেও আমরা তদন্ত করে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিচ্ছি। প্রয়োজন হলে দল থেকে বহিষ্কার করছি এবং প্রশাসনকে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। কোনো অপরাধীকে আমরা প্রশ্রয় দিচ্ছি না।
এশিয়া পোস্ট: আপনি আসন্ন কমিটিতে সভাপতি পদপ্রত্যাশী। অন্য প্রার্থীদের তুলনায় আপনার শক্তির জায়গা কোথায়?
শ্যামল মালুম: আমি নিজেকে অন্যদের চেয়ে আলাদা বা শ্রেষ্ঠ মনে করি না। দলের হাইকমান্ড সবার অবদান ও প্রোফাইল সম্পর্কে অবগত। আমি দীর্ঘদিন কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছি। জহুরুল হক হলের আহ্বায়ক ছিলাম, কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলাম এবং বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগে সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করেছি। বর্তমানে সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি।
তৃণমূল পর্যায়ে সারা দেশে আমার একটি সুদৃঢ় যোগাযোগ নেটওয়ার্ক রয়েছে। আমি রাজপথের প্রতিটি পরীক্ষার মধ্য দিয়ে এসেছি। দল যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেটিই মাথা পেতে নেব।
এশিয়া পোস্ট: ছাত্রদলের আগামী নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়া কেমন হবে? কাউন্সিলররা কি স্বাধীনভাবে মতামত দিতে পারবেন?
শ্যামল মালুম: আমাদের সাংগঠনিক অভিভাবক তারেক রহমান সবার মতামতের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেন। ষষ্ঠ কাউন্সিলে প্রত্যক্ষ ভোটে নেতৃত্ব নির্বাচিত হয়েছিল। পরবর্তী সময়েও তিনি বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে মতামত নিয়েছেন। বর্তমানে দেশজুড়ে বিভিন্ন জরিপ ও মূল্যায়ন চলছে। এসব তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে যার প্রোফাইল সবচেয়ে শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য হবে, তাকেই নেতৃত্বে আনা হবে।
এশিয়া পোস্ট: গত এক বছরে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কল্যাণে ছাত্রদলের সবচেয়ে বড় সাফল্য এবং সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা কী?
শ্যামল মালুম: আমাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো, জুলাই-পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে অস্থিরতা এবং মব পরিস্থিতি মোকাবিলা করে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখতে ভূমিকা রাখা। আর আমি রাজনীতিতে কোনো কিছুকেই সরাসরি ব্যর্থতা বলতে চাই না। ব্যর্থতা হলো একটি শিক্ষা, যা ভবিষ্যতের পথচলায় কাজে লাগে। কোনো কাজে শতভাগ সফল না হলেও সেখান থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা আমাদের আরও শক্তিশালী করে।
এশিয়া পোস্ট: আপনি যদি ছাত্রদলের সভাপতি নির্বাচিত হন, তাহলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপনার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা কী?
শ্যামল মালুম: আমার প্রধান লক্ষ্য হবে ছাত্রদলকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে একটি আদর্শ ও প্রিয় সংগঠন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। এজন্য প্রতিটি ক্যাম্পাসে ডিবেটিং ক্লাব, কালচারাল ক্লাব, খেলাধুলা এবং ক্যারিয়ারভিত্তিক সামাজিক কার্যক্রম বাড়ানো হবে।
শিক্ষার্থীরা যাতে পড়াশোনা শেষ করেই কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়, সে জন্য আমরা বিনামূল্যে আইসিটি কোর্স, প্রোগ্রামিং প্রশিক্ষণ এবং বিদেশে উচ্চশিক্ষা বা কর্মসংস্থানে আগ্রহীদের জন্য IELTS, TOEFL ও জাপানি ভাষাসহ বিভিন্ন ভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা করতে চাই। সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বাবলম্বী করাই হবে আমার মূল লক্ষ্য।
এশিয়া পোস্ট: বর্তমানে দেশে অনেক ছাত্রসংগঠন সক্রিয়। একজন সাধারণ শিক্ষার্থী কেন অন্য সংগঠন বাদ দিয়ে ছাত্রদলকে বেছে নেবে?
শ্যামল মালুম: এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। অন্যান্য সংগঠনের কিছু মৌলিক ও আদর্শিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যেমন—ছাত্রশিবির মুখে ইসলামের কথা বললেও তাদের আচরণে দ্বিচারিতা রয়েছে। তারা গোপনে রাজনীতি পরিচালনা করে এবং নিজেদের পরিচয় আড়াল করে রাখে। অন্যদিকে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আড়ালে থাকা ‘ছাত্রশক্তি’ অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে চাঁদাবাজি ও মব সৃষ্টির রাজনীতি করেছে বলে আমরা দেখেছি। তাদের ভাষা ও আচরণও অনেক ক্ষেত্রে উগ্র ও অসৌজন্যমূলক।
এর বিপরীতে ছাত্রদলের প্রতিটি নেতাকর্মীর পরিচয় প্রকাশ্য। আমরা জবাবদিহিতামূলক রাজনীতি করি। কোনো নেতাকর্মী অপরাধ করলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ছাত্রদল শিক্ষার্থীদের মেধা, অধিকার ও অংশগ্রহণের রাজনীতি করে বলেই সাধারণ শিক্ষার্থীরা আমাদের প্রতি আস্থা রাখে।