জুলাই আন্দোলনের দুই বছরের মাথায় আবারও দেশের শিক্ষাঙ্গনগুলোতে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। মূলত আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ক্ষমতাসীন বিএনপির সহযোগী সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনায় এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এতে দুই পক্ষেরই বেশ কিছু নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে পুরান ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) দুপুরে সেখানে ছাত্রদলের সঙ্গে শিবির ও জাতীয় ছাত্রশক্তির সংঘর্ষে জকসু ভিপি রিয়াজুল ইসলামসহ প্রায় অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী আহত হন। হামলা থেকে রেহাই পাননি গণমাধ্যমকর্মীরাও। দ্বিতীয় দফায় ন্যাশনাল হাসপাতালের সামনেও মারামারি হয়।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু হওয়া সহিংসতার রেষ ছড়িয়ে পড়ে রাজধানীর আরও তিন বিদ্যাপীঠে। এর মধ্যে ঢাকা কলেজ, বকশীবাজারের আলিয়া মাদ্রাসা ও সোহরাওয়ার্দী কলেজে মারামারিতে একাধিক শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। আরও আহত হয়েছেন ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ।
ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজে উত্তেজনা
ঘটনায় দুপক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ তুলেছে। এই উত্তেজনার সূত্রপাত হয় রবিবার (২ আগস্ট) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। সেখানে শহীদুল্লাহ হলের শিবির সমর্থিত এজিএসের কক্ষে দুই বহিরাগতের বিরুদ্ধে সমকামিতার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনার জন্য ওই জিএসকে দায়ী করে ছাত্রদল। এ নিয়ে ছাত্রদল ও শিবিরের নেতাকর্মীরা ক্যাম্পাসে পাল্টাপাল্টি বিক্ষোভ করেন। এর একদিন পর সোমবার (৩ আগস্ট) রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবির আয়োজিত ‘জুলাই প্রদর্শনী’ ঘিরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যে রাবির প্রদর্শনীতে যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের ছবি থাকায় আপত্তি জানায় বাম ও প্রগতিশীল সংগঠনগুলো। একপর্যায়ে তা সরিয়ে নিতে বাধ্য হয় প্রশাসন। একই ইস্যুতে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষে জড়ায় ছাত্রদল-শিবির। জুলাইয়ের দুই বছরপূর্তিকে ঘিরে একদিকে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের তৎপরতা, অপরদিকে সাবেক দুই মিত্র বিএনপি ও জামায়াতের ছাত্র সংগঠনের এমন সহিংসতায় উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক মাঠ। একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক আবহে এমন অস্থিরতা আসলে কীসের আলামত? এমন প্রশ্ন সামনে আসছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, জুলাই পরবর্তীকালে শিক্ষাঙ্গনে এ ধরনের একটি অসহিষ্ণু পরিবেশ কাম্য নয়। কারণ এর পরিপ্রেক্ষিতে আগামী দিনে জাতীয় রাজনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এক্ষেত্রে দেশের স্থিতিশীলতার জন্য সব পক্ষকেই সহনশীলতার পরিচয় দেওয়ার পরামর্শ দেন তারা।
এ বিষয়ে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানে নানা মত-পথের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমেই একটি অগণতান্ত্রিক শক্তির পতন হয়েছিল। মানুষের মাধ্যমে ধারণা তৈরি হয়েছিল এটি কখনও সম্ভব নয়। কিন্তু তারপরও মানুষ ঠিকই রাজপথে নেমে এসেছে। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বর্তমানে যা হচ্ছে, তা অপ্রত্যাশিত।’’ তিনি বলেন, ‘‘আমি মনে করি জুলাইয়ের চেতনা সমুন্নত রাখতে সবাইকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।’’
অস্থিরতার সূত্রপাত যেখান থেকে
তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠনের পর প্রথমবারের মতো শিক্ষাঙ্গন অশান্ত হয় চলতি বছরের মে মাসে। তখন চট্টগ্রামের চট্টগ্রাম কলেজ ও হাজী মুহাম্মদ মুহসীন কলেজ ছাত্রদল-শিবিরে সংঘর্ষ হয়। পরে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেও তা ছড়িয়ে পরে। মাঝে কয়েক মাস পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিল।
