Image description
১০ মাস কাঁচা পাট রপ্তানি প্রায় বন্ধ

১০ মাস পরও কাঁচা পাট রপ্তানি পুরোপুরি চালু না হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন লক্ষাধিক জুট প্রেস শ্রমিক, ব্যবসায়ীসহ এই শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা। বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা না থাকায় কর্মহীন শ্রমিক পরিবারগুলো মানবেতর জীবন যাপন করছেন।

একইভাবে ব্যবসায়ীদের ব্যাংকঋণ বাড়ছে এবং গোডাউনে জমে থাকা পাট নষ্ট হচ্ছে। আবার রপ্তানি বন্ধ থাকলে চলতি মৌসুমে কৃষকদেরও পাটের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বরে সরকার কাঁচা পাট রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দেয়। সেই থেকে গত ১০ মাসে খুলনার দৌলতপুর এলাকার বিভিন্ন গুদামে বিদেশে রপ্তানির অপেক্ষায় পড়ে রয়েছে হাজার হাজার মণ কাঁচা পাট।

দীর্ঘদিন সংরক্ষণে থাকায় অনেক পাটের গুণগত মান নষ্ট হচ্ছে। অনেক পাটে এরই মধ্যে পচন ধরেছে, কমেছে বাজারমূল্যও। যে পাটের এক বেল পাঁচ হাজার ৫০০ টাকায় কেনা হয়েছিল, বর্তমানে তার দাম নেমে এসেছে চার হাজার টাকার নিচে। রপ্তানি বন্ধ থাকায় বিদেশি ক্রেতাও হারাচ্ছেন রপ্তানিকারকরা।
 
অন্যদিকে ব্যাংকঋণের সুদ, গুদামভাড়া ও সংরক্ষণ ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।

বাংলাদেশ জুট অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আট লাখ ৬২ হাজার ৯৬৫ বেল পাট রপ্তানি করে এক হাজার ২৪১ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়েছিল। অথচ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রপ্তানি হয়েছে মাত্র ৮৩ হাজার ৯৩১ বেল, আর বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়েছে মাত্র ১৪২ কোটি টাকা।

গাজী জুট ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী গাজী শরীফুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আলোচনা ছাড়াই সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার পাটকে শর্তযুক্ত রপ্তানি পণ্যের তালিকাভুক্ত করে। এর ফলে কাঁচা পাট রপ্তানি কার্যত বন্ধ রয়েছে।

৪০ থেকে ৪৫টি দেশে পাট রপ্তানি করা হতো। সেই সংখ্যা কমে এখন মাত্র ১০ থেকে ১২টিতে দাঁড়িয়েছে। এই অবস্থা অব্যাহত থাকলে পাট থেকে বিদেশি আমদানিকারকরা মুখ ফিরিয়ে নেবেন। ব্যাংকঋণ, গোডাউনভাড়া এবং অব্যাহত লোকসানে আমাদের পথে বসতে হবে।’

জেএইচ জুট ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী মো. জামাল হোসেন বলেন, ‘একটি সিদ্ধান্তে লাখ লাখ মানুষ পথে বসতে চলেছে। দেশের বেসরকারি মিলগুলোও বন্ধ। তাই কাঁচা পাট রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত থাকলে কৃষক পাটের দাম পাবে না। শ্রমিকরা কাজ পাবেন না। এতে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বড় সেক্টরটি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমরা দ্রুত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি করছি।’

এই পরিস্থিতির বড় ধাক্কা লেগেছে শ্রমিকদের জীবনেও। কাঁচাপাট রপ্তানি খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট খুলনা অঞ্চলের ১০ হাজারের বেশি শ্রমিকসহ সারা দেশে লক্ষাধিক শ্রমিক বর্তমানে কর্মহীন।

দৌলতপুর জুট প্রেস অ্যান্ড বেইলিং ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম মিঠু বলেন, ‘বিগত অন্তর্বর্তী সরকার পাট রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দেয়। এখন খুলনা, ফরিদপুর, নারায়ণগঞ্জ, উত্তরবঙ্গসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ৪০টি জুট প্রেসে লক্ষাধিক শ্রমিকের কাজ নেই। জন্মের পর থেকে এই কাজ করে আসছি। চলতি বছর ১৮ মে মন্ত্রণালয়ও পাট রপ্তানি বন্ধ অব্যাহত রেখে প্রজ্ঞাপন দেয়। আমরা আন্দোলন শুরু করি। সিটি প্রশাসকের আশ্বাসে আন্দোলন স্থগিত করি। কিন্তু এখনো নতুন সিদ্ধান্ত হয়নি। শুধু শ্রমিকরাই নয়, পাট মৌসুমে কৃষকরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পাটের দাম কমে দেড় হাজার টাকায় নেমে এসেছে। রপ্তানি বন্ধ হলে পাট খাত ধ্বংস হয়ে যাবে।’

বাংলাদেশ জুট অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক মো. আলমগীর খান বলেন, ‘পাট অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী দেশে বছরে পাট উৎপাদন গড়ে ৮০ লাখ বেল। এর মধ্যে দেশীয় কলকারখানার চাহিদা প্রায় ৬৫ লাখ বেল। ফলে অন্তত ১৫ লাখ বেল পাট উদ্বৃত্ত থাকে। তাহলে রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার যৌক্তিকতা কোথায়? আমরা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে স্থানীয় সংসদ সদস্য, হুইপ ও পাটমন্ত্রীর সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করেও কোনো সমাধান পাইনি।’

তিনি বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কৃষক ও শ্রমিকবান্ধব। আশা করছি, তিনি তিন লাখ শ্রমিক, কৃষক ও ব্যবসায়ীকে রক্ষায় দ্রুত কাঁচা পাট রপ্তানির বিষয়ে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত দেবেন।