সম্প্রতি সংসদ সদস্যদের কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালনের জন্য সরকারি গাড়ির ব্যবস্থা এবং মন্ত্রীদের মাসিক বেতন কমপক্ষে ১০ লাখ ও সংসদ সদস্যদের ৫ লাখ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর। তার এই প্রস্তাবের পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে এমপি-মন্ত্রীদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধার কথা।
জাতীয় সংসদের সদস্য ও মন্ত্রীদের বেতন কত বছর পরপর বাড়বে এমন কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা আইনে বেঁধে দেওয়া নেই। সরকারি কর্মচারীদের মতো তাদের মূল বেতনে বার্ষিক ইনক্রিমেন্টও নেই। প্রয়োজন ও সময়ের বাস্তবতায় জাতীয় সংসদে আইন সংশোধনের মাধ্যমে তাদের বেতন ও ভাতা বাড়ানো হয়।
বাংলাদেশে এমপি ও মন্ত্রীদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর সর্বশেষ বড় পরিবর্তন আসে ২০১৬ সালে। এর আগে ২০১৫ সালে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য অষ্টম জাতীয় পে-স্কেল ঘোষণা করা হয়। এর পরের বছর সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের বেতন-ভাতা বাড়িয়ে নতুন কাঠামো কার্যকর করা হয়। ওই সময় সংসদ সদস্যদের মাসিক বেতন ২৭ হাজার ৫০০ থেকে বাড়িয়ে ৫৫ হাজার এবং মন্ত্রীদের বেতন ৫৩ হাজার ১০০ থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৫ হাজার টাকা করা হয়। বর্তমানে মূল বেতনের ক্ষেত্রে এই কাঠামোই কার্যকর রয়েছে।
তবে ২০১৬ সালের পর এমপি-মন্ত্রীদের কোনো সুযোগ-সুবিধা বাড়েনি, বিষয়টি এমন নয়। বিভিন্ন সময়ে মূল বেতন অপরিবর্তিত রেখে ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২৪ সালেও সংসদ সদস্যদের নির্বাচনী এলাকার খরচ, যাতায়াত ও যোগাযোগসহ বিভিন্ন আনুষঙ্গিক ভাতা বাড়ানো হয়।
যেভাবে বাড়ে এমপি-মন্ত্রীদের বেতন?
সংসদ সদস্যদের বেতন ও ভাতা নির্ধারণের বিষয়টি আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। সংসদ সদস্যদের ক্ষেত্রে ‘সংসদ-সদস্য (পারিতোষিক ও ভাতাদি) আদেশ, ১৯৭৩’ এবং মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের ক্ষেত্রে ‘মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী (পারিতোষিক ও বিশেষাধিকার) আইন, ১৯৭৩’ প্রযোজ্য।
বেতন-ভাতা বাড়াতে প্রথমে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা সরকারি কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে একটি প্রস্তাব তৈরি করা হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হয়। মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর আইন সংশোধনের জন্য জাতীয় সংসদে বিল উত্থাপন করা হয়।
বিলটি সংসদে আলোচনা ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে পাস হলে রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়। রাষ্ট্রপতির সম্মতির পর সংশোধিত আইন কার্যকর হয়। পরে সরকারি গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে নতুন বেতন-ভাতা ও সুবিধার কাঠামো আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর করা হয়।
অর্থাৎ শুধু সরকারি সিদ্ধান্ত বা পে-স্কেল ঘোষণার মাধ্যমে এমপি-মন্ত্রীদের মূল বেতন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়ে না। বিদ্যমান আইন সংশোধন করে সংসদীয় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই মূল বেতন পরিবর্তন করতে হয়।
বর্তমানে এমপি-মন্ত্রীদের মূল বেতন কত?
বর্তমান কাঠামো অনুযায়ী একজন সংসদ সদস্যের মাসিক মূল বেতন ৫৫ হাজার টাকা। প্রধানমন্ত্রী ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা এবং একজন পূর্ণ মন্ত্রীর মূল বেতন ১ লাখ ৫ হাজার টাকা। প্রতিমন্ত্রীর ৯২ হাজার টাকা এবং উপমন্ত্রীর ৮৬ হাজার ৫০০ টাকা।
তবে মূল বেতনই শুধু নয়, দায়িত্ব পালনের জন্য বিভিন্ন ভাতা, আবাসন, চিকিৎসা, যোগাযোগ ও যাতায়াতসহ নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা রয়েছে।
এমপিরা বেতনের বাইরে কী কী সুবিধা পান?
