সাইবার পরিসরে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও শাস্তির মাত্রা আরো কঠোর করতে পাস হওয়ার মাত্র তিন মাসের মাথায় আবারও ‘সাইবার সুরক্ষা আইন’ সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত নতুন সংশোধনীতে ‘গুজব’, ‘অপতথ্য’, ‘মানহানি’ ও ‘হেয় প্রতিপন্ন’ সংক্রান্ত অপরাধের পরিধি ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করার পাশাপাশি সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের মতো কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হচ্ছে।
ব্যক্তিগত আক্রোশ, ব্ল্যাকমেইলিং কিংবা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে চরিত্র হননের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে এক শ্রেণির অপরাধী। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার করে ফেক অডিও-ভিডিও তৈরি এবং বিকৃত ছবি ছড়ানোর মতো অপরাধ যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরো বেশি মারাত্মক রূপ নিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইনের কার্যকর প্রয়োগের সীমাবদ্ধতা, সাইবার অপরাধ দমনে প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাব এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ডিজিটাল শিক্ষার ঘাটতির কারণে দেশের ভার্চুয়াল জগতে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে।
খসড়া সংশোধনীতে যা থাকছে : স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সংশোধিত আইনের বিলটি এরই মধ্যে চূড়ান্তকরণের কাজ চলছে এবং জাতীয় সংসদের আগামী অধিবেশনেই এটি উত্থাপিত হতে পারে। সরকারের লক্ষ্য ভার্চুয়াল জগতে ক্রমবর্ধমান প্রোপাগান্ডা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার রোধে আইনি পরিকাঠামোকে আরো শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো।
গুজব ও অপতথ্য ছড়ানোর নতুন অপরাধ
খসড়া সংশোধনী অনুযায়ী, সাইবার পরিসরে যেকোনো ধরনের ‘গুজব’ বা ‘অপতথ্য’ প্রকাশ, সম্প্রচার কিংবা প্রচার করাকে সরাসরি নতুন অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।
আইনের খসড়ায় সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে : গুজব এমন যেকোনো অসমর্থিত বা অযাচাইকৃত তথ্য, সংবাদ বা দাবি, যা জনমনে বিভ্রান্তি, আতঙ্ক, অনাকাঙ্ক্ষিত উত্তেজনা কিংবা সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে বা এ ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে।
অপতথ্যের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, এমন সব মিথ্যা, ইচ্ছাকৃত বিকৃত বা বিভ্রান্তিকর তথ্য, যা কোনো বিশেষ ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা বা ক্ষতিগ্রস্ত করার সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে প্রচার করা হয়।
এআই ও ডিপফেক প্রযুক্তির অপব্যবহার : আইনের ২৫ নম্বর ধারায় মানহানি ও হেয় প্রতিপন্ন সংক্রান্ত অপরাধের পরিধি আরো বিস্তৃত ও সুস্পষ্ট করা হচ্ছে। প্রস্তাবিত খসড়া অনুযায়ী, অডিও, ভিডিও, স্থিরচিত্র, গ্রাফিকস কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি কোনো কনটেন্টের মাধ্যমে কাউকে হেয় প্রতিপন্ন বা মানহানি করা হলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
নারী ও শিশুদের সুরক্ষায় কঠোর বিধান : সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নারী ও শিশুদের সবচেয়ে বেশি টার্গেট করা হচ্ছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। প্রস্তাবিত খসড়ায় বলা হয়েছে, নারী কিংবা ১৮ বছরের কম বয়সী কোনো শিশুকে লক্ষ্য করে যদি এআই বা কোনো প্রযুক্তির মাধ্যমে আপত্তিকর বা মানহানিকর কনটেন্ট তৈরি ও প্রচার করা হয়, তাহলে অপরাধীর সাজা হবে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড। এ ক্ষেত্রে মানহানির সার্বিক ব্যাখ্যা নির্ধারণে দণ্ডবিধির ৪৯৯ ধারার মানদণ্ড প্রয়োগের উল্লেখ রাখা হয়েছে।
আইন বাস্তবায়নে এনটিএমসি ও অন্যান্য সংস্থা : সংশোধিত আইনটি বাস্তবায়ন ও মনিটরিং প্রক্রিয়া দ্রুততর করতে শুধু প্রথাগত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর ওপর নির্ভর না করে অন্যান্য সরকারি বিভাগকেও যুক্ত করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। সূত্র জানায়, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারকে (এনটিএমসি) সার্বিক নজরদারি ও কারিগরি সহায়তার প্রধান দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে।
সরকারের সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের দাবি, বর্তমানে ডিপফেক অডিও-ভিডিও এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে মুহূর্তের মধ্যেই এমনভাবে ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া হয় যে সাধারণ তদন্ত প্রক্রিয়ায় তা ঠেকানো সম্ভব হয় না। ফলে কারিগরিভাবে দক্ষ সংস্থাগুলোকে যুক্ত না করলে আইনের কঠোর সাজাও প্রয়োগ করা কঠিন হয়ে পড়বে।
সোশ্যাল মিডিয়া যখন অপপ্রচারের ট্রাম্প কার্ড : গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের উপাত্ত পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এখন সুস্থ জনমত গঠনের চেয়ে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও ব্যক্তিগত শত্রুতা মেটানোর প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী ও প্রোপাগান্ডা সেল রাজনীতিতে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে বা প্রতিপক্ষকে সামাজিকভাবে নিশ্চিহ্ন করতে সোশ্যাল মিডিয়াকে একটি ‘ট্রাম্প কার্ড’ হিসেবে ব্যবহার করছে।
