Image description

রাজধানীর ডুমনি এলাকার বাসিন্দা চার বছরের রায়হান আহমেদ এবার ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইনের আওতায় আসতে পারেনি। তার বাবা শফিক আহমেদ বলেন, ‘ক্যাম্পেইনের বিষয়ে আমরা জানতামই না। পরদিন জানতে পেরে কেন্দ্রে গেলে কাউকে পাইনি। পরে কাউন্সিলর কার্যালয়ে গিয়ে জানতে পারি ক্যাপসুল আছে, কিন্তু স্বাস্থ্য বিভাগের কেউ না থাকায় তা খাওয়ানো সম্ভব নয়। আমার পাশের ফ্ল্যাটের দুটি শিশুও একই কারণে ক্যাপসুল পায়নি।’

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ডুমনি এলাকায় ৪৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর কার্যালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাদ পড়া শিশুদের জন্য কিছু ক্যাপসুল সংরক্ষিত রয়েছে। তবে স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মী না থাকায় আগত অভিভাবকদের ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অন্ধত্ব প্রতিরোধ এবং শিশুদের পুষ্টিহীনতা দূর করতে ২৮ জুন সারা দেশে জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন পরিচালিত হয়। এতে ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সি শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো হয়। তবে প্রচারের ঘাটতি, শিশু অসুস্থ থাকা কিংবা বিভিন্ন কারণে অনেক অভিভাবক সন্তানকে কেন্দ্রে নিতে পারেননি।

জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের (আইপিএইচএন) প্রথম রাউন্ডের চূড়ান্ত প্রশাসনিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২ কোটি ২৭ লাখ ৬ হাজার ৩১৪ শিশুকে ক্যাপসুল খাওয়ানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৬ হাজার ৫০৬ শিশু ক্যাপসুল পেয়েছে, যা মোট লক্ষ্যমাত্রার ৯৯ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ প্রায় ১ লাখ ৩৯ হাজার ৮০৮ শিশু এ কর্মসূচির বাইরে থেকে গেছে।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, গ্রামাঞ্চলে কাভারেজ ৯৯ দশমিক ৫ শতাংশ হলেও সিটি করপোরেশন এলাকায় তা ৯৮ দশমিক ৮ শতাংশ। ৬ থেকে ১১ মাস বয়সি শিশুদের ক্ষেত্রে শহরাঞ্চলের কাভারেজ আরও কম, মাত্র ৯৭ দশমিক ৬ শতাংশ।

এ বিষয়ে আইপিএইচএনের পরিচালক মোহাম্মদ ইউনুস আলী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘ক্যাম্পেইনে বাদ পড়া শিশুদের জন্য কিছু জায়গায় ক্যাপসুল সংরক্ষিত আছে। তবে এখন আর সেগুলো বিতরণের সুযোগ নেই। আগামী ক্যাম্পেইনে তারা ক্যাপসুল পাবে। তবে কোনো শিশু অসুস্থ থাকলে চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশনের ভিত্তিতে ক্যাপসুল দেওয়া যেতে পারে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এবার ৯৯ দশমিক ৪ শতাংশ শিশু কাভারেজের আওতায় এসেছে। অবশিষ্ট ক্যাপসুল ছয় মাস পরের ক্যাম্পেইনের জন্য সংরক্ষণ করা হবে। নির্ধারিত তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করলে এসব ক্যাপসুলের কার্যকারিতায় সমস্যা হবে না।’

জেলাভিত্তিক তথ্যেও বড় ধরনের বৈষম্য দেখা গেছে। সবচেয়ে কম কাভারেজ পাওয়া গেছে কিশোরগঞ্জে, ৯৩ দশমিক ৮ শতাংশ। এ ছাড়া রংপুর সিটি করপোরেশনে ৯৬ দশমিক ১, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ৯৬ দশমিক ২, নড়াইলে ৯৭ দশমিক ৩, সিলেটে ৯৭ দশমিক ৬, রাজবাড়ীতে ৯৭ দশমিক ৭ এবং মৌলভীবাজার ও বান্দরবানে ৯৭ দশমিক ৯ শতাংশ শিশু ক্যাপসুল পেয়েছে।

অন্যদিকে কয়েকটি এলাকায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি কাভারেজ দেখানো হয়েছে। মেহেরপুরে প্রশাসনিক কাভারেজ ১১০ দশমিক ২, গাজীপুর সিটি করপোরেশনে ১০৪ দশমিক ৬ এবং নারায়ণগঞ্জে ১০২ দশমিক ৫ শতাংশ। একদিকে কিছু এলাকায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু বাদ পড়ছে, অন্যদিকে কোথাও লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি শিশু ক্যাপসুল পেয়েছে। এ দুই চিত্র প্রশাসনিক তথ্যব্যবস্থার দুর্বলতারই ইঙ্গিত দেয়।

প্রতিবেদনে শহরাঞ্চলে কম কাভারেজের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দুর্বল নগর মাইক্রোপ্ল্যানিং, পরিবারভিত্তিক সচেতনতার ঘাটতি এবং বস্তি, উচ্চভবন, ভাসমান ও চলমান জনগোষ্ঠীর শিশুদের শনাক্ত করতে না পারার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। জাতীয় কাভারেজ নিশ্চিত করতে পরে প্রায় ৯০ হাজার শিশুকে আলাদাভাবে খুঁজে বের করতে হয়েছে।

জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘ভিটামিন এ ক্যাম্পেইনের আগে বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিশুদের তালিকা প্রস্তুত করা জরুরি। কার্যকর মাইক্রোপ্ল্যানিং ছাড়া ক্যাম্পেইন পরিচালনা করলে বাদ পড়া শিশুর সংখ্যা বাড়বে।

বিশেষ করে শহরের বস্তি ও ভাসমান জনগোষ্ঠীর শিশুদের প্রতি স্বেচ্ছাসেবক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের বাড়তি নজর দিতে হবে। ভিটামিন এ ক্যাপসুল থেকে বঞ্চিত শিশুরা অন্ধত্ব, অপুষ্টি ও বিভিন্ন সংক্রমণের ঝুঁকিতে থাকে।’