সংসদ সদস্যরা মাসিক ৫৫ হাজার টাকা মূল সম্মানীর বাইরে বিভিন্ন ধরনের ভাতা ও সুবিধা পান। এর মধ্যে নির্বাচনী এলাকার দায়িত্ব পালনের জন্য মাসে ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্বাচনী এলাকার ভাতা এবং মাসে ১৫ হাজার টাকা অফিস খরচের সুবিধা রয়েছে। এছাড়া মাসে ৭০ হাজার টাকা পরিবহন ভাতা এবং অতিথি আপ্যায়নের জন্য রয়েছে মাসে ৫ হাজার টাকা আপ্যায়ন ভাতা।
সংসদ সদস্যদের লন্ড্রি ভাতা মাসে ১ হাজার ৫০০ টাকা। ক্রোকারিজ, লিনেন, টয়লেট্রিজসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনার জন্য মাসে ৬ হাজার টাকা করে বিবিধ খরচের ভাতাও রয়েছে। সরকারি আইনে লন্ড্রি ও বিবিধ খরচের এসব ভাতার পরিমাণ নির্ধারিত রয়েছে।
দেশের ভেতরে সংসদীয় দায়িত্ব পালনের জন্য এমপিদের ভ্রমণ সুবিধাও রয়েছে। অধিবেশন বা সংসদীয় কমিটির বৈঠকে অংশ নিতে ঢাকায় অবস্থানকালে প্রতিদিন ৮০০ টাকা দৈনিক ভাতা এবং ২০০ টাকা যাতায়াত ভাতা পাওয়া যায়। সংসদীয় দায়িত্ব বা সাধারণ সরকারি কাজে এলাকা পরিদর্শনের ক্ষেত্রে প্রতিদিন ৭৫০ টাকা ভাতা এবং ৭৫ টাকা যাতায়াত ভাতার বিধান রয়েছে।
দেশের অভ্যন্তরে বিমান, রেল বা স্টিমারে ভ্রমণের জন্য বছরে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা মূল্যের ট্রাভেল ভাউচার বা ট্রাভেল ক্রেডিটের সুবিধা রয়েছে।
যোগাযোগের ক্ষেত্রেও রয়েছে সরকারি সুবিধা। সংসদ সদস্যদের বাসা বা সরকারি কোয়ার্টারে টেলিফোন সুবিধা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে মাসে সর্বোচ্চ ৭ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত ফোন বিলের সুবিধা দেওয়া হয়। সংসদ ভবন এলাকায় এমপিদের জন্য আবাসিক ব্যবস্থাও রয়েছে। সরকারি আবাসন না পেলে বিধি অনুযায়ী আবাসনসংক্রান্ত ভাতার সুযোগ রয়েছে। সংসদ সদস্যরা (এমপি) ঢাকায় সরকারি আবাসন বা ন্যাম ফ্ল্যাট না পেলে বিকল্প হিসেবে প্রতি মাসে ৪১ হাজার ৪০০ টাকা বাড়ি ভাড়া ভাতা পান। সরকারি নিয়মে এই বাড়ি ভাড়া ভাতার ওপর কোনো আয়কর দিতে হয় না।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে সংসদ সদস্য ও তাদের পরিবারের সদস্যরা সরকারি প্রথম শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তাদের সমমানের রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা সুবিধা পান। অর্থাৎ ৭০০ টাকা মাসিক নগদ চিকিৎসা ভাতার পাশাপাশি বিধি অনুযায়ী চিকিৎসা সুবিধাও রয়েছে।
এছাড়া নির্বাচনী এলাকার দরিদ্র জনগোষ্ঠী, সামাজিক বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের কল্যাণে ব্যয়ের জন্য প্রতি এমপিকে বছরে ৫ লাখ টাকা ঐচ্ছিক তহবিল দেওয়ার বিধান রয়েছে। দায়িত্ব পালনকালে মৃত্যু বা স্থায়ী পঙ্গুত্বের ক্ষেত্রে পরিবারের জন্য ১০ লাখ টাকা জীবনবীমা সুবিধার বিধানও রয়েছে।
তবে শুল্কমুক্ত গাড়ির সুবিধা বর্তমানে কার্যকর নেই। গত এপ্রিল মাসে সংসদে সংশ্লিষ্ট সংশোধনী বিল পাসের মাধ্যমে এমপিদের শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির সুবিধা বাতিল করা হয়েছে।
মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-উপমন্ত্রীরা কী কী সুবিধা পান?