কোনো রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী বা বিশিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো তথ্য যাচাই-বাছাই ছাড়াই চমকপ্রদ ও নেতিবাচক শিরোনামে প্রচার করে দেওয়া হয়। একটি পক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে এর রাজনৈতিক বা আর্থিক ফায়দা লুটে নেয়, কিন্তু অন্য পক্ষ বা ভুক্তভোগী ব্যক্তি যে অপূরণীয় সামাজিক ও মানসিক ক্ষতির মুখে পড়েন তা কোনোভাবেই আর পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হয় না। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে এভাবে সত্যকে মিথ্যা এবং সাদাকে কালো করার বিরামহীন প্রোপাগান্ডা চালানো হচ্ছে।
৩০ শতাংশ বেড়েছে অপতথ্য : তথ্য যাচাইকারী গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘রিউমার স্ক্যানার’-এর ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে দেশে অপতথ্য বিস্তারের এক মারাত্মক চিত্র। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের সমাজ, অর্থনীতি ও রাজনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এমন চার হাজার ১৯৫টি ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্য শনাক্ত করা হয়েছে। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল দুই হাজার ৯১৯। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে দেশে অপতথ্যের বিস্তার বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণ মানুষের মধ্যে ‘মিডিয়া লিটারেসি’ ও ‘ডিজিটাল লিটারেসি’র চরম ঘাটতি রয়েছে। বেশির ভাগ মানুষই কোনো আবেগপ্রবণ বা চটকদার সংবাদ দেখলে সেটির মূল উৎস যাচাই না করেই নিজের টাইমলাইনে শেয়ার দেন। আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যালগরিদম ডিজাইন এমনভাবে করা, যা বেশি শেয়ার ও এনগেজমেন্ট পাওয়া কনটেন্টগুলোকে দ্রুত বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়। ফলে একটি মিথ্যা তথ্য মুহূর্তের মধ্যে কোটি কোটি মানুষের কাছে ছড়িয়ে পড়ে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অস্থিতিশীলতা তৈরি করে।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন : সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশনের সভাপতি কাজী মুস্তাফিজ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশে আইনের অভাব নেই, অভাব শুধু কার্যকারিতার। মনে রাখা প্রয়োজন, আইন তৈরির মূল উদ্দেশ্য মানুষকে শুধুই শাস্তি দেওয়া নয়; বরং কোনটা অপরাধ তা জানিয়ে এর থেকে দূরে রাখা। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশের বেশির ভাগ প্রচলিত আইন সম্পর্কে সাধারণ মানুষ কিছুই জানে না। আর এই অজ্ঞতার কারণেই অনেকে না বুঝে অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। তাই সরকারের উচিত বিভিন্ন আইন ও ডিজিটাল লিটারেসি নিয়ে তৃণমূল পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা।’
তিনি আরো যোগ করেন, “অনলাইন জুয়া সংক্রান্ত অপরাধকে সাইবার সুরক্ষা আইন থেকে আলাদা করা মোটেও ঠিক হয়নি। অনলাইন জুয়া সংক্রান্ত অপরাধকে ‘সাইবার সুরক্ষা আইন’ থেকে আলাদা করা একেবারেই সমীচীন হয়নি। বর্তমানে সাইবারজগতে অনলাইন জুয়ার ভয়াবহতা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। অতীতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী যখন বিদেশি প্ল্যাটফর্মগুলোর অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে যেত, তখন আইনি সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হতো। পরবর্তীকালে সরকার এটিকে আইনের আওতায় আনে। কিন্তু বর্তমান সরকার আবারও জুয়ার অপরাধকে সাইবার সুরক্ষা আইন থেকে পৃথক করেছে, যা অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের বাধা তৈরি করবে। সাইবারভিত্তিক প্রতিটি অপরাধ সাইবার সুরক্ষা আইনেই থাকা উচিত।”
এআই প্রযুক্তির অপব্যবহারের নতুন চ্যালেঞ্জ : সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রযুক্তির বিবর্তনে সাইবার অপরাধের ধরনও বদলে যাচ্ছে আশঙ্কাজনকভাবে। আগে যেখানে সাইবারজগতে ব্ল্যাকমেইলিংয়ের মতো ঘটনা প্রাধান্য পেত, সেখানে বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর ও আপত্তিকর কনটেন্ট তৈরির প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এমনকি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বসহ বিভিন্ন পেশার মানুষদের এআই প্রযুক্তির সাহায্যে হেয় প্রতিপন্ন করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা ভুক্তভোগীদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনকে চরমভাবে বিপর্যস্ত করে তুলছে।’
সরকারের নীতিগত অবস্থান : সাইবার পরিসরে ক্রমবর্ধমান নৈরাজ্য ও অপপ্রচার বন্ধে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন সরকারের দায়িত্বশীল প্রতিনিধিরা।
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আমরা এরই মধ্যে একটি বিশেষ উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করেছি, যেখানে পাঁচটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা কাজ করছেন। প্রযুক্তির অপব্যবহার করে যাতে কারো ব্যক্তিত্ব বা চরিত্র হনন করা না হয়, সেটি নিশ্চিত করা আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার। বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশে সাইবার অপরাধ দমনে কী ধরনের আইনি কাঠামো ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা রয়েছে, আমরা সেগুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা করেছি। বর্তমান প্রস্তাবিত আইনে সাইবার পরিসরে যেকোনো গুজব ও অপতথ্য প্রকাশ বা প্রচার কঠোর অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।’