সাবিনা আহমেদ
আজ সৌদি আরবের মক্কায় আল-সাফা প্রাসাদে সৌদি ক্রাউন প্রিন্স ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ “মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি” (Makkah Joint Defence Agreement) স্বাক্ষর করেছেন।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সৌদি প্রেস এজেন্সি (SPA) এবং তুর্কি সূত্রের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, চুক্তির মূল উদ্দেশ্য “যেকোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো” এবং “তিন রাষ্ট্রের যেকোনো একটোর বিরুদ্ধে সশস্ত্র আক্রমণকে তিন রাষ্ট্রের সবার বিরুদ্ধে আক্রমণ বলে গণ্য করা”।
চুক্তি প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সকল দিক সম্প্রসারণের কথা বলেছে, যদিও বাধ্যবাধকতার নির্দিষ্ট সামরিক বিবরণ প্রকাশ করা হয়নি। তুর্কি কর্মকর্তারা এটিকে “সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক” এবং কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে নয় বলে বর্ণনা করেছেন; এটি অন্য আঞ্চলিক দেশগুলোর জন্যও উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। 
এই ত্রিপক্ষীয় চুক্তি ২০২৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত “কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি”র উপর ভিত্তি করে হয়েছে। এই তিন দেশের মিলিটারি ক্যাপাবিলিটি কমপ্লিমেনটারি : সৌদি আরবের আছে অর্থনৈতিক ও জ্বালানি শক্তি, তুরস্ক ন্যাটো-র দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনা ও এক্সপ্যান্ডিং দেশীয় ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রি , এবং পাকিস্তান বিশাল গ্রাউন্ড ফোর্স ও পারমাণবিক প্রতিরোধ ক্ষমতা।
এই জোট পূর্ণাঙ্গ ন্যাটো-র মতো সমন্বিত কমান্ড বা স্বয়ংক্রিয় সামরিক প্রতিক্রিয়ার বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করে না; বরং প্রতিষ্ঠানিক সহযোগিতা, যৌথ পরিকল্পনা, গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান, প্রশিক্ষণ ও প্রতিরক্ষা শিল্প সমন্বয়ের কাঠামো। 
চুক্তির আলোচনা প্রায় এক বছর ধরে চলছিল এবং অক্টোবর ২০২৩-এর পর আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোচ্ছিল। কিন্তু ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর যুদ্ধ ও তার পরবর্তী ইরানি প্রতিশোধমূলক হামলাগুলো চুক্তি স্বাক্ষরের আর্জেন্সি এনেছে।
এক বছর আগে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি যথেষ্ট মনে হয়েছিল এবং আমেরিকান প্রতিরোধের উপর আস্থা তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল। ইরান-আমেরিকান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বুঝা গেছে যে আমেরিকানদের কাছে সবচেয়ে জরুরি ইজরায়েলের প্রতিরক্ষা। সৌদি আরব বুঝতে পেরেছে আমেরিকা-ইরান আলোচনা/যুদ্ধবিরতির প্রক্রিয়া উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা স্বার্থ পুরোপুরি রক্ষা হচ্ছে না।
মক্কায় স্বাক্ষর ইসলামি প্রতীকী গুরুত্ব যোগ করেছে এবং পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের উপস্থিতি সামরিক প্রতিশ্রুতির গভীরতা নির্দেশ করছে।
