চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে একটি বৈষম্যহীন ও সহনশীল বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে ছাত্র-জনতা বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিল। দুবছর পর সেই স্বপ্নের পথে হাঁটার চেষ্টা অব্যাহত থাকলেও কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা জনমনে হতাশার জন্ম দিয়েছে। দীর্ঘ স্বৈরশাসনের অবসানের পর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল রাজনৈতিক সহিংসতা ও দলীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে এক নতুন ঐক্যের বাংলাদেশ।
কিন্তু বুধবার ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস’ পালনের বিভিন্ন আয়োজনে যে ধরনের বিশৃঙ্খলা দেখা গেছে, তা সেই প্রত্যাশার সঙ্গে মিলছে না। ক্ষমতার পালাবদল হলেও পুরোনো সেই আধিপত্য আর অসহিষ্ণুতার বৃত্ত থেকে বের হতে পারেনি দেশ। খোদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানে হট্টগোল, ঢাকার বাইরে কোথাও কোথাও জুলাই যোদ্ধাদের ওপর হামলা ও ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রক্তস্নাত জুলাইয়ের এমন চেহারা দেখতে চায়নি দেশের মানুষ।
রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির উপস্থিতিতেই ডকুমেন্টারি নিয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়েন শহীদ পরিবার ও যোদ্ধারা। তাদের অভিযোগ, আন্দোলনের প্রকৃত ইতিহাস আর শহীদদের আত্মত্যাগ সেখানে যথাযথভাবে উঠে আসেনি। শরীয়তপুরে জেলা প্রশাসনের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে দুই জুলাই যোদ্ধাকে মারধর করে অনুষ্ঠান থেকে বের করে দিয়েছেন বিএনপির নেতারা। এ নিয়ে ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক মাধ্যমে। পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে আমন্ত্রণ না পাওয়ার অভিযোগ তুলে প্রশাসনের আলোচনা সভাই বন্ধ করে দেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। এছাড়াও রাজধানীর সরকারি তিতুমীর কলেজ, ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরে জুলাইয়ের অনুষ্ঠানে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে।
ডকুমেন্টারিতে নানা অসংগতি: রাষ্ট্রপতির সামনেই হট্টগোল
আমি ব্যথিত, এটি কোনো ডকুমেন্টারি হলো না -ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি * ক্ষমা চাইলেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবসের অনুষ্ঠানে একটি ডকুমেন্টারিকে (তথ্যচিত্র) কেন্দ্র করে হট্টগোল হয়েছে। বুধবার রাজধানীর আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে (চীন মৈত্রী) ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদের উপস্থিতিতেই এমন বিশৃঙ্খলা হয়। উপস্থিত ছাত্র-জনতার একাংশের অভিযোগ, এতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, শহীদদের আত্মত্যাগ এবং আন্দোলনের বিভিন্ন দিক সঠিকভাবে তুলে ধরা হয়নি। এমনকি শহীদ আবু সাঈদের ছবিও এতে নেই। তাই তারা ক্ষোভে ফেটে পড়েন। তারা ডকুমেন্টারিকে ‘ভুয়া’ উল্লেখ করে বিভিন্ন স্লোগান দেন।
