চব্বিশের ২০ জুলাই আন্দোলনে গিয়ে যাত্রাবাড়ী রায়েরবাগের খাম্বার কাছে গুলিতে নিহত হন আব্দুর রহমান জিসান (২০)। তিনি পানির ব্যবসা করতেন। জিসানের বাবা আফ্রিকাপ্রবাসী বাবুল সরদার জানিয়েছেন, ছেলে হত্যার বিচার চেয়ে ওই বছর ৩০ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে ঢাকার সিএমএম আদালতে মামলা করা হয়। যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশ তদন্ত করছে।
যাত্রাবাড়ী থানার সামনে হানিফ ফ্লাইওভারের নিচে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে গুলিবিদ্ধ হন শিক্ষার্থী মিরাজ হোসেন। গুলিটি মিরাজের বাঁ পাঁজর ভেদ করে বের হয়ে যায়। হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে মৃত্যু হয় তাঁর। মিরাজের বাবা মো. আব্দুর রব কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘ছেলেকে তো আর ফিরে পাব না। দোষীদের ফাঁসি হোক, এটাই আমার চাওয়া। আমি ন্যায়বিচার চাই।’
রায়ের বাজার এলাকায় ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই ছাত্র আন্দোলনে গিয়ে পুলিশের গুলিতে মারা যান মো. সোহেল রানা (৩৯)। তাঁর মা রাশেদা বেগম বলেন, ‘আমার ছেলের লাশ পাই নাই। কোনো মামলাও করি নাই। মামলা করে কী হবে। ছেলে তো পাব না। দুই বছর হয়ে গেল আমার বুক খালি। হত্যার বিচার হয় নাই। কোথায় বিচার হচ্ছে তাও জানি না।’
বাবুল সরদার, আব্দুর রব ও রাশেদা বেগমের মতো অর্ধশতাধিক স্বজন গতকাল রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর নবী টাওয়ার কনফারেন্স রুমে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয় আয়োজিত ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যাত্রাবাড়ী : শহীদ পরিবার ও আহতদের গণশুনানি’ অনুষ্ঠানে অংশ নেন। তারা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলামের সামনে স্বজন হারানো ঘটনা বর্ণনা করেন। কেউ সন্তান, কেউ বাবা ও ভাই হত্যার বিচার চেয়ে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন।
স্বজন জানান, দুই বছর ধরে প্রিয়জনদের হারিয়ে তারা নির্বাক। নানা আশার বাণী শুনলেও দৃশ্যমান কোনো আর্থিক সহযোগিতা পাননি। চব্বিশের শহীদ পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য শুনে ন্যায়বিচার ও নিশ্চিত ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দেন চিফ প্রসিকিউটর।
গণশুনানির পর চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘সঠিক ও মানসম্মত বিচারের মাধ্যমে জুলাই শহীদদের রক্তের ঋণ আমরা শোধ করতে চাই।’ এ জন্য তথ্য-উপাত্ত দিয়ে সবার সহযোগিতা কামনা করেন তিনি। এ সময় স্থানীয় বিএনপি নেতা নবীউল্লাহ নবী, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর, তদন্ত সংস্থাসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।
আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনে সবচেয়ে বেশি শহীদ হয়েছেন এই যাত্রাবাড়ীতে। আমরা প্রাথমিকভাবে ৮৫ জনের তালিকা পেয়েছি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট যাত্রাবাড়ীতে ৫০-৫৫ জনকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এই ঘটনার পর কেউ থানায় বা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা করেছেন।’ তিনি বলেন, ‘যাত্রাবাড়ীতে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হবে। অনেকগুলো মামলা ট্রাইব্যুনালে তদন্তাধীন আছে। এই এলাকার সব হত্যা মামলা একত্রিত করে একটা অভিযোগপত্র দাখিলের মাধ্যমে বিচার করার চেষ্টা করা হচ্ছে। অন্যথায় পৃথকভাবে এসব মামলার বিচার করতে গেলে দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার।’
এ সময় ঢাকা মহানগর দক্ষিণের বিএনপি নেতা নবীউল্লাহ নবী বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থনে শহীদ না হলে স্বৈরাচারের পতন ঘটানো সম্ভব হতো না। আমরা শহীদ পরিবারকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই। সেজন্য সরকারসহ সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।’