Image description

দীর্ঘদিনের দখল এবং হাজারো শিল্পকারখানার বিষাক্ত বর্জ্য সরাসরি নিঃসরণে ঢাকার প্রাণ বুড়িগঙ্গা নদী আজ চূড়ান্ত অস্তিত্বসংকটে পতিত। নদীর পানি কালচে ও গন্ধযুক্ত হয়ে মাছসহ সব ধরনের জলজ প্রাণ হারিয়ে গেছে। বিশেষ করে পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়ে বছরের পর বছর চলা দখলের কারণে কোথাও কোথাও নদীর সীমানাও বিলীন হতে বসেছে। শত বছর স্থায়ী হওয়ার কথা থাকলেও দুই-তিন বছরের মধ্যেই অনেক সীমানাপিলার গায়েব হয়ে গেছে। সাত বছর ধরে উচ্ছেদ অভিযান ও কয়েক হাজার কোটি টাকা খরচ করেও রক্ষা করা যাচ্ছে না নদীটি। তবে আশার কথা হলো, বর্তমান সরকার বুড়িগঙ্গাসহ রাজধানীর চারপাশের নদীগুলো দখল ও দূষণমুক্ত করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে।

সম্প্রতি বুড়িগঙ্গা নদীর বিভিন্ন এলাকা সরেজমিন পরিদর্শনে মিলেছে দখলদূষণের ভয়াবহ চিত্র। একই অবস্থা তুরাগ নদেরও। অথচ বুড়িগঙ্গা দখলমুক্ত করতে সাত বছর আগে শুরু হয়েছিল জোরালো অভিযান। ভেঙে ফেলা হয়েছিল প্রায় ৭ হাজার অবৈধ স্থাপনা। তখন দাবি করা হয়েছিল, বুড়িগঙ্গার ৯৫ শতাংশের বেশি দখলমুক্ত হয়েছে। কিন্তু সেই সাফল্য টেকেনি। উচ্ছেদ করা জায়গার বড় অংশেই আবার ফিরে এসেছে দখলদাররা। নদীর সীমানায় গড়ে উঠেছে ঘরবাড়ি, দোকান, পার্ক, ডকইয়ার্ড ও বালুর গদি। কোথাও ইট-বালু ও বর্জ্য ফেলে নদী ভরাট করা হচ্ছে। অনেক সীমানাপিলার হারিয়ে গেছে, অনেকটি হেলে পড়েছে। নদীপথে ঢাকা সিটির পাশ দিয়ে কামরাঙ্গীর চর থেকে গাবতলী এবং ফিরতি পথে কেরানীগঞ্জের ওয়াশপুর থেকে মধ্যেরচর পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় নতুন দখল, পুনর্দখল ও ভরাটের অসংখ্য প্রমাণ মিলেছে।

কাটা হয়নি ভরাট জমি : বিআইডব্লিউটিএর পরিকল্পনা অনুযায়ী, উচ্ছেদের পর ভরাট করা জমি খনন করে আবার নদীতে ফিরিয়ে আনার কথা ছিল। কিন্তু বেশির ভাগ ভরাট জমিই আর কাটা হয়নি। ফলে উদ্ধার করা সেই জমি আবারও দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। কোথাও নতুন দখলদার এসেছে। সেখানে নতুন স্থাপনা উঠেছে, কোথাও ব্যবসা চলছে।

