Image description
বৃষ্টি-বন্যা অজুহাতে অদৃশ্য সিন্ডিকেটের শাসন

নিত্যপণ্যের বাজারে অদৃশ্য সিন্ডিকেটের শাসন চলছে। বৃষ্টি-বন্যাকে ‘ঢাল’ বানিয়ে বাড়ানো হচ্ছে একের পর এক পণ্যের দাম। অথচ সরবরাহে দৃশ্যমান কোনো সংকট নেই। দেশের যেসব অঞ্চলে বন্যার ছোঁয়াই লাগেনি সেখানকার কৃষিপণ্য নিয়মিত বাজারে আসছে। তারপরও অজুহাত কাজে লাগিয়ে দুই সপ্তাহে কাঁচামরিচ কেজিতে ৩০০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। বিক্রি হচ্ছে ৪০০ টাকা কেজি। ৪০ টাকা কেজিদরের পেঁয়াজ সর্বোচ্চ ৭০ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। ডিমের ডজন বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকায়। পাশাপাশি অধিকাংশ সবজির দামও কেজিতে ১০০ টাকার উপরে বিক্রি হচ্ছে। মাছ-মাংসের দামও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেও ভোজ্যতেলের দাম বাড়াতে পাঁয়তারা শুরু করেছে কোম্পানিগুলো। ইতোমধ্যে তারা সরকারকে চিঠি দিয়েছে। বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করতেই অসাধুচক্র এমন কারসাজির ছক তৈরি করেছে। যার সবচেয়ে নির্মম শিকার নিম্ন আয়ের ও খেটে খাওয়া মানুষ। তবুও এক প্রকার নির্বিকার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

শুক্রবার ছুটির দিন রাজধানীর খুচরা বাজারে প্রতিকেজি কাঁচামরিচ সর্বোচ্চ ৪০০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা গেছে। যা চারদিন আগে বিক্রি হয়েছে ৩০০ টাকা। এক সপ্তাহ আগে ছিল ১৮০-২০০ টাকা। তবে এই মরিচ দুই সপ্তাহ আগে ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। পাশাপাশি দুই সপ্তাহ আগেও দেশি পেঁয়াজ প্রতিকেজি বিক্রি হয়েছে ৪০-৪৫ টাকা। যা শুক্রবার ৫৫ থেকে সর্বোচ্চ ৭০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা গেছে। তিন দিন আগে খুচরা পর্যায়ে বিক্রি হয়েছে ৫০-৬০ টাকা। বাজারে প্রতিকেজি লম্বা বেগুন বিক্রি হচ্ছে ১২০-১৫০ টাকা কেজি। গোল বেগুন সর্বোচ্চ ১৮০ টাকা কেজি। তবে ধুন্দল ও পটলের দাম ১০০ টাকা থেকে কমে ৬০-৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রতিকেজি করলা ১২০-১৪০ টাকা, কচুরমুখি ৮০-১০০ টাকা, বরবটি ১১০-১৩০ টাকা এবং চিচিঙা বিক্রি হচ্ছে ৯০-১০০ টাকা। দুই সপ্তাহ আগেও এসব সবজির দাম কেজিপ্রতি ৩০-৩৫ টাকা কম ছিল।

অন্যদিকে খুচরা বাজারে প্রতি ডজন ফার্মের ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৪৫-১৫০ টাকা। যা এক সপ্তাহ আগেও ১৩৫-১৪০ টাকা ছিল। আর দুই সপ্তাহ আগে বিক্রি হয়েছে ডজনপ্রতি ১২০-১৩০ টাকা। প্রতিকেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৮০-১৯০ টাকা ও সোনালি জাতের মুরগি ৩৩০-৩৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গরুর মাংসের কেজি ৮০০ ও খাসির মাংস কিনতে ক্রেতার ১২০০-১৩০০ টাকা খরচ করতে হচ্ছে।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন যুগান্তরকে বলেন, বন্যা-বৃষ্টিতে দেশের বাজারে পণ্যের দাম বাড়ে এটা স্বাভাবিক। কিন্তু গত কয়েক দিনে যে পরিমাণে দাম বেড়েছে, তা অস্বাভাবিক। বাজারে যেন অদৃশ্য সিন্ডিকেটের শাসন চলছে। যার যা ইচ্ছা তাই করছে। সরকারকে বেকায়দায় ফেলতেই এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। তিনি বলেন, বাজার তদারকিতে সরকারের যেসব ইউং আছে তারাও যেন এক প্রকার নির্বিকার। সব মিলে ভোগান্তিতে পড়ছেন ভোক্তা।

