Image description

জুলাই চেতনায় দেশ গঠনের দৃঢ় অঙ্গীকারের মধ্যদিয়ে সারা দেশে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস। অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষ উপলক্ষে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আলোচকরা বলেছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনায় জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা হবে। গতকাল বুধবার ভোর থেকেই রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি পালিত হয়েছে। রাজধানী ঢাকার শেরেবাংলা নগরে জুলাই স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধন, জেলায় জেলায় শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ, আলোচনা অনুষ্ঠান, ডকুমেন্টারি প্রদর্শনের পাশাপাশি জুলাই যোদ্ধা পরিবার সংবর্ধনা, সাধারণ মানুষসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়।

দিবসটি নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সরকারের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় অনুষ্ঠানের পাশাপাশি বিএনপি, জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল কর্মসূচি পালন করে। জেলা পর্যায়ে অনুষ্ঠানে লক্ষ্মীপুর, শরিয়তপুর, নারায়ণগঞ্জসহ কোথাও কোথাও জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসের আলোচনা সভায় সঙ্ঘাত-সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে বলে জানা গেছে। ঢাকায় চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ডকুমেন্টারি নিয়ে বিতর্কের মধ্যে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টের উপস্থিতিতে এনসিপি নেতারা অনুষ্ঠানস্থল থেকে বের হয়ে যান। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে জুলাই স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর শুধু জুলাই গণঅভ্যুত্থান নয়, বাংলাদেশের সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতিচ্ছবি।

এই জাদুঘর ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, আমাদের চিন্তায় যদি কোনো গাফিলতি আসে, এখান থেকেই তার ঠিকানা খুঁজে আবার নতুন করে যাত্রা শুরু করব। তবে সরকারকে প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, আপনারা যদি বিশ্বাসঘাতকতা না করতেন, তাহলে আমাদের অস্থির হওয়ার কোনো কারণ ছিল না। দেশের এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে আর আমরা বসে থাকব, তা হতে পারে না। 

সবকিছু দেখে মনে হচ্ছে, আরেকটি বিপ্লব আসন্ন। অবশ্য এনসিপির সাবেক সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব ডা. তাসনিম জারা নেতাদের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে বলেছেন, নেতারা রাতে ক্ষমতার টেবিলে পাশাপাশি বসেন, ফোনে দীর্ঘক্ষণ কথা বলেন; অথচ রাজনৈতিক সঙ্ঘাতে মাঠের কর্মীরা চোখ হারায়। জাদুঘর উদ্বোধনে দুটি দৃশ্য দেখলাম। প্রথম দৃশ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রফেসর ড. ইউনূসকে সম্মান দেখিয়ে মঞ্চে নিয়ে নিজের পাশে বসালেন। দ্বিতীয় দৃশ্যে একটি অনুষ্ঠানে হট্টগোল বেধে গেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ মাইকে নাম ধরে ডাকলেন এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেনকে। আখতার হোসেন মঞ্চে উঠে হট্টগোল থামানোর চেষ্টা করলেন।’

জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষ উপলক্ষে গতকাল দেশের সব জেলায় জুলাই শহীদ পরিবার এবং জুলাইযোদ্ধাদের সংবর্ধনা দেয়া হয় এবং দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। ঢাকাসহ সব সিটি করপোরেশন জুলাই আন্দোলনের ওপর বস্তুনিষ্ঠ ও নৈর্ব্যক্তিক দুর্লভ আলোকচিত্র ও প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করে। দিবসটি উপলক্ষে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয় এবং রচনা, আবৃত্তি ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। মানিক মিয়া অ্যাভেনিউ কনসার্টের আয়োজন করা হয়। বৃষ্টির মধ্যেই সেখানে হাজার হাজার মানুষ উপস্থিন হন।

প্রতিটি অনুষ্ঠানের ছিল স্মৃতিচারণ ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের ভয়াবহতা তুলে ধরে বক্তব্য রাখা। পাশাপাশি জুলাই চেতনায় দেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি-অঙ্গীকার। বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আলোচনা সভায় অংশ নিয়ে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীরা জুলাই চেতনায় দেশ পরিচালনার অঙ্গীকার করেন। তারা জুলাই চেতনায় দেশ পরিচালনার দৃঢ় সংকল্প জানিয়ে বলেন, জুলাই-আগস্টের শহীদরা আমাদের জাতীয় ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে যে চেতনা ও আদর্শ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা আগামী প্রজন্মের জন্য দিকনির্দেশনা হয়ে থাকবে। শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং আমাদের শপথ হতে হবে, জুলাই চেতনায় গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ। তারা আরো বলেন, জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান কোনো ব্যক্তি বা একক রাজনৈতিক দলের আন্দোলন ছিল না; এটি ছিল ছাত্র, শ্রমিক, রাজনৈতিক কর্মী, সুশীল সমাজ এবং সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের সম্মিলিত আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের ফল। তাই এ আন্দোলনকে সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিতে মূল্যায়ন না করে জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে ধারণ করতে হবে।

