দেশের অর্থনীতির ‘লাইফলাইন’ চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে বছরের পর বছর পড়ে আছে ৮৩ মেট্রিক টন মেয়াদোত্তীর্ণ ও বিপজ্জনক পণ্য। বন্দরের শেড ও ইয়ার্ডে থাকা এ পণ্যের তালিকায় রয়েছে বিস্ফোরক, মারাত্মক দাহ্য অ্যাসিড ও বিষাক্ত রাসায়নিক। ঝুঁকিপূর্ণ এসব দ্রব্য সরিয়ে নিতে কাস্টমসকে বারবার তাগাদা দিচ্ছে বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক)। সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চার বছর চলছে ফাইল চালাচালি। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বিপুল পরিমাণ এ বিপজ্জনক পণ্য কাস্টমস কর্তৃপক্ষ না পারছে ধ্বংস করতে, না পারছে সরিয়ে নিতে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছেন, বাংলাদেশে বিপজ্জনক এ দ্রব্য ধ্বংস বা বিনষ্ট করার মতো সক্ষমতা সরকারি কোনো সাধারণ প্রতিষ্ঠানের নেই। দেশের একটি বেসরকারি কোম্পানির এ সক্ষমতা থাকলেও সরকারের রুলস অব বিজনেস (১৯৯৬) অনুযায়ী, তাদের সঙ্গে চুক্তি করার ক্ষমতা নেই কাস্টমসের। উপায়ান্তর না দেখে সর্বশেষ সামরিক বাহিনীর দ্বারস্থ হয়েছে কাস্টম হাউস।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার অব কাস্টমস মো. রাসেল আহমেদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আর্মড ফোর্স ডিভিশনের (এএফডি) বাংলাদেশ জাতীয় কর্তৃপক্ষ, রাসায়নিক ও অস্ত্র কনভেনশনকে (বিএনএসিডব্লিউসি) সম্প্রতি চিঠি দিয়েছিলাম আমরা। ১৫ জুলাই তাদের (চট্টগ্রাম) আসার কথা ছিল। তবে ওই সময় অতিবৃষ্টি ও বন্যার কারণে আসতে পারেননি। পরবর্তী তারিখ এখনো নির্ধারণ হয়নি।’ হাতে পাওয়া নথি ও কাস্টমসের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দরের ‘পি-শেড’-এ ২৬ লটে মোট ৮৩ মেট্রিক টন অতিঝুঁকিপূর্ণ কেমিক্যাল রাখা আছে। তালিকা অনুযায়ী, এতে ২০১১ থেকে ২০১৪ সালের চালানে আসা ৫৫ হাজার কেজির বেশি অতি দাহ্য মিথানল, ৫৩ হাজার কেজির বেশি থিনার (দ্রাবক), ২৫ হাজার কেজির বেশি সোডিয়াম নাইট্রাইট এবং ২১ হাজার কেজির বেশি তীব্র অ্যাসিড (সালফিউরিক ও নাইট্রিক) রয়েছে। এর বাইরে অন্য লটে আরও ২৮ হাজার কেজি পলি অ্যালুমিনিয়াম ক্লোরাইড, ১২ হাজার ৪২০ কেজি অত্যন্ত দাহ্য তরল আঠা এবং হাজার হাজার কেজি থিনার জমে রয়েছে, যার বহু চালান ২০২২ সাল বা তারও আগে বন্দরে এসেছে। এ ছাড়া সাইপারমেথ্রিন ও ক্লোরপাইরিফসের মতো বিপজ্জনক বিষাক্ত কীটনাশক ও শিল্প রাসায়নিক, যা এক যুগের বেশি সময় বায়ুমণ্ডলে বিষ ছড়াচ্ছে।
বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জমে থাকা দ্রব্যের মধ্যে মিথানল অত্যন্ত দাহ্য, সামান্য স্ফুলিঙ্গে বা উচ্চ তাপে তীব্র বিস্ফোরণ ঘটায়; নাইট্রিক অ্যাসিড (৬৮%) তীব্র ক্ষয়কারী ও তাপে বিষাক্ত এবং বিপজ্জনক গ্যাস তৈরি করে; সোডিয়াম নাইট্রাইট শক্তিশালী জারক, দাহ্য পদার্থের সংস্পর্শে তীব্র আগুন লাগায় এবং থিনার ও ফ্লামেবল তরল, যা অত্যন্ত অস্থির দাহ্য পদার্থ, বাতাসে দ্রুত বাষ্পীভূত হয়ে আগুন ধরায়। ঝুঁকিপূর্ণ এসব রাসায়নিক পণ্য চট্টগ্রাম বন্দরের অপারেশনাল এলাকার কাছে গাদাগাদি করে রাখা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, মিথানল ও নাইট্রিক অ্যাসিডের মতো রাসায়নিক উচ্চ তাপমাত্রায় বিক্রিয়া করে কনটেইনার ফুটো হয়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে। যদি কোনো কারণে একটি কনটেইনারে আগুন বা বিস্ফোরণ ঘটে, তবে তার শৃঙ্খল বিক্রিয়ায় পুরো চট্টগ্রাম বন্দর মুহূর্তে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে পারে।
বিস্ফোরক পরিদপ্তরের উপপ্রধান বিস্ফোরক পরিদর্শক তোফাজ্জল হোসেন বলেন, ‘এগুলো এমন ধরনের বিপজ্জনক ও ঝুঁকিপূর্ণ দ্রব্য, যা মাটির নিচে চাপ দিলে মাটির গুণ নষ্ট হবে, পানিতে ফেলা হলে পানির অণুজীব ধ্বংস হয়ে যাবে এবং পরিবেশের ক্ষতি করবে।’ তিনি বলেন, ‘যত দিন না এসব বিপজ্জনক দ্রব্য ধ্বংস করা যাচ্ছে, কাস্টমসের উচিত হবে বন্দরের ঝুঁকি বিবেচনায় দ্রুত শেড থেকে সেগুলো নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে রাখা।’
কাস্টমস, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ এবং সরকারি ক্রয় বিধিমালার (পিপিআর) একাধিক গোপন ও দাপ্তরিক নথি পরীক্ষা কওে দেখা গেছে, বহু আগেই এসব কেমিক্যালকে ‘বিপজ্জনক ও দাহ্য’ হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। সরকারি পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলসের (পিপিআর) ৭৬(১) বিধি অনুযায়ী, এ ধরনের অতি জরুরি ও বিপজ্জনক কাজ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ‘সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি’ (ডিপিএম) ব্যবহারের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। এ বিধির আওতায় দরপত্রের জটিলতা এড়িয়ে সরাসরি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান লাফার্জ হোলসিমকে কেমিক্যাল ধ্বংসের দায়িত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল ২০২২ সালের ২৬ জুলাই (প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্যসচিবের বৈঠকের পর)। কিন্তু চুক্তি এবং আর্থিক ক্ষমতা না থাকায় বিপজ্জনক এ কেমিক্যাল ও দাহ্য পদার্থ সরাতে পারেনি কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, ‘বিপজ্জনক পণ্য বন্দর থেকে সরিয়ে নিতে আমরা বারবার কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিচ্ছি। বন্দর ও কাস্টমসের মধ্যে এ নিয়ে বৈঠকও হয়েছে। কাস্টমস কর্তৃপক্ষও চেষ্টা করছে এ ধরনের পণ্য বন্দরের বাইরে নিয়ে যেতে। বিষয়টি উভয় দিক থেকেই গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।’