এ সময় রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ছুটে এসে মঞ্চের সামনে অবস্থান নেন। বিদেশি অতিথিরা দ্রুত অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেন। ডকুমেন্টারিতে ভুলের জন্য ক্ষমা চান মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান। পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির এনসিপি নেতা আখতার হোসেনসহ আয়োজকরা মিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। তবে শেষ পর্যন্ত ক্ষোভ জানিয়ে অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেন আখতার হোসেনসহ এনসিপি নেতারা। রাষ্ট্রপতি তার ভাষণে বলেন, এই ঘটনায় আমি ব্যথিত। অনুষ্ঠানের বিভিন্ন ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
যে কারণে হট্টগোল : অনুষ্ঠানে জুলাই অভ্যুত্থানের ওপর একটি ডকুমেন্টারি দেখানো হয়। মুক্তযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় এটি তৈরি করে। এই ডুকুমেন্টারি দেখে উপস্থিত অতিথিদের একাংশ ক্ষুব্ধ হন। তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে হইচই শুরু করলে অনুষ্ঠানস্থলে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। তাদের অভিযোগ, গণ-অভ্যুত্থানের ওপর নির্মিত তথ্যচিত্রটিতে আন্দোলন-সংগ্রামের প্রকৃত চিত্র সঠিকভাবে ফুটে ওঠেনি। এতে রংপুরে পুলিশের গুলিতে নিহত আবু সাঈদের ছবি নেই। আন্দোলনের সময় শেখ হাসিনার পতনের যে একদফা কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে, ডকুমেন্টারিতে সেখানে একদফার ঘোষক হিসাবে নাহিদ ইসলামের পরিবর্তে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নাম উল্লেখ করা হয়। ৬ আগস্ট সারা দেশ থেকে ঢাকায় লংমার্চ কর্মসূচি এবং পরে একদিন এগিয়ে আনার ঘোষণায় আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার নাম উল্লেখ নেই। এছাড়া ৩ আগস্টের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাপ্রবাহকে পুরোপুরি অনুপস্থিত রাখা হয়েছে।
ডকুমেন্টারি দেখানোর পর হইচই শুরু হয়। এ সময় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন মঞ্চে দাঁড়িয়ে হট্টগোলকারীদের ধমক দিয়ে বলেন, ‘আপনারা এখানে নিজেদের জাহির করতে এসেছেন?’
ডকুমেন্টারি দেখাতে এসেছেন? শহীদদের জন্য কী করেছেন আপনারা? কিছুই করেননি আপনারা।’-এরপর পুরো অনুষ্ঠানে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে উপস্থাপক বারবার আমন্ত্রিতদের শান্ত হওয়ার অনুরোধ জানাতে থাকেন। একপর্যায়ে মঞ্চে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, আপনাদের মধ্য থেকে যারা বক্তব্য দিতে চান, দয়া করে এখানে এসে কথা বলুন। আপনারা শান্তভাবে বসুন। এ সময় তিনি এনসিপির সদস্য সচিব ও সংসদ-সদস্য আখতার হোসেনকে মঞ্চে ডেকে আনেন। আখতার হোসেন মঞ্চে এসে সবাইকে শান্ত হওয়ার অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, ডকুমেন্টারিতে যে অসংগতি আছে, তা আমরা দেখেছি, আমরা সরকারকে বিষয়টা জানাব। আজকের দিনটা গুরুত্বপূর্ণ একটা দিন। শহীদপরিবারের সম্মানে আমরা এখানে শান্ত হয়ে বসে পড়ব। আমরা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলব। বিশেষ করে ৩ আগস্টের যে ঘটনাপ্রবাহ, সেটি এখানে একেবারে অনুপস্থিত। এগুলো নিয়ে আমরা মন্ত্রণালয়ের কাছে জবাব চাইব। আপনারা শান্ত হয়ে বসে পড়ুন, আপনাদের শান্ত হয়ে বসার অনুরোধ করছি।
এরপর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান বলেন, ডকুমেন্টারিতে ৩ আগস্টের বিষয়সহ যা যা অসংগতি আছে, এগুলো আমরা খতিয়ে দেখব। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, আজ আপনারা এই ডকুমেন্টারি দেখে মনে কষ্ট পেয়েছেন। মনে রাখবেন, এই জুলাই আন্দোলন এবং গণ-অভ্যুত্থান আমার, আপনার-আমাদের সবার। তাই এই ডকুমেন্টারির যে অসংগতি, সেটা আমরা সংশোধন করব।