33ঢাকা প্রান্তে দখল : সরেজমিনে দেখা যায়, কামরাঙ্গীর চরের খোলামোড়া ঘাট থেকে ঝাউচর পর্যন্ত নদীর সীমানাপিলারের ভিতরে গড়ে উঠেছে অসংখ্য নতুন ঘরবাড়ি, দোকান ও ইট-বালুর গদি। বসিলা পার হয়ে তুরাগ নদের ভিতরের চরে চলছে ইটভাটা। একই এলাকায় নদীর মাঝে জেগে ওঠা চরে ‘ঢাকা ফ্যান্টাসি আইল্যান্ড’ নামে একটি ইকো রিসোর্ট নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সানসেট গ্রুপ নামে একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, চরের ১০০ শতাংশ জমি তাদের মালিকানাধীন। স্থানীয় মাঝিরা জানান, নদীর মাঝের চরটিতে দীর্ঘদিন ধরে চোলাই মদ তৈরি হয়। সেখানে নিয়মিত মাদকের আসর বসে। অপহরণসহ নানান অপরাধও ঘটে বলে ধারণা তাদের।

কেরানীগঞ্জ প্রান্তে দখল : কেরানীগঞ্জ অংশে খোলামোড়া নৌকাঘাটসংলগ্ন (মধ্যেরচর ৭ নম্বর পিলারের সামনে) নদীর ভিতর ইটের গাঁথুনি দিয়ে ভরাট করা জমিতে সম্প্রতি তৈরি করা হয়েছে একটি পার্ক। জায়গাটি যে নদীর অংশ তা জানতেন না বলে জানান পার্কটির উদ্যোক্তা বাবু। অথচ ২০১৯ সালের উচ্ছেদ অভিযানে একই স্থানের আগের স্থাপনা ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। একই এলাকায় সীমানাপিলারের ভিতরে গড়ে উঠেছে রেস্তোরাঁ, ওয়ার্কশপ, দোকানপাট ও বসতবাড়ি। সেখান থেকে বসিলার দিকে কিছুটা গেলে দেখা যায়, নদীর ভিতরে কয়েক একর এলাকা ভারী প্লাস্টিক দিয়ে ঘিরে মাছ চাষ করা হচ্ছে। স্থানীয় মাঝিদের ভাষ্য, মাছ চাষের নামে ঘেরা দেওয়া জায়গাটি ধীরে ধীরে ভরাট করা হবে। পাশের জায়গাটিও একইভাবে ভরাট করা হয়েছে। মধ্যেরচর এলাকায় সাবেক সংসদ সদস্য হাজি সেলিমের মদিনা মেরিটাইম লিমিটেডের ডকইয়ার্ডের একাংশ নদীর ভিতর ভরাট করা জমিতে গড়ে উঠেছে। পাঁচটি সীমানাপিলারের (৭০ থেকে ৭৪ নম্বর) সামনে কয়েক শ ফুট নদী ভরাট করে সেখানে কার্গো জাহাজ নির্মাণ চলছে। পাশেই ৭৫ নম্বর পিলারের পরে নদী ভরাট করা জমিতে রয়েছে পাথরের গদি ও স্থাপনা।

বর্জ্য ফেলে নদী ভরাট : কামরাঙ্গীর চরের খোলামোড়া ঘাট ও নবাবচর ৬০ নম্বর সীমানাপিলারের সামনে প্রতিদিন ইট, বালু ও কঠিন বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। মোহাম্মদপুর গ্রিন সিটির পাশ দিয়ে ওয়াকওয়ে থেকেই ঝুড়িতে করে নির্মাণবর্জ্য নদীতে ফেলতে দেখা গেছে। কেরানীগঞ্জের খোলামোড়া নৌকাঘাট এবং অবৈধ পার্কটির মাঝে নদীর মধ্যে অন্তত ৪০ ফুট জায়গা বর্জ্য ফেলে ভরাট করা হচ্ছে।

