Image description

জমি নিবন্ধনের জন্য সরকার নির্ধারিত খাতওয়ারি কিছু ফি আছে। সেই ফি কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ। দলিল করার ক্ষেত্রে ক্রেতাকে সব সময় গুনতে হয় অতিরিক্ত টাকা। দশকের পর দশক নিবন্ধন সেবায় এই অঘোষিত খরচের ফাঁদে আটকা সাধারণ মানুষ। সুরাহার কোনো উদ্যোগ নেই সরকারের।

অনুসন্ধানে জানা যায়, দলিল করার ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত ফি ও দলিল লেখকের ফি ছাড়া আর কোনো খরচ নেই। কিন্তু, দলিল নিবন্ধনের জন্য গেলে পদে পদে দিতে হয় টাকা। নকল তুলতেও গ্রাহককে গুনতে হয় বাড়তি টাকা। আদায় করা অতিরিক্ত টাকা ভাগ-বাটোয়ারা হয় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে।

দলিল লেখকদের ক্ষেত্রে নির্ধারিত যে ফি আছে, তা বহু আগের এবং বাস্তবসম্মত নয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এই সুযোগে ইচ্ছামতো ফি নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে দলিলের সময় আরও কয়েকটি অঘোষিত খাতে অবৈধভাবে দলিল লেখকদের অর্থ আদায়ের অভিযোগ আছে।

প্রথম পর্ব

 

অভিযোগ আছে- এসব অর্থের ভাগ সাব-রেজিস্ট্রার, জেলা রেজিস্ট্রার ছাড়াও রেজিস্ট্রি অফিসের (সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয়) বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মচারী পান। একটি অংশ দলিল লেখক সমিতির তহবিলেও জমা হয়।

জাগো নিউজের অনুসন্ধানে এসব বিষয় উঠে এসেছে।

জমি রেজিস্ট্রির জন্য প্রত্যেক সেবাগ্রহীকে যেতে হয় দলিল লেখকের কাছে। তিনিই মূলত অধিকাংশ কাজ করে দেন। অনেক সময় পুরো কাজ করে দেওয়ার কন্ট্রাক্টও নেন। বিনিময়ে আদায় করেন নিয়মবহির্ভূত অতিরিক্ত অর্থ।

জানা যায়, নিয়ম থাকলেও দলিল লেখকরা আদায় করা অর্থের জন্য কোনো রসিদ দেন না। দলিল লেখকদের ফি সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে টাঙিয়ে দেওয়ার কথা থাকলেও তাও মানা হচ্ছে না।

দলিল লেখকদের দাবি, সরকার নির্ধারিত ফি অনুযায়ী একটি দলিল লিখে ১০০ টাকাও পাওয়া যাবে না। এটা একেবারেই অবাস্তব। তাই, জীবনধারণের তাগিয়ে তারা সেবাগ্রহীতাদের সম্মতিতেই বাস্তবসম্মত একটা ফি নেন। তাদের সম্মানী থেকেই একটি অংশ তারা সমিতিতে রাখেন।

তবে সাব-রেজিস্ট্রার ও জেলা রেজিস্ট্রারের জন্য অর্থ নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন দলিল লেখকরা।

বিধিমালা অনুযায়ী, অতিরিক্ত অর্থ নিলে দলিল লেখকদের সনদ বাতিলের কথা থাকলেও এ বিষয়েও কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। একই সঙ্গে দলিলের নকল তুলতেও কয়েকগুণ টাকা দিতে হয় বলেও অভিযোগ সেবাগ্রহীতাদের।

সরকার নির্ধারিত ফি কত?

নিবন্ধনযোগ্য দলিলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সাফ কবলা (ক্রয়-বিক্রয়) দলিল, দানপত্র, হেবার ঘোষণাপত্র, দানের ঘোষণাপত্র, অ্যাওয়াজ বা বিনিময় দলিল, বণ্টননামা বা বাটোয়ারা, বায়নাপত্র, চুক্তিপত্র, ভ্রম সংশোধন দলিল, উইল, অছিয়ত, ঘোষণাপত্র, ওয়াকফ, বহালকরণপত্র ও ট্রাস্ট দলিল।

এসব দলিলের মাধ্যমে স্থাবর সম্পত্তির মালিকানা হস্তান্তর, দান, বিনিময়, বণ্টন, বন্ধক, প্রতিনিধিত্বের ক্ষমতা প্রদান, উইল, ট্রাস্ট, ওয়াকফসহ বিভিন্ন ধরনের আইনগত অধিকার ও বাধ্যবাধকতা নিবন্ধনের মাধ্যমে কার্যকর করা হয়।

জমির রেজিস্ট্রেশনে সরকারি ফি

নিবন্ধনের ক্ষেত্রে (১০ পৃষ্ঠার দলিলের জন্য) ফির মধ্যে রয়েছে- স্ট্যাম্প শুল্ক (জমির দামের ১.৫ শতাংশ), রেজিস্ট্রেশন ফি (জমির দামের ১ শতাংশ), স্থানীয় সরকার কর (২ থেকে ৩ শতাংশ), উৎসে কর ভূমি (ধারা ১২৫), ভ্যাট (সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়), হলফনামার স্ট্যাম্প (৩০০ টাকা), এন ফি (২৪০ টাকা), এনএন ফি (৩৬০ টাকা), ই ফি (১০০ টাকা) ও কোর্ট ফি (১০০ টাকা)।

দলিল ফিস অ্যাপে প্রবেশ করেও যে কেউ তার তথ্য দিয়ে দলিল করার সরকারি খরচ জেনে নিতে পারেন।

দলিল লেখকদের ফি

২০০২ সালের ২৯ জুলাই আইন মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা অফিস আদেশ অনুযায়ী, দলিল লেখকরা ফি আদায় করতে পারবেন। বিধান অনুযায়ী, প্রতি ৩০০ শব্দ বা তার অংশের মুসাবিদা (খসড়া) প্রস্তুতের জন্য ১৫ টাকা, মুসাবিদা থেকে দলিল লিখন ও রেজিস্ট্রির বিষয়ে যাবতীয় সহায়তার জন্য প্রতি ৩০০ শব্দ বা তার অংশে ১০ টাকা এবং স্মরণশক্তি থেকে দলিল লিখন ও রেজিস্ট্রির বিষয়ে