জুলাই গণ অভ্যুত্থানের উত্তাল সময়ে ২০২৪ সালের এই দিনে (১ আগস্ট) ছাত্র-জনতার আন্দোলন আরও বেগবান হয়। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নিহতদের স্মরণে ‘শোকের মাস’ ঘোষণা করে। কিন্তু এ ঘোষণা প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলন দমনে ফ্যাসিবাদী সরকারের কৌশল ব্যর্থ করে দেয় ছাত্র-জনতা। পূর্বঘোষিত ‘রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোজ’ কর্মসূচি থেকে স্বৈরাচার সরকারের পতন না হওয়া পর্যন্ত টানা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা। তাঁরা ২ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণমিছিলের ডাক দেন এবং সর্বস্তরের নাগরিককে এতে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান। এ ঘোষণায় লুকিয়ে ছিল জুলাই গণ অভ্যুত্থান আরও তীব্র ও বিস্তৃত করার মূল বার্তা। সে কারণে ১ আগস্ট আন্দোলনকারীদের কাছে পরিচিতি পায় ‘৩২ জুলাই’ নামে।
আগস্টের প্রথম দিনে ঢাকাসহ দেশব্যাপী শহীদদের স্মরণে বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, সংস্কৃতিকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এসব কর্মসূচিতে অংশ নেন। একই সঙ্গে প্রতিটি সমাবেশ থেকে গণ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ঘটানোর শপথ নেন তাঁরা। এদিন সমাজমাধ্যমে ‘হারুনের ভাতের হোটেল’ নামে পরিচিতি পাওয়া রাজধানীর ডিবি কার্যালয় থেকে নিরাপত্তার অজুহাতে আটক বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছয় সমন্বয়ককে ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে শাহবাগের আন্দোলনের মঞ্চ থেকে জানানো হয়, ডাকসুর সাবেক সমাজসেবা সম্পাদক আক্তার হোসেন, সমন্বয়ক আরিফ সোহেলসহ অসংখ্য ছাত্র-জনতাকে কারাগার ও রিমান্ডে রাখা হয়েছে।
দাবি জানানো হয়, সবাইকে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে হবে। এদিকে সরকার হঠাৎ এক নির্বাহী আদেশে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দেয়। এতে আন্দোলনকারীরা আরও ক্ষিপ্ত হয়। আন্দোলনের মঞ্চ থেকে তাঁরা জানান, ছাত্র-জনতার দাবিকে গুরুত্ব না দিয়ে সরকার দমনপীড়নের পথেই হাঁটছে। এদিন আটক শিক্ষার্থীদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মুক্তির দাবি জানায় বিক্ষুব্ধ নাগরিক সমাজ। মিন্টো রোডে ডিবি কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ থেকে পরদিন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে ‘দ্রোহযাত্রা’ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।
এদিন ‘রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোজ’ কর্মসূচিতে বিভিন্ন স্থানে বাধা দেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বৃষ্টি উপেক্ষা করেও বিভিন্ন স্থানে কর্মসূচিতে জড়ো হয় হাজারো ছাত্র-জনতা। কোথাও কোথাও তাদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষ হয়। নারায়ণগঞ্জে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ওপর লাঠিচার্জ করে পুলিশ। এতে নারায়ণগঞ্জে নিহত ও আহতদের স্মরণে শিক্ষার্থীদের ‘মোমশিখা প্রজ্বালন’ কর্মসূচিও বাধাগ্রস্ত হয়।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ছাত্র-শিক্ষক সংহতি সমাবেশ’ও পুলিশের বাধায় পণ্ড হয়ে যায়। এ ছাড়া গাইবান্ধা ও কুমিল্লায় পুলিশ-বিজিবির বাধায় কর্মসূচি ব্যাহত হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে মুখে লাল কাপড় বেঁধে মৌনমিছিল করেন ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক’-এর শিক্ষকরা। এতে শিক্ষার্থীরাও অংশ নেন। কর্মসূচি শেষে সাদাপোশাকে পুলিশ কয়েক শিক্ষার্থীকে ধরে নেওয়ার চেষ্টা করলে শিক্ষকরা বাধা দেন এবং তাঁদের নিরাপদে চলে যেতে সহায়তা করেন।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আবু সাঈদসহ সব হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করেন। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় এবং খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা মৌনমিছিল করেন। কুড়িগ্রামে মুখে লাল কাপড় বেঁধে বিক্ষোভ করেন বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। যশোরে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন সংস্কৃতিকর্মী ও আইনজীবীরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা সমাবেশ করেন।
লোকপ্রশাসন ও অর্থনীতি বিভাগ এবং নিপীড়নবিরোধী শিক্ষকসমাজ পৃথক কর্মসূচি পালন করে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবাদী গানের মিছিল ও সমাবেশ করেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। এতে ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও যোগ দেন। জাবির অধ্যাপক রায়হান রাইন বলেন, ‘ভয়কে জয় করে ছাত্র-জনতা জেগে উঠেছে এবং এ গণজাগরণই জুলুমবাজ সরকারের পতন ঘটাবে।’
এদিন পরদিনের (২ আগস্ট) কর্মসূচিও ঘোষণা করা হয়। সমন্বয়ক আবদুল কাদেরের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ২ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণমিছিলের ডাক দেওয়া হয়। শ্রমিক, পেশাজীবী, সংস্কৃতিকর্মী, গণমাধ্যমকর্মী, মানবাধিকারকর্মী, বুদ্ধিজীবী, আলেমসহ সর্বস্তরের নাগরিককে এতে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। পাশাপাশি জুমার নামাজের পর দোয়া, শহীদদের কবর জিয়ারত এবং মসজিদ, মন্দির, গির্জাসহ বিভিন্ন উপাসনালয়ে প্রার্থনার কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। কার্যত ১ আগস্ট বা ‘৩২ জুলাই’ এ কর্মসূচির ঘোষণা হয়ে ওঠে জুলাই গণ অভ্যুত্থান আরও তীব্র ও বিস্তৃত করার মূল বার্তা।