এই চুক্তিতে লেখা নেই যে আক্রমণ হলেই অন্য দুই দেশ সামরিকভাবে সাড়া দিতে বাধ্য। চুক্তিতে কোনো নির্দিষ্ট বাধ্যবাধকতা বা স্বয়ংক্রিয় সামরিক হস্তক্ষেপের ধারা নেই। এটি মূলত শক্তিশালী প্রতিরোধ সংকেত। যা দিয়ে আক্রমণকারীকে ইঙ্গিত দেয় যে তাদের যে কোনও এক দেশকে আঘাত করলে তিন দেশের সম্মিলিত আর্থিক, সামরিক, আর কূটনৈতিক বাধা সামনে আসবে বা আসতে পারে।
এই চুক্তি মূলত যৌথ পরিকল্পনা, গোয়েন্দা ভাগাভাগি, প্রশিক্ষণ ও ডিফেন্স শিল্প সমন্বয়ের কাঠামো তৈরি করেছে। প্রয়োজনে সমন্বিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও গড়ে তোলা যাবে। কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রতিটি রাষ্ট্র ইনডিপেন্ডেন্ট। অর্থাৎ, এটি “ন্যাটো আর্টিকেল ৫”-এর মতো বাধ্যবাধকতা নয়।
নিঃসন্দেহে এই চুক্তি ইরান এবং ইজরায়েল উভয় রাষ্ট্রের উপর চাপ বাড়িয়েছে। সৌদির ওপর আরও হামলা এখন তিন দেশের সম্মিলিত হিসাবের মুখে পড়বে। তাই এই দুই দেশের আক্রমণের হিসাব আরও জটিল হয়েছে। যেটা আমি আগেই বলেছি। আমেরিকাও বুঝতে পারছে উপসাগরীয় দেশগুলো এখন শুধু ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভর করছে না। আর ইউএই এখন পর্যন্ত ইসরায়েল-আমেরিকা অক্ষেই আছে। যেহেতু এই জোটকে নেতৃত্ব ডিশে সৌদি আরব, তাই ইউএইর আপাতত এই জোটে যোগ দেয়ার সম্ভাবনা কম। আর যোগ দিতে হলে তাদের ফরেন পলিসিকে নতুন ভাবে সাজাতে হবে।
আরেকটা ব্যাপার ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ আমেরিকা-ইসরায়েলের ইরান হামলার পর ইরান ও হুথিরা সৌদি আরবে বারবার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে, তেল স্থাপনা ও নৌপথ আক্রান্ত হয়েছে। তবু পাকিস্তান সরাসরি যুদ্ধে নামেনি। কারণ পাকিস্তানের ইরানের সঙ্গে সীমান্ত আছে, দেশে বড় শিয়া জনগোষ্ঠী আছে, আফগানিস্তান সীমান্তে নিজস্ব সমস্যা চলছে, নিজে অর্থনীতি চাপে আছে। সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে পাকিস্তানের নিজের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়বে। তাই তারা “রেড লাইন” বলে সতর্ক করেছে, মধ্যস্থতা করেছে, কিন্তু যুদ্ধে নামেনি। চুক্তির আওতায় যুদ্ধে নামার কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। জোটের প্রতিটি রাষ্ট্র তাদের স্বার্থ বিবেচনা করে ডিসিশন নিবে।
ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পাকিস্তান কেবল কূটনীতি করেনি বরং, এপ্রিল ২০২৬-এ তারা সৌদির উপর আক্রমণ ঠেকাতে আর ডিফেন্স জোরদার করতে প্রায় ৮ হাজার সেনা, JF-17 স্কোয়াড্রন, ড্রোন আর এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম পাঠিয়েছে। ঐতিহাসিকভাবেও পাকিস্তানি বাহিনী সৌদিতে প্রশিক্ষণ ও মক্কা মদিনা প্রতিরক্ষায় থাকে। কিন্তু ইরান বা হুথির বিরুদ্ধে অফেন্সিভ অপারেশন করেনি।
এখানে কে কাকে সরাসরি মিলিটারি পাঠিয়ে সহযোগিতা করবে, কে কাকে গোয়েন্দা তথ্য দিবে তা সরল রেখায় চলছে না। ইরানকে মক্কা জোটের সৌদি আরব এনিমি রাষ্ট্র হিসাবে দেখলেও, বোথ পাকিস্তান আর তুরস্ক ইরানকে সীমান্ত এক্টিভিটির গোয়েন্দা তথ্য দিচ্ছে। হিসাব কয়েক স্তরের, আর নানান মুখী। এই নুয়ানসগুলি বুঝতে হবে।