গাজায় যুদ্ধবিরতির পর নির্ধারিত ‘ইয়েলো লাইন’ আরও গাজার ভেতরে ঠেলছে ইসরায়েল। নতুন করে গড়ে তোলা হচ্ছে মাটির বাঁধ, সামরিক অবস্থান ও নিরাপত্তা অবকাঠামো। এতে একের পর এক ফিলিস্তিনি পরিবার আবারও ঘরছাড়া হচ্ছে। স্যাটেলাইট চিত্র, স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য ও বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে এমন দাবি করা হয়েছে বৃহস্পতিবার প্রকাশিত বিবিসির প্রতিবেদনে।
গত বছরের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ হিসেবে গাজায় একটি সীমারেখা নির্ধারণ করা হয়। ‘ইয়েলো লাইন’ নামে পরিচিত ওই সীমার পেছনে ইসরায়েলি বাহিনীর অবস্থান নেওয়ার কথা ছিল। চুক্তি অনুযায়ী, এর পেছনের এলাকা সাময়িকভাবে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
তবে বিবিসির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অনেক জায়গায় সেই সীমারেখার বাইরেও নতুন মাটির বাঁধ তৈরি হয়েছে। কোথাও কোথাও কংক্রিটের ব্লকও আরও ভেতরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এতে কার্যত গাজায় ইসরায়েল নিয়ন্ত্রিত এলাকা আরও বিস্তৃত হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
উত্তর গাজার আল-তুফাহ এলাকার বাসিন্দারা সোমবার সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখেন, সরিয়ে নেওয়া হয়েছে সালাহ আল-দীন সড়কের দিকে ইয়েলো লাইনের চিহ্ন বহনকারী কংক্রিটের ব্লক। কাছেই উঁচু মাটির বাঁধের ওপর উড়ছিল ইসরায়েলের পতাকা।
আল-তুফাহের বাসিন্দা উম্মে মোহাম্মদ আল-শাওয়িশ জানিয়েছেন যুদ্ধের শুরু থেকে বারবার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন তারা। এখন যাওয়ার মতো আর কোনো জায়গা নেই। আগেই ধ্বংস হয়েছিল তাদের ঘরবাড়ি, সর্বশেষ হামলার আগে সতর্কবার্তা পেয়ে তাঁবুতে আশ্রয় নিলেও ধ্বংস হয়ে যায় সেই তাঁবুটিও।
তার স্বজন মোহাম্মদ আল-শাওয়িশ মনে করেন প্রতিদিন অপমান আর বাস্তুচ্যুতির জীবন কাটানোর চেয়ে মৃত্যু ভালো।
বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির পর থেকেই ইসরায়েল দীর্ঘ মাটির বাঁধ নির্মাণ শুরু করে ইয়েলো লাইনজুড়ে। এখন পর্যন্ত ৪২ কিলোমিটারের বেশি এলাকায় এসব বাঁধ তৈরি হয়েছে। ইয়েলো লাইনের এ ধরনের স্থাপনা রয়েছে প্রায় ৮৫ শতাংশ অংশজুড়ে।
স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, কিছু এলাকায় এসব বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে মূল সীমারেখা থেকে আরও ভেতরে। যেমন আল-মাওয়াসির কাছে একটি অংশ মূল সীমারেখার প্রায় দেড় কিলোমিটার ভেতরে আর খান ইউনিসের আরেকটি অংশ প্রায় ৫০০ মিটার ভেতরে নির্মাণ করা হয়েছে বাঁধ।
বিশ্লেষকদের ধারণা, এসব নির্মাণ সাময়িক নিরাপত্তা ব্যবস্থার চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতির ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে আরও বিস্তৃত হচ্ছে ফিলিস্তিনিদের জন্য নিষিদ্ধ এলাকা।
জুলাই মাসে গাজা সিটির জেইতুন এলাকা থেকেও বহু পরিবারকে এলাকা ছাড়তে হয়। স্থানীয়দের ধারণা, সেখানেও ইয়েলো লাইন আরও সরানো হয়েছে। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সংস্থা জানিয়েছে, ওই এলাকায় অন্তত ৩০টি পরিবার তাদের আশ্রয় হারিয়েছে।
স্যাটেলাইট চিত্রে যাচাই করে দেখা যায় দেইর আল-বালাহ, খান ইউনিস, জাবালিয়া ও বেইত লাহিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়া, কৃষিজমি নষ্ট করা এবং নতুন সামরিক অবস্থান তৈরির চিত্র দেখা গেছে। যুদ্ধবিরতির পর এ পর্যন্ত অন্তত ১৪টি নতুন সামরিক অবস্থান গড়ে তুলেছে ইসরায়েল।
তবে হামাসের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে ইসরায়েল। দেশটির সেনাবাহিনীর দাবি, ইয়েলো লাইন সরানো হয়নি। তারা দাবি করে সীমারেখা স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই নির্মাণ করা হচ্ছে এসব অবকাঠামো। তাদের ভাষ্য, হামাসের পুনর্গঠন ঠেকানো এবং ইসরায়েলি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এসব পদক্ষেপের উদ্দেশ্য।