ভুয়া দাবি সম্বলিত ভিডিওকে সত্য ধরে ‘‘মতিঝিল বিএনপির সভাপতিকে লাঞ্ছিত করা ও ইউনূসের দৈত্যরা’’ শিরোনামে কলাম লিখেছেন ২০১৭ সালে একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক স্বদেশ রায়। নিজের সম্পাদিত পত্রিকা সারাক্ষণে প্রকাশিত একটি কলামে তিনি সেই দাবির উল্লেখ করেছেন। লেখাটির ফিচার ইমেজ হিসেবে ভিডিও’র স্ক্রিনশট সংযুক্ত করা হয়েছে।
গত ২৪ জুলাই ২০২৬ প্রকাশিত কলামে স্বদেশ রায় লিখেছেন, “সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মতিঝিল বিএনপির সভাপতিকে লাঞ্ছিত করার একটা ছবি ভেসে বেড়াচ্ছে। ভদ্রলোক দেশের একজন সিনিয়র সিটিজেন। সত্তরোর্ধ্ব বা সত্তরের কাছাকাছি তাঁর বয়স হবেই।’’
তিনি লিখেছেন, ‘‘রাস্তার মাঝখানে এ ধরনের ভদ্রলোকদের এভাবে লাঞ্ছিত হবার ভিডিও গত দুই বছরে দেখতে দেখতে এদেশের, বিএনপির এই মতিঝিল সভাপতির বয়সের মুক্তিযোদ্ধাকে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর বাড়ির সামনে দেশের মানুষ এভাবে লাঞ্ছিত হতে দেখেছে, ঢাকার জিরো পয়েন্টেও এভাবেই এই বয়সের মুক্তিযোদ্ধাকে লাঞ্ছিত হতে দেখেছে।
গত ২৫ জুলাই ফেসবুকে বিভিন্ন পোস্টে এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও ছড়িয়ে দাবি করা হয়, মতিঝিল থানা ইউনিয়ন ব্যাংক থেকে এক ভদ্র মহিলা ৫ লক্ষ টাকা নিয়ে বাহির হয়, মহিলার ভাষ্যমতে সে মহিলার কাছে ১ লক্ষ টাকা চাঁদা দাবি করে, মহিলা দিতে রাজি না হওয়ায় ওই মহিলার হাতে থাকা ব্যানেটি ব্যাগ নিয়ে টানাটানি শুরু করে শিবু, তখন মহিলা চিৎকার করলে জনগণের হাতে গণপিটনি খান মতিঝিল থানা বিএনপির সভাপতি শিবলুর রহমান শিবু।
দ্য ডিসেন্ট, রিউমর স্ক্যানার, বাংলা স্ট্রিম এবং প্রেস ইন্সটিটিউট বাংলদেশ (পিআইবি) এর ফ্যাক্টচেক সংস্থা বাংলা ফ্যাক্ট সহ একাধিক যাচাইকারী সংস্থা দাবিটি ভুয়া বলে শনাক্ত করেছে।
যাচাইয়ে দেখা গেছে, ভিডিওটি মূলত গত ২৩ জুলাই পুরোনো পল্টন এলাকায় ছিনাতাইয়ের অভিযোগে মারধরের শিকার এক ব্যক্তির। আর ওই ব্যক্তি বিএনপির মতিঝিল থানা কিংবা পার্শ্ববর্তী পল্টন থানা শাখার কমিটির কোনো পদে নেই।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মারধরের শিকার ব্যক্তির নাম কেরামত আলী (৫০)। তার বাড়ি মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার কালীগঞ্জ এলাকায়।
ভিডিওটির রিভার্স ইমেজ সার্চে গত ২৪ জুলাই ‘জনবাণী নিউজ’ নামে একটি সংবাদভিত্তিক ফেসবুক পেইজে ভিডিওটি প্রকাশ করে দাবি করা হয়, এটি ব্যাংকের সামনে ৫ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের চেষ্টার সময় হাতেনাতে আটক এক ব্যক্তিকে মারধরের ঘটনা। ওই পোস্টেও ব্যক্তিটির কোনো রাজনৈতিক পরিচয় উল্লেখ করা হয়নি।
গত ২৩ জুলাই নুরুল আমিন নামের এক প্রত্যক্ষদর্শী নিজ প্রোফাইলে ঘটনার ছবি ও ভিডিও আপলোড করেছেন। ক্যাপশনে লেখা ছিল, ‘‘পুরানা পল্টন মোড়ে ট্রপিকানা টাওয়ারের নিচ থেকে ছিনতাইকারী চক্রের মূল হোতা আটক।’’
পোস্টকারী নুরুল আমিনের বাংলা স্ট্রিমকে জনিয়েছেন, ‘‘এই ঘটনা ২৩ জুলাই ট্রপিকানা টাওয়ারের ইলেকট্রিক প্লাজা এলাকার। টাকার মালিকের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা দুই ভাই ব্যাংক থেকে টাকা তুলে ফিরছিলেন। এই সময় টাকা ছিনতাই করে ওই ব্যক্তি দৌড় দেন। উপস্থিত লোকজন ধাওয়া করে তাকে ধরে ফেলেন এবং কয়েকজন মারধর করেন।’’
ভুক্তভোগীর ভাই আবরার বিন আশেক এলাহী বাংলা স্ট্রিমকে জানান, ‘‘তার বড় ভাই ইসলামী ব্যাংক থেকে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা তুলে বের হন। এ সময় এক ব্যক্তি টাকা ছিনিয়ে দৌড় দেন। তার বড় ভাই ধাওয়া করে ওই ব্যক্তিকে ধরে ফেলেন। পরে আশপাশের লোকজন তাকে মারধর করেন। দুপুর একটার দিকে এই ঘটনাটি ঘটে। আটক ব্যক্তিকে পরে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে তিনি একেকবার একেক নাম ও ঠিকানা বলেন। আটক ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয়ের দাবি নাকচ করে আবরার বলেন, আটক ব্যক্তি ছিনতাইয়ের অভিযোগে ধরা পড়েছিলেন। তিনি বিএনপি বা জামায়াতের নেতা কি না, তা তাদের জানা নেই।’’
পুরানা পল্টন পুলিশ বক্সের সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) নাজিম স্ট্রিমকে জানান, ‘‘২৩ জুলাই দুপুর দেড়টার দিকের ঘটনা। ইসলামী ব্যাংক থেকে টাকা তুলে বের হওয়ার পর এক ব্যক্তি টাকা ছিনতাইয়ের চেষ্টা করেন বলে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেন। পরে তাকে ধরে ট্রপিকানা টাওয়ারের নিচে মারধর করা হয়।’’