আলোচনায় অংশ নিয়ে অভ্যুত্থানে কয়েকজন আহত জুলাই যোদ্ধা বলেছেন, সাম্য, মর্যাদা আর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল তরুণ সমাজ সেই স্বপ্ন এখনো পূরণ হয়নি। তাদের দাবি জুলাই আন্দোলনে আহত ও শহীদ পরিবারকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা হলে জুলাই আন্দোলন সার্থক হবে। তারা জুলাই হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচারের দাবি জানান। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন শেষে ‘জুলাই-৩৬’ শীর্ষক আলোচনা সভায় ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে হতাহতদের পরিবারের শোকাহত সদস্যদের আশ্বস্ত করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য উপায়ে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে সংঘটিত প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের বিচার হবে। বর্তমান সরকার মনে করে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করার জন্যই প্রতিটি অপরাধের বিচার হওয়া অত্যন্ত জরুরি। বিগত ১৭ বছর এবং জুলাই আন্দোলনে যে মানুষগুলো শহীদ হয়েছেন এবং গুম-খুনের শিকার হয়েছেন, তাদের নামে নিজেদের এলাকায় যেকোনো একটি প্রতিষ্ঠানের নামকরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে সরকার।

এদিন, বেলা ১১টায় রাজধানীর বাংলাদেশ চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জুলাই শহীদ পরিবার এবং জুলাইযোদ্ধাদের সংবর্ধনা ও দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতা করেন ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম। অনুষ্ঠানে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসের প্রদর্শিত একটি তথ্যচিত্রকে (ডকুমেন্টারি) কেন্দ্র করে চরম হট্টগোল ও বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটেছে। প্রদর্শিত তথ্যচিত্রে অভ্যুত্থানের গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস ও ঘটনাপ্রবাহের ‘অসঙ্গতি’ দাবি করে ক্ষোভে ফেটে পড়েন দর্শক সারিতে থাকা এনসিপি নেতারা। অনুষ্ঠান চলাকালে প্রধান অতিথি ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হাফিজ উদ্দিন আহমদের উপস্থিতিতেই এ হট্টগোল শুরু হয়। হট্টগোলের মুখে প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা বাহিনীর সদস্যরা দ্রুত স্টেজ ও প্রেক্ষাগৃহে অবস্থান নেন।

অনুষ্ঠান সূত্রে জানা যায়, গণঅভ্যুত্থানের ওপর নির্মিত তথ্যচিত্রটিতে আন্দোলন-সংগ্রামের প্রকৃত চিত্র সঠিকভাবে ফুটে ওঠেনি এবং বিশেষ করে ৩ আগস্টের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাপ্রবাহকে পুরোপুরি অনুপস্থিত রাখা হয়েছে এমন অভিযোগ করেন এনসিপি নেতারা। তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে হইচই শুরু করলে অনুষ্ঠানস্থলে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে উপস্থাপক বারবার আমন্ত্রিতদের শান্ত হওয়ার অনুরোধ জানাতে থাকেন। একপর্যায়ে মঞ্চে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, ‘আপনাদের মধ্য থেকে যারা বক্তব্য দিতে চান, দয়া করে এখানে এসে কথা বলুন।

আপনারা শান্ত হয়ে বসুন।’ একই সময় তিনি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব আখতার হোসেনকে মঞ্চে আহ্বান জানান। মঞ্চে উঠে আখতার হোসেন আন্দোলনকারীদের শান্ত হওয়ার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, ‘ডকুমেন্টারিতে যে অসঙ্গতি আছে তা আমরা দেখেছি এবং আমরা সরকারকে বিষয়টি জানাব। ৩ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ এখানে একেবারে অনুপস্থিত। এসব নিয়ে আমরা মন্ত্রণালয়ের কাছে জবাবদিহি চাইব। তবে আজকের এই ঐতিহাসিক দিনে শহীদ পরিবারের সম্মানে আমাদের শান্ত থাকতে হবে।’

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী আহমেদ আযম খান তাৎক্ষণিক বক্তব্যে দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘আজকে আপনারা এই ডকুমেন্টারি দেখে মনে কষ্ট পেয়েছেন। এই জুলাই আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থান আমাদের সবার। তথ্যচিত্রে ৩ আগস্টের বিষয়সহ যে সব অসঙ্গতি রয়েছে, আমরা তা গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখব এবং দ্রুত সংশোধনের ব্যবস্থা নেবো।’

গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে ১১-দলীয় জোট রাজধানীর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের দক্ষিণ গেটে সমাবেশের আয়োজন করে। সেখানে জামায়াত, এলডিপি, এনসিপি, জাগপাসহ শরিক দলগুলোর নেতারা বক্তৃতা করেন। সেখানে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, সরকার দেশের বারোটা বাজবে আর আমরা আঙুল চুষব, এটা হবে না। পাপের পরিণতি পেতে কিছুটা সময় লাগে। কিন্তু একসময় সেই পাপই পচে গিয়ে ঝরে পড়ে। এখন সেই পাপে পচন ধরেছে। সরকার যদি তা বুঝতে পারে, তাহলে ভালো। না বুঝতে পারলে তাদের পতন কেউ ঠেকাতে পারবে না। বিএনপি ফ্যাসিবাদী আচরণ করলে জনগণ আপনাদের ফ্যাসিবাদী বলবেই। তাই ফ্যাসিবাদী আচরণ পরিহার করুন। জনগণকে সম্মান করলে জনগণও আপনাদের সম্মান করবে।

এ ছাড়াও বাম ধারা ও ইসলামী ধারার রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের মতো করে জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষ উপলক্ষে আলোচনা সভার আয়োজন করেন।