গায়েব অনেক সীমানাপিলার : শত বছর স্থায়ী হওয়ার কথা থাকলেও দুই-তিন বছরের মধ্যেই অনেক সীমানাপিলার নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। কামরাঙ্গীর চর এলাকায় ৩১ নম্বর পিলারের গা ঘেঁষে নদীর ভিতরে রয়েছে বহুতল ভবন। ৩২ থেকে ৩৫ নম্বর পিলার খুঁজে পাওয়া যায়নি। সেখানে এখন কাঁচাপাকা ঘরবাড়ি। গোড়া থেকে মাটি সরে যাওয়ায় এবং পাশের ভবনের চাপে ৪৫ নম্বর পিলার নদীর দিকে হেলে পড়েছে। ৪৬ নম্বর পিলারের দেখা মেলেনি। ৪৭ নম্বর পিলারের গোড়ার মাটি সরে গেছে। পিলারগুলো রক্ষায় বালুর বস্তা ফেলে চাপা দেওয়া হয়েছে। রামচন্দ্রপুরে ২১ ও ২৪ নম্বর সীমানাপিলার থাকলেও ২২ ও ২৩ নম্বর পিলার দেখা যায়নি। মধ্যেরচরে হাজি সেলিমের ডকইয়ার্ডের পাশে ৭৫ নম্বরের পরের কয়েকটি সীমানাপিলার খুঁজে পাওয়া যায়নি। ওয়াশপুরে নতুন বালুর গদির নিচে চাপা পড়েছে সীমানাপিলারের নামফলক ও নম্বর।

আসলামুল হকের প্রকল্পে ১৪ কিলোমিটার নদী বেদখল : বসিলা ব্রিজসংলগ্ন বুড়িগঙ্গা-তুরাগের সংযোগস্থলে নদী ও সংলগ্ন ভূমি দখল করে ‘আরিশা প্রাইভেট ইকোনমিক জোন’ এবং সিএলসি পাওয়ার কোম্পানি নামে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করেছিল ঢাকা-১৪ আসনের প্রয়াত সংসদ সদস্য আসলামুল হক ও তাঁর পরিবারের মালিকানাধীন মাইশা গ্রুপ। ২০২০ সালে জাতীয় নদীরক্ষা কমিশন জানায়, ৫৪ একরের বেশি নদী, নদীবন্দর এলাকার জমি ও ফ্লাড ফ্লো জোন দখল করে অর্থনৈতিক অঞ্চলটি গড়ে তোলা হয়েছে।

দখলদারের সংখ্যা কত : ২০১৯ সালে দখলদারের সংখ্যা ছিল ৫৭ হাজার ৩৯০। অভিযান চালিয়ে ১৮ হাজার ৫৭৯টি দখল উচ্ছেদ করা হলেও একই বছরের বার্ষিক প্রতিবেদনে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৩ হাজার ২৪৯। সর্বশেষ চলতি বছরের জুনে সংসদে নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানান, ২০২৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে ২১ হাজার ৯৮৮ অবৈধ নদী দখলদার শনাক্ত হয়েছে।

যা বলছে গবেষণা : বুড়িগঙ্গার বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে মিল পাওয়া গেছে ২০২৪ সালে প্রকাশিত দেশিবিদেশি সাত প্রতিষ্ঠানের যৌথ গবেষণা প্রতিবেদনে। সরেজমিন পর্যবেক্ষণ, সরকারি নথি, পুরোনো সিএস ম্যাপ এবং স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে তৈরি ‘বুড়িগঙ্গা-নিরুদ্ধ নদী পুনরুদ্ধার’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়েছে, ওয়াশপুর থেকে হযরতপুর পর্যন্ত অন্তত ১৬ কিলোমিটার বুড়িগঙ্গা এখন ভরাট, দখল ও প্রবাহহীনতার শিকার। গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, বুড়িগঙ্গার প্রবহমান অংশে বসানো ১ হাজার ৯২টি সীমানাপিলারের মধ্যে মাত্র ২৬০টি যথাযথ অবস্থায় রয়েছে। এ ছাড়া ৭১৮টি পিলার ভাঙা এবং ১১৪টির অবস্থান শনাক্ত করা যায়নি। ভরাট হয়ে যাওয়া শুকনো অংশে কোনো সীমানাপিলারই বসানো হয়নি। গবেষণায় বুড়িগঙ্গার দুই তীর ঘেঁষে ২৫০টি স্থাপনা শনাক্ত করা হয়।