টানা বৃষ্টি ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যার প্রভাব দেখিয়ে রাজধানীর বাজারগুলোতে বাড়ানো হয়েছে মাছের দামও। দুই সপ্তাহ আগেও দুই থেকে আড়াই কেজি ওজনের রুই মাছ প্রতি কেজি ৩৫০-৩৭০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। তবে শুক্রবার একই মাছ কিনতে ক্রেতার গুনতে হয়েছে ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা। সেক্ষেত্রে কেজিপ্রতি বেড়েছে ৫০-৮০ টাকা। বাজারে শুধু রুই মাছই নয়, তেলাপিয়া, পাঙাশ, পাবদা, চাষের চিংড়িসহ প্রায় সব ধরনের মাছের দামই বাড়ানো হয়েছে। বাজারভেদে প্রতিকেজি তেলাপিয়া বিক্রি হচ্ছে ২৪০-২৬০ টাকা এবং পাঙাশ ২২০-২৫০ টাকা। যা দুই সপ্তাহ আগের তুলনায় কেজিপ্রতি ২০-৩০ টাকা বেশি। চাষের চিংড়ির দাম বেড়ে প্রতি কেজি ৯০০ থেকে ১২০০ টাকায় উঠেছে। যা এক সপ্তাহ আগেও ৮০০-১১০০ টাকা ছিল। প্রতিকেজি পাবদা বিক্রি হচ্ছে ৪০০-৪৫০ টাকা। এছাড়া কেজিতে ২০০ টাকা বেড়ে এক কেজি ওজনের ইলিশ কিনতে ক্রেতার গুনতে হচ্ছে ১৬০০-১৮০০ টাকা।

বাজার তদারকি সংস্থা জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারি পরিচালক পর্যায়ের এক কর্মকর্তা বলেন, পণ্যমূল্য সহনীয় রাখতে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। কী কারণে দামের এই উল্লম্ফন তা খতিয়ে দেখে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা হবে।

ভোজ্যতলের দাম ফের বাড়াতে সরকারকে চাপ : এদিকে ভোজ্যতেলের দাম বাড়াতে ব্যবসায়ীরা সরকারকে চাপ দিচ্ছেন। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি, পরিবহণ খরচ বেড়ে যাওয়াসহ নানা কারণ দেখিয়ে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন। লিটার প্রতি সয়াবিন তেলের দাম ১০ টাকা বাড়াতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে গত ১১ জুলাই থেকে প্রস্তাবিত বর্ধিত দাম কার্যকরের দাবি জানিয়েছিল অ্যাসোসিয়েশন। সেদিনই মন্ত্রণালয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে একটি বৈঠক হয়। তবে বৈঠকে অনুমতি মেলেনি। পরে আরও একটি সভা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানানো হয়। এ সময় মন্ত্রণালয় আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে দাম কত হওয়া উচিত তা বিশ্লেষণে কাজ শুরু করেছে।

এর আগে গত ২৯ এপ্রিল বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি চার টাকা বাড়ানোর অনুমতি দিয়েছিল। সে সময় এক লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ১৯৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৯৯ টাকা করা হয়েছিল। পাঁচ লিটারের বোতলের দাম ৯৫৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৯৭৫ টাকা, খোলা সয়াবিন তেলের দাম প্রতি লিটার ১৭৬ টাকা থেকে বেড়ে ১৮০ টাকা এবং খোলা পাম তেলের দাম প্রতি লিটার ১৬৬ টাকায় অপরিবর্তিত রাখা হয়েছিল। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী প্রতি লিটার পাম ওয়েলের দাম লিটারে ১৭ টাকা বাড়াতে চান ব্যবসায়ীরা।