তবে সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সমকামী’ ইস্যুতে প্রথমবারের মতো মুখোমুখি হয় ছাত্রদল ও শিবির। গত ২ আগস্ট শহীদুল্লাহ হলে শিবিরের এজিএস ইব্রাহিমের কক্ষে তার দুই অতিথির বিরুদ্ধে সমকামিতার অভিযোগ আনে ছাত্রদল। যদিও এজিএসের পক্ষ থেকে জানানো হয়—এর সঙ্গে তার কোনও সম্পৃক্ততা নেই। তবে বিষয়টি গড়ায় প্রশাসন পর্যন্ত। এ নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। যদিও প্রতিবেদন প্রকাশের আগেই ক্যাম্পাসে পাল্টাপাল্টি বিক্ষোভ করে দুই সংগঠন। এ সময় প্রধনমন্ত্রী তারেক রহমান ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের বিরুদ্ধেও স্লোগান দেওয়া হয়।
দণ্ডিত জামায়াত নেতাদের ছবি ঘিরে অশান্ত উত্তরের দুই বিশ্ববিদ্যালয়
জুলাই আন্দোলনের দুই বছরপূর্তি উপলক্ষে তিন দিনব্যাপী প্রদর্শনীর আয়োজন করে উত্তরাঞ্চলের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবির। সেখানে দণ্ডিত জামায়াত নেতা নিজামী, মুজাহিদ ও সাইদীর ছবি প্রদর্শনকে আপত্তি জানায় প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলো। এ নিয়ে শিবিরের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে তারা। এসব ছবি সরিয়ে ফেলার জন্য আল্টিমেটাম দেন তারা। শেষ পর্যন্ত ২ আগস্ট প্রশাসনের পক্ষ থেকে এসব ছবি সরানো হলে পরিস্থিতি শান্ত হয়।
পরদিন (৩ আগস্ট) একই কারণে রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) ছাত্রদলের সঙ্গে শিবিরের দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে শাখা ছাত্রদলের সহ-সভাপতি আশিক, ছাত্রশিবির-সমর্থিত বেরোবি শিক্ষার্থী পরিষদের জিএস পদপ্রার্থী মেহেদী হাসান এবং শাখা ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি সোহেল রানাসহ কমপক্ষে ১০ জন আহত হন। সেখানে ছাত্রদলকে ধাওয়া করে ক্যাম্পাসের নিয়ন্ত্রণ নেয় শিবির।
জগন্নাথের সংঘর্ষ গড়ায় হাসপাতাল পর্যন্ত
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) দুপুর পৌনে ১২টার দিকে সংঘর্ষে জড়ায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল-শিবির ও জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতাকর্মীরা। এর আগে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান ক্যাম্পাসের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে একটি অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্য পৌঁছান। এই অনুষ্ঠান ঘিরে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। এতে শিবির সমর্থিত জকসু ভিপি রিয়াজুল ইসলাম খানসহ উভয়পক্ষের কমপক্ষে ২৭ জন আহত হন। এ পর্যায়ে শিবিরের নেতাকর্মীদের ক্যাম্পাস থেকে তাড়িয়ে দিয়ে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা অবস্থান নেন।
এরপর দুপুর ২টায় ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ছাত্রশিবিরের বিভিন্ন ইউনিটের নেতাকর্মীরা জড়ো হন। আর হাসপাতালের মূল ফটকের বাইরে ছাত্রদল নেতাকর্মীরা জড়ো হয়ে স্লোগান দিতে থাকেন।
একপর্যায়ে ছাত্রশিবির নেতাকর্মীরা ধাওয়া করতে গেলে ছাত্রদলের পাল্টা ধাওয়ায় শিবিরের নেতাকর্মীরা হাসপাতালের ভেতরে ছুটে যান। তখন দুইপক্ষ একে অপরের দিকে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এ ঘটনার জন্য পরস্পরকে দায়ী করেন নেতারা।
ঢাকা কলেজ ও আলিয়া মাদ্রাসায়ও অভিন্ন চিত্র
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংঘর্ষের বিস্তৃতি ঘটে ঢাকা কলেজ ও ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসায়। দুপুরে ঢাকা কলেজ ক্যাম্পাসের ভেতরে মারামারিতে জড়িয়ে পড়ে ছাত্রদল ও শিবির। এতে কয়েকজন আহত হন। এ সময় কলেজের সামনের সড়কে অবস্থান নিয়ে মিছিল করেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। বেলা সাড়ে তিনটার দিকে নিউ মার্কেট এলাকায় দুটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটে। তবে এতে কোনও হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। এরপরই বিকাল ৫টায় বকশীবাজারে ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার সামনে ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ হয়। তখন দুই সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়।
হঠাৎ কেন সংঘর্ষ?