অবশ্য তখনো দর্শকসারি থেকে ‘আমাদের নিয়ে তালবাহানা করা চলবে না’সহ নানা স্লোগান দেওয়া হয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সদস্য সচিব মাহিন সরকার অভিযোগ করেন, এই ডকুমেন্টারির প্রতিবাদ করায় রাষ্ট্রপতির সামনে তার ওপর হামলা হয়েছে। তাকে মারধর করা হয়েছে। নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘প্রদর্শিত ডকুমেন্টারিতে একদফা আন্দোলনের ঘোষক হিসাবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে উপস্থাপন করা হয়েছে। এর প্রতিবাদ জানানোয় রাষ্ট্রপতির সামনেই আমার ওপর হামলা চালানো হয়।’ তিনি আরও লিখেছেন, ‘আমি আজকের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত ডকুমেন্টারির প্রতিবাদ করেছি। রাষ্ট্রপতির সামনে আমার ওপর হামলা করা হয়েছে এবং আমি এটি নিয়ে গর্বিত। নাহিদ ইসলাম নিজের মৃত্যু পরোয়ানায় সই করে একদফার ঘোষণা দিলেন, তিনি ইতিহাসে নেই। যেই আসিফ মাহমুদ মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও ‘মার্চ টু ঢাকা’ ঘোষণা করলেন, তিনিও ইতিহাসে নেই। জুলাইয়ের পরে বেঁচে থাকাটাই আমাদের অপরাধ।’
ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বললেন, ‘আমি ব্যথিত’ : অনুষ্ঠানের শেষের দিকে রাষ্ট্রপতি তার ভাষণে বলেন, এই ডকুমেন্টারিতে আবু সাঈদের ছবি নেই। আবু সাঈদ এই বিপ্লবের প্রতিচ্ছবি। প্রতীক। তার ছবি না থাকলে এটি কোনো ডকুমেন্টারি হলো না। তিনি বলেন, এখানে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ছবি নেই। সুতরাং এই ডকুমেন্টারিতে কিছু ভুল হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী জোড় হাতে এই ভুল স্বীকার করেছেন। বারবার ক্ষমা চেয়েছেন। ফলে এবার শান্ত হওয়া উচিত। এই ভুলকে পুষে রেখে সংসদের মতো একটা ওয়াকআউট করা বাঞ্ছনীয় নয়।
বিশৃঙ্খলার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, ভুলত্রুটি মানুষের হতেই পারে। সবাই মিলে সেসব ভুল সংশোধন করতে হবে। তবে জাতীয় অনুষ্ঠানে বিদেশিদের সামনে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে গভীরভাবে ব্যথিত ও মর্মাহত হয়েছি। এই ঘটনায় সবচেয়ে খুশি হবে যিনি পাশের দেশে বসে আছেন, তার জন্য অত্যন্ত আনন্দের একটি দিন। তিনি আরও বলেন, আমরা নির্বাচিত। ভেসে আসিনি এখানে। তাই নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রতি একটু সম্মান জানানো উচিত।
অনুষ্ঠানস্থল ছাড়ে এনসিপি : বক্তব্যের শেষদিকে আখতার হোসেন বলেন, আমি জুলাই যোদ্ধাদের একজন হয়ে এবং আমার দলের একজন প্রতিনিধি হিসাবে এই প্রোগ্রামের সফলতা কামনা করি; কিন্তু আমার যে সহযোদ্ধারা আছেন, তাদের জন্য একটি সুন্দরের আকাঙ্ক্ষায় আমার পক্ষে এই অনুষ্ঠানে অবস্থান করা সম্ভব নয়। আমি নীরবে এখান থেকে প্রস্থান করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলাম। মঞ্চ ছাড়ার আগে এনসিপির সদস্য সচিব বলেন, রাষ্ট্রীয় একটি অনুষ্ঠানেও ইতিহাসের সবকিছুকে আমরা ধারণ করতে ব্যর্থ হলাম। আপনারা খেয়াল করে দেখবেন, এই বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে যেমন একপেশেভাবে আওয়ামী লীগ দখল করেছিল; ঠিক একই ধরনের একটা পরিস্থিতি এখানে তৈরি হয়েছে।
এর আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ নিজের বক্তব্যে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে ‘দলীয়করণ করা যাবে না’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, আমরা যদি বলি জুলাই কার? জুলাই কার? তাহলে জুলাই আমাদের কারোরই থাকবে না। এই অবস্থা থেকে আমাদের মুক্তি পেতে হবে।