গবেষণাটির প্রধান গবেষক শেখ রোকন বলেন, ‘বুড়িগঙ্গাকে পরিকল্পিতভাবে গলা টিপে হত্যা করা হয়েছে।’ তাঁর দাবি, ওয়াশপুর থেকে হযরতপুর পর্যন্ত প্রায় ১৬ কিলোমিটার অংশ এখন ‘মরা বুড়িগঙ্গা।’ এ অংশ পুনরুদ্ধারের উদ্যোগও সরকারি পরিকল্পনা থেকে বাদ পড়েছে। সেখানে সীমানাপিলারও বসানো হয়নি। তিনি বলেন, ‘পানি উন্নয়ন বোর্ডের ২০০৫ সালের দলিলে বুড়িগঙ্গার দৈর্ঘ্য ৪৫ কিলোমিটার বলা হলেও ২০১১ সালে তা ২৯ কিলোমিটার দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ ১৬ কিলোমিটার নদী কাগজ থেকেই হারিয়ে গেছে। এ ১৬ কিলোমিটার ভুলে যাওয়া কি দখলদারদের সুবিধা দেওয়ার জন্য?’ তাঁর অভিযোগ, নদী ভরাটের পর বিভিন্ন স্থানে নির্দিষ্ট পয়েন্টের বাইরে সীমানাপিলার বসানো হয়েছে। সেই সুযোগে দখল আরও বিস্তৃত হয়েছে। গত দুই দশকে বুড়িগঙ্গা রক্ষায় অন্তত ৩ হাজার ২৯৪ কোটি টাকার আটটি প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও দৃশ্যমান সুফল মেলেনি।

দূষণ ঘটাচ্ছে ৪২৪ স্যুয়ারেজ পয়েন্ট : বিআইডব্লিউটিএ ঢাকার চারপাশের নদীতে ৪২৪টি স্যুয়ারেজ আউটলেট শনাক্ত করেছে। এসব পাইপ দিয়ে প্রতিনিয়ত অপরিশোধিত পয়োবর্জ্য ও রাসায়নিক মিশ্রিত তরল বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলা হচ্ছে। ফলে নদীর পানি কালচে হয়ে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।

যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা : নদী ও প্রকৃতি সুরক্ষা সামাজিক আন্দোলন ‘তরী বাংলাদেশ’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও আহ্বায়ক শামীম আহমেদ বলেন, ‘দীর্ঘদিন দেখছি যারাই দায়িত্বে আসেন তারা ঢাকার চার নদনদী নিয়ে হাঁকডাক দিয়ে মাঠে নামেন। দখল-উচ্ছেদ-পুনর্দখল-হাতবদল এখন চোর-পুলিশ খেলায় পরিণত হয়েছে।’ এ বিষয়ে ঢাকার চার নদী সংরক্ষণ প্রকল্পের পরিচালক আবু জাফর মোহাম্মদ শাহনেওয়াজ কবির বলেন, ‘গত দুই বছর নদী উদ্ধার কার্যক্রম এক প্রকার বন্ধ ছিল। সেই সুযোগে অনেকে নতুন করে দখল নিয়ে থাকতে পারে। অনেকে বাউন্ডারি ওয়াল দিয়ে সীমানাপিলার ঘিরে ফেলেছে বলেও জানতে পেরেছি।’

সরকারি তথ্য ও বাস্তবতা : সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সাল থেকে বিআইডব্লিউটিএ ২৮ হাজার ৩২৫টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে ১ হাজার ২৪৪ দশমিক ২২ একর তীরভূমি উদ্ধার করেছে। অথচ সরেজমিনে দেখা গেছে, উদ্ধার করা জায়গায় আবার স্থাপনা উঠছে, নদীর ভিতরে নতুন ভরাট হচ্ছে, হারিয়ে যাচ্ছে সীমানাপিলার।