পূর্ণ মন্ত্রীর মাসিক মূল বেতন ১ লাখ ৫ হাজার টাকা। প্রতিমন্ত্রী পান ৯২ হাজার টাকা এবং উপমন্ত্রী পান ৮৬ হাজার ৫০০ টাকা। এর বাইরে অতিথি আপ্যায়ন ও সামাজিক কাজের জন্য পূর্ণ মন্ত্রী মাসে ১০ হাজার টাকা, প্রতিমন্ত্রী ৭ হাজার ৫০০ টাকা এবং উপমন্ত্রী ৫ হাজার টাকা নিয়ামক বা আপ্যায়ন ভাতা পান।
মন্ত্রীদের জন্য সরকারি ব্যয়ে সম্পূর্ণ সজ্জিত বাসভবনের ব্যবস্থা রয়েছে। সরকারি বাসভবনে থাকলে বাড়িটির বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ও টেলিফোন বিল রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে পরিশোধ করা হয়। কোনো মন্ত্রী সরকারি বাসভবন ব্যবহার না করে নিজের বা ভাড়া বাড়িতে থাকলে পূর্ণ মন্ত্রী মাসে ৮০ হাজার টাকা এবং প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী মাসে ৭০ হাজার টাকা আবাসন ভাতা পান।
সরকারি বাসভবনের আসবাবপত্র বা সাজসজ্জার জন্য বছরে পূর্ণ মন্ত্রী ৫ লাখ টাকা এবং প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত সুবিধা পান। মন্ত্রীদের সার্বক্ষণিক ব্যবহারের জন্য চালকসহ সরকারি পরিবহন পুল থেকে গাড়ি বা জিপ দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। সরকারি ও ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১৮ লিটার জ্বালানি তেল সরকারি খরচে দেওয়ার বিধান রয়েছে।
নিজ নির্বাচনী এলাকা বা দেশের অভ্যন্তরে সরকারি সফরের সময় বিশেষ ফ্ল্যাগ জিপ ব্যবহারের সুবিধাও রয়েছে। সফরকালে দৈনিক সর্বোচ্চ ২ হাজার টাকা ডেইলি অ্যালাউন্স পাওয়ার বিধান রয়েছে। সরকারি দায়িত্বে আকাশপথে ভ্রমণের সময় দুর্ঘটনার জন্য ১০ লাখ টাকার বিমানবিমা সুবিধাও রয়েছে।
দাপ্তরিক আপ্যায়নের জন্য প্রতি মাসে নির্দিষ্ট বরাদ্দ পান। সেজন্য মন্ত্রী পান ১০ হাজার, প্রতিমন্ত্রী ৭ হাজার ৫০০ ও উপমন্ত্রী ৫ হাজার টাকা পান।
এছাড়া পূর্ণ মন্ত্রীর জন্য একজন একান্ত সচিব, একজন সহকারী একান্ত সচিব, দুজন ব্যক্তিগত কর্মকর্তা, একজন বাবুর্চি, একজন মালি ও একজন অফিস সহায়ক রাখার বিধান রয়েছে। প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীর জন্য একজন একান্ত সচিব, একজন সহকারী একান্ত সচিব, একজন ব্যক্তিগত কর্মকর্তা এবং প্রয়োজনীয় গৃহকর্মীর ব্যবস্থা রয়েছে।
২০২৬ সালের জুনে মন্ত্রী পদমর্যাদার সহকারী একান্ত সচিবদের মূল বেতন বাড়িয়ে ৩২ হাজার ৫৪০ টাকা করা হয়েছে।
মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী এবং তাদের নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের দেশে ও বিদেশে চিকিৎসার যাবতীয় খরচ রাষ্ট্রীয়ভাবে বহনের বিধান রয়েছে। এ ছাড়া দরিদ্র মানুষের কল্যাণ ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানে অনুদানের জন্য প্রতি বছর পূর্ণ মন্ত্রীর জন্য ১০ লাখ টাকা, প্রতিমন্ত্রীর জন্য ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং উপমন্ত্রীর জন্য ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা ঐচ্ছিক তহবিলের বিধান রয়েছে।
পূর্বে এমপি-মন্ত্রীদের বেতন কত ছিল?
স্বাধীনতার পর প্রথম জাতীয় সংসদের সময় ১৯৭৩ সালে একজন সংসদ সদস্যের মাসিক মূল সম্মানী ছিল ৪০০ টাকা। একই সময়ে একজন পূর্ণ মন্ত্রীর মাসিক মূল বেতন ছিল ১ হাজার টাকা।
এরপর বিভিন্ন সময়ে আইন সংশোধনের মাধ্যমে ধাপে ধাপে বেতন বাড়ানো হয়। সংসদ সদস্যদের মাসিক মূল সম্মানী ১৯৮৮ সালে ১ হাজার ৫০০ টাকা, ১৯৯২ সালে ৩ হাজার টাকা, ১৯৯৮ সালে ৭ হাজার ৫০০ টাকা, ২০০৫ সালে ১১ হাজার টাকা এবং ২০১০ সালে ১৫ হাজার টাকায় উন্নীত হয়।
২০১৬ সালের সংশোধনের মাধ্যমে সংসদ সদস্যদের মাসিক মূল বেতন ৫৫ হাজার টাকায় পৌঁছায়। একই সময়ে মন্ত্রীদের মূল বেতন ১ লাখ ৫ হাজার টাকা, প্রতিমন্ত্রীর ৯২ হাজার টাকা এবং উপমন্ত্রীর ৮৬ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়।