পাবিপ্রবি: দাওয়াত না পাওয়ায় সভা বন্ধ করে দিল ছাত্রদল
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষ্যে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (পাবিপ্রবি) প্রশাসনের আয়োজিত আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিলে আমন্ত্রণ না পাওয়ার অভিযোগ তুলে কর্মসূচি বন্ধ করে দেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। এ সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়ে উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষের বক্তব্য ছাড়াই দোয়ার মাধ্যমে অনুষ্ঠান শেষ করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কনভেনশন সেন্টারে বুধবার সকাল সাড়ে ১০টায় কুরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়। পরে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট পাবনায় নিষিদ্ধ যুবলীগ-আওয়ামী লীগের গুলিতে শহীদ মাহবুব হাসান নিলয়ের বাবা আবুল কালাম আজাদ বক্তৃতা করেন। এরপর আরেক শহীদ জাহিদুল ইসলামের বাবাকে বক্তৃতা করার জন্য মঞ্চে ডাকলে ছাত্রদলের সভাপতি মোজাহিদ হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক তরিকুল ইসলামের নেতৃত্বে নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশ করেন। এ সময় তারা বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন।
পরিস্থিতি সামাল দিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. কামরুজ্জামান খান, ছাত্র উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মো. রাশেদুল হক এবং অনুষ্ঠান আয়োজন কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মো. কামরুজ্জামান তাদের শান্ত করার চেষ্টা করলে উভয় পক্ষের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে ইলেকট্রিক্যাল, ইলেকট্রনিক অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইসিই) বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. ইমরান হোসেন তাদের থামতে বললে ছাত্রদলকর্মী নিশানকে ওই শিক্ষকের দিকে তেড়ে যেতে দেখা যায়।
পরে উপাচার্য মাইক হাতে নিয়ে অনুষ্ঠান শেষে আলোচনায় বসার আহ্বান জানালে ছাত্রদল নেতাকর্মীরা তাকে উদ্দেশ করে ‘ভুয়া, ভুয়া’ বলে স্লোগান দেন। এরপর তারা উপস্থিত শিক্ষার্থীদের অনুষ্ঠানস্থল থেকে বের করে দিতে শুরু করলে স্বাধীনতা হল মসজিদের ইমাম মুফতি শাখাওয়াত হোসেন দোয়া পরিচালনার মাধ্যমে কর্মসূচি শেষ করেন। সংবাদ সংগ্রহের সময় কয়েকজন সাংবাদিকের সঙ্গেও ছাত্রদল নেতাকর্মীরা দুর্ব্যবহার করেন।
তবে ছাত্রদলের দাবি, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ‘স্টেকহোল্ডার’ ও আন্দোলনের সমন্বয়কদের আমন্ত্রণ না জানিয়ে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের দোসরদের অনুষ্ঠানে রাখা হয়েছে। এ কারণেই তারা প্রতিবাদ করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক তরিকুল ইসলাম বলেন, প্রকৃত জুলাই যোদ্ধাদের বাদ দিয়ে এ ধরনের আয়োজন গ্রহণযোগ্য নয়। একই অভিযোগ করেন সভাপতি মোজাহিদ হোসেনও।
অভিযোগ অস্বীকার করে আলোচনা সভার আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মো. কামরুজ্জামান বলেন, কমিটির পক্ষ থেকে সবাইকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। রেজিস্ট্রার দপ্তর থেকে প্রতিটি বিভাগে চিঠি পাঠানো হয়েছে। এমনকি কয়েকজন জুলাই যোদ্ধাকে আমি ব্যক্তিগতভাবেও ফোন করে আমন্ত্রণ জানিয়েছি।
জুলাই যোদ্ধাদের মারধর করে বের করে দিলেন বিএনপি নেতারা
শরীয়তপুরে জুলাই যোদ্ধাদের মারধর করে অনুষ্ঠানস্থল থেকে বের করে দিয়েছেন বিএনপি নেতারা। এ ঘটনার বেশকিছু ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। বুধবার বেলা সাড়ে ১১টায় শরীয়তপুর পৌরসভা অডিটোরিয়ামে এ ঘটনা ঘটে। তবে বিএনপি নেতারা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার পরিবারকে নিয়ে কটূক্তির প্রতিবাদ করেছেন তারা।
প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগী সূত্রে জানা যায়, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস’ উপলক্ষ্যে শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা এবং আলোচনা সভার আয়োজন করে জেলা প্রশাসন। অনুষ্ঠান শুরুর দিকে জুলাই যোদ্ধাদের কয়েকজন উপস্থিত হলে হঠাৎ তাদের ওপর চড়াও হন শরীয়তপুর সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহবুব মোর্শেদ টিপুসহ বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী। এ সময় গেজেটেড জুলাই যোদ্ধা জাকির হোসেন মিন্টু এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক আহ্বায়ক ইমরান আল নাজিরকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে অনুষ্ঠানস্থল থেকে বের করে দেওয়া হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, মাহবুব মোর্শেদ টিপুসহ বিএনপির নেতাকর্মী জাকির হোসেন মিন্টু ও ইমরান আল নাজিরকে মারধর করে ধাক্কা দিয়ে বের করে দিচ্ছেন। এ সময় তাদের চড়-থাপ্পড় দিতেও দেখা যায়।
আহত জুলাই যোদ্ধা জাকির হোসেন মিন্টু যুগান্তরকে বলেন, বিএনপি নেতা টিপুসহ বেশ কয়েকজন মারধর করে বের করে দিয়েছেন। যদি অন্যরা রক্ষা না করতেন, আমাকে হয়তো মেরেই ফেলত তারা। আমরা জুলাই অভ্যুত্থানে রক্ত দিয়েছি, সেই রক্তের ওপর ভর করে তারা এখন সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে। আমাদের যে মারধর করা হয়েছে, সরকার কী পদক্ষেপ নেয় আমরা তা দেখতে চাই।
ইমরান আল নাজির বলেন, প্রশাসনের উপস্থিতিতেই আমাদের মারধর করে বের করে দেওয়া হয়েছে। প্রশাসন সেখানে নীরব ভূমিকা পালন করে। আমরা এ ঘটনার বিচার চাই।
অভিযোগের বিষয়ে মাহবুব মোর্শেদ টিপু যুগান্তরকে বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের বড় অবদান জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির। অভ্যুত্থানে ছাত্রদল, যুবদল ও বিএনপির যত লোক আহত-নিহত হয়েছেন তা অন্য কোনো দলের হয়নি। কিন্তু শরীয়তপুরের ইমরান আল নাজিরসহ এনসিপির নেতাকর্মীরা তারেক রহমান ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে কটূক্তিমূলক লেখালেখি করে থাকে। তারা এই অনুষ্ঠানে এসেও এ ধরনের কটূক্তিমূলক কথা বলায় আমাদের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হলে একপর্যায়ে তাদের বের করে দিয়েছি।
গণমাধ্যমকর্মীরা এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস্) তানভীর হোসেন কোনো বক্তব্য না দিয়ে অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেন।
শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম বলেন, আমরা শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠান শেষ করেছি। তবে যেই অভিযোগটি এসেছে তা জেনে জানাতে পারব। কেননা ঘটনাটি হয়তো অনুষ্ঠান শুরুর আগের।