জুলাই পরবর্তীকালে ঢাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে বড় ধরনের কোনও সহিংসতার ঘটনা ঘটেনি। তবে জুলাই আন্দোলনের দুই বছরপূর্তির মুহূর্তে জুলাইয়ের দুই শক্তির মধ্যে এমন সংঘর্ষকে অশনিসংকেত হিসেবে দেখছেন কেউ কেউ। তাদের দৃষ্টিতে ক্যাম্পাসকে স্থিতিশীল রাখতে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের দায়িত্বশীল আচরণ জরুরি। এক্ষেত্রে ছাত্রদল কতটুকু দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে পেরেছে, সেটাও প্রশ্ন সাপেক্ষ। অন্যদিকে ইসলামী ছাত্রশিবিরের বিষয়ে একঘেয়েমির অভিযোগ আনছেন অনেকে। বিশেষ করে এই সময়ে মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিতদের ছবি ক্যাম্পাসে প্রদর্শনের বিষয়টিকে উসকানি হিসেবে দেখছেন তারা। জানতে চাইলে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘এ সময়ে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের পরিস্থিতি দুঃখজনক। তিনি এর জন্য শিবিরকে দায়ী করে বলেন, ‘‘তারা মানবতাবিরোধী অপরাধীদের পক্ষ নিয়ে তাদের অপরাধকে জায়েজ করতে চায়। যাতে অন্যরা আরও ক্ষিপ্ত হয়। এর মাধ্যমে ছাত্রদল তাদের ফাঁদে পড়েছে কিনা, সে প্রশ্নও সামনে আসছে।
কীসের ইঙ্গিত? কী বলছেন রাজনীতিকরা
একদিকে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীর ফিরে আসার ঘোষণা, আরেকদিকে জামায়াতসহ ১১ দলীয় জোটের কঠোর আন্দোলন কর্মসূচিকে সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এমনিতেই উত্তপ্ত। এর মধ্যে সরকার ও বিরোধী দলের দুই ছাত্র সংগঠনের এ ধরনের রেষারেষি আগুনে ঘি ঢেলে দিতে পারে। এতে তৃতীয় কোনও শক্তি সামনে আসতে পারে কিনা, সে প্রশ্নও উঠেছে।
নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘জুলাইয়ের পক্ষের শক্তিগুলোর বিভাজনের কারণে পরাজিত শক্তি সুযোগ নিতে পারে। তাই বিষয়টি লক্ষ রাখা জরুরি।’’
জানতে চাইলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারে ড. হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ‘‘সরকার সব ক্ষেত্রে আগ্রাসী মনোভাব পোষণ করছে। মূলত এ কারণেই শিক্ষাঙ্গনে তাদের ছাত্র সংগঠন বেপরোয়া আচরণ করছে। যা ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠারও ইঙ্গিত। তারা যদি আবারও অপশক্তির সঙ্গে আঁতাত করে, সেটা কারও জন্যই ভালো হবে না।’’
ভিন্ন অভিযোগ করছেন বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা আমানউল্লাহ আমান। তিনি বলেন, ‘‘বিরোধী দলই মূলত পতিত ফ্যাসিবাদকে ফিরিয়ে আনতে চায়। তাই তাদের ছাত্র সংগঠন ক্যাম্পাসকে অশান্ত করার মিশন নিয়ে মাঠে নেমেছে। তবে সাধারণ শিক্ষার্থীরা নিশ্চয়ই অপশক্তিকে প্রতিহত করবে।’’

