Image description

কিছুতেই দমানো যাচ্ছে না কিশোর গ্যাং কালচার। যতই দিন যাচ্ছে ততই ভয়ংকর থেকে ভয়ংকরতম হয়ে উঠছে গ্যাংস্টাররা। প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন অদ্ভুত নামের নিত্যনতুন গ্যাং। অলিগলিতে অস্ত্রের মহড়া, মাদক কারবার, চুরি ছিনতাই, চাঁদাবাজি, নৃশংস হত্যাকাণ্ডসহ সব ধরনের অপরাধেই মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে উঠেছে  কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গেছে যে অনেক গ্যাং নিজেদের শক্তি বাড়াতে বিদেশি অত্যাধুনিক অবৈধ অস্ত্র কেনা শুরু করেছে। সেই সঙ্গে আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসী থেকে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় আরও বেপরোয়া এসব গ্যাংয়ের সদস্যরা। বর্তমানে আধিপত্য বিস্তারের অপ্রতিযোগী হাতিয়ারও হয়ে উঠেছে তারা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিবারের নজরদারির অভাব, আর্থিক অনটন, কর্মের সংকট, মাদকাসক্তি, প্রযুক্তির অপব্যবহার ও হিরোইজমের মাধ্যমে নিজেকে জাহির করাসহ বিভিন্ন কারণে গ্যাংয়ে নাম লেখাচ্ছে কিশোররা।

ডিএমপি সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, ডিএমপির ৮ বিভাগে ১৫৯টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। যার সদস্য সংখ্য ৩ হাজারের বেশি। গত বছর গ্যাংয়ের সংখ্যা ছিল ১১৮। অর্থাৎ এক বছরেই ৩৫ শতাংশ বেড়েছে কিশোর গ্যাংয়ের সংখ্যা। বর্তমানে সক্রিয় গ্যাংগুলোর মধ্যে বিভাগ অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি তেজগাঁও বিভাগে ৪০টি। এরপরই রয়েছে মিরপুরে ৩৫টি। অন্য বিভাগগুলোর মধ্যে রমনায় ১২টি, লালবাগে ১০টি, ওয়ারীতে ২০টি, মতিঝিলে ১৬টি, গুলশানে ১১টি ও উত্তরায় ১৫টি গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। থানার মধ্যে সবার ওপরে রয়েছে মোহাম্মদপুর।

অপরাধের স্বর্গ খ্যাত এ এলাকায় দুর্ধর্ষ কিশোর গ্যাং রয়েছে ২৭টি। এরপরই রয়েছে অপরাধের অভয়ারণ্যখ্যাত পল্লবী এলাকা। এখানে ১৬টি কিশোর গ্যাং রয়েছে। এ ছাড়াও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কিশোর গ্যাং রয়েছে, যাত্রাবাড়ীতে ৮টি, খিলগাঁওয়ে ৭টি, হাজারীবাগে ৬টি, চকবাজারে ৪টি, কদমতলীতে ৪টি, আদাবরে ৬টি, দারুসসালামে ৬টি, শাহআলীতে ৪টি, বনানীতে ৬টি, উত্তরা পূর্ব থানা এলাকায় ৪টি, দক্ষিণখানে ৫টি, ধানমন্ডিতে ২টি, ডেমরায় ৩টি, মুগদায় ৩টি, মিরপুর মডেল থানা এলাকায় রয়েছে ৩টি।

গ্যাংয়ের সাম্রাজ্য মোহাম্মদপুর : প্রকাশ্যে ছিনতাই, আধিপত্যের লড়াইয়ে হানাহানি, মাদক কারবার, অস্ত্রের মহড়া, নৃশংস হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু যেকোনো অপরাধেই সবসময় আলোচনায় আসে মোহাম্মদপুর। এসব কাজে তৎপর রয়েছে ২৭টি গ্যাং। গ্যাংগুলো হলো, পাটালী গ্রুপ, লেভেল হাই গ্রুপ, আনোয়ার গ্রুপ, ফরহাদ গ্রুপ, আর্মি আলমগীর ও নবী গ্রুপ, ডাইল্লা গ্রুপ, এলেক্স গ্রুপ, আকবর গ্রুপ, গাংচিল গ্রুপ, ল ঠেলা গ্রুপ, আশরাফ গ্রুপ, স্টার বন্ড, ভাইব্বা ল কিং, চেতালেই ভেজাল, টক্কর ল গ্রুপ, ঘুটা দে, লারা দে, মিরাজ গ্রুপ, সুমন গ্রুপ, মাহি গ্রুপ, সাব্বির গ্রুপ, পিচ্চি হেলাল গ্রুপ, চার্লি গ্রুপ ও বেলচা মনির গ্রুপ অন্যতম।

এসব গ্রুপের সদস্য সংখ্যা ৪৮১ জন। যারা মোহাম্মদপুর এলাকাতে অপরাধের সাম্রাজ্যেও হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। বিভিন্ন অনুমোদনহীন হাউজিং এলাকার জমি দখল, চাঁদাবাজি, প্রকাশ্য ছিনতাই, গোলাগুলি, চুরি ও ডাকাতির মতো এমন কোনো অপরাধ নেই যা এসব গ্যাং করছে না। মাঝেমধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের অনেককে গ্রেপ্তার করলেও জামিনে বেরিয়ে আবারও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। মোহাম্মদপুর থানা সূত্র জানিয়েছে, নিম্ন আয়ের উদ্বাস্তু মানুষের সংখ্যা বেশি হওয়ায় সহজেই কিশোররা বিভিন্ন গ্যাংয়ে নাম লেখাচ্ছে। এ কারণে মোহাম্মদপুরে গ্যাংয়ের ভয়াবহতা ঠেকানো যাচ্ছে না। এই কিশোররাই প্রতিনিয়ত প্রকাশ্য ছিনতাই করছে।

অপ্রতিরোধ্য পল্লবীর ১৬ গ্যাং : ডিএমপির তালিকা অনুযায়ী, পল্লবীতে সক্রিয় গ্যাংগুলো হলো- আশিক গ্রুপ, রাজু গ্রুপ, রকি গ্রুপ, পিন্টু-কাল্লু গ্রুপ, রোমান্টিক গ্রুপ, মুসা হারুনের ভাই ভাই গ্রুপ, মুরাদ গ্রুপ, আরমান গ্রুপ, জুম্মান গ্রুপ, বাহাদুর গ্রুপ, বাহবালী গ্রুপ, ৬.৯ ইয়াসিন গ্রুপ, সোহেল গ্রুপ, আসাদ কাল্লু গ্রুপ ও দীপ গ্রুপ। এসব গ্রুপের সবচেয়ে বেশি ২৫ জন সদস্য রয়েছে আশিক গ্রুপে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বাস্তবে আশিকের গ্যাংয়ে সদস্য সংখ্যা শতাধিক। শীর্ষ সন্ত্রাসী ফোর স্টার গ্রুপের মধ্যে অন্যতম মামুন গ্রুপের সঙ্গে পল্লবীর এসব গ্যাংয়ের বেশ কয়েকটির গভীর যোগাযোগ রয়েছে। ৬.৯ ইয়াসিন গ্রুপে রয়েছে পেশাদার অপরাধীদের ২০ জন সদস্য। ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতে এসব গ্রুপকে ব্যবহার করছে রাজনৈতিক নেতারাও।

উত্তরায় নতুন করে মাথা চাড়া : ২০১৭ সালের ৬ জানুয়ারি উত্তরার কিশোর গ্যাং ডিসকো বয়েজ ও নাইন স্টার গ্রুপের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে পিটিয়ে ও কুপিয়ে নির্মমভাবে খুন হয় স্কুলছাত্র আদনান কবির। মূলত এরপরই দেশে কিশোর গ্যাংয়ের ভয়াবহতার দৃশ্য সবার নজরে আসে। চাঞ্চল্যকর এ ঘটনার পর নড়েচড়ে বসেছিল প্রশাসন। কিন্তু এরপর উত্তরার গ্যাং কালচার দমিয়ে রাখা যায়নি। বর্তমানে উত্তরা বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় ১৫টি গ্রুপ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে।

যাত্রাবাড়ীতেও বেড়েছে দাপট : রাজধানীর অন্যতম প্রবেশদ্বার যাত্রাবাড়ী এলাকায় পরিবহন চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে মাদক কারবারে অনেক আগে থেকেই কিশোর গ্যাংদের ব্যবহার করা হচ্ছে। অতীতে ভোল্টেজ গ্রুপ, দে-দৌড় গ্রুপ, হ্যাঁচকা টান গ্রুপের মতো বিভিন্ন গ্রুপের উত্থান দেখা গেছে। বর্তমানে কিশোর গ্যাংদের দাপট আরও বেড়েছে। যাত্রাবাড়ীতে সক্রিয় রয়েছে- পলাশ গ্রুপের ১২ সদস্য, ফাহিম গ্রুপের ২১ সদস্য, লিটন গ্রুপের ২৫ সদস্য, ওয়ালিদ গ্রুপের ১৫ সদস্য, আহনাফ গ্রুপের ১২ সদস্য, জীবন গ্রুপের ২২ সদস্য, শুভ-জাহিদ গ্রুপের ১৮ সদস্য ও সাকিব গ্রুপের ১৬ সদস্য। তারা নিয়মিত চাপাতি, রামদা ও সামুরাই নিয়ে নিয়মিত মহড়া দিচ্ছে বলে জানা গেছে।

কারেকশনাল পানিশমেন্ট প্রয়োজন : অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, কিশোর গ্যাং দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যে ধরনের দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল সেটি কখনোই নেওয়া হয়নি। বিশেষ করে কিশোর গ্যাংদের পৃষ্ঠপোষক ও যে বড় ভাইদের মাধ্যমে গ্যাং কালচারে জড়াচ্ছে তাদের কখনো আইনের আওতায় আনা হয় না। কিশোর বয়সিদের আইনের আওতায় আনার পর সংশোধনাগারে পাঠানো হয়ে থাকে।

প্রিভেনশন পুলিশিংয়ে জোর দিতে হবে : সাবেক আইজিপি মুহাম্মদ নুরুল হুদা বলেন, বিশ্বের কোথাও অপরাধ কখনো কমে না। তবে কিশোররা কোন মোটিভেশনে অপরাধের পথে পা বাড়াচ্ছে, কোন এলাকাগুলোতে কী কারণে কিশোর গ্যাং গড়ে উঠছে সেটি আগে চিহ্নিত করতে হবে। এর সঙ্গে পুরোনো মামলা বিশ্লেষণ করে প্রিভেনশন পুলিশিংয়ের মাধ্যমে সমাধান খুঁজতে হবে। কারণ কিশোরদের বিরুদ্ধে পুলিশ অ্যাকশনে গেলে বদনাম হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

ডিএমপি সদর দপ্তরের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) মোহাম্মদ ওসমান গণি বলেন, কিশোর গ্যাং কোনো ঘটনা ঘটালে তাৎক্ষণিকভাবে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। নিয়মিত ব্লক রেইড পরিচালনা করা হচ্ছে। এর বাইরেও তালিকা ধরে ধরে কিশোর গ্যাং সদস্যদের বাবা-মা ও স্বজনদের বোঝানো হয়- যেন তার সন্তান অন্ধকার পথে পা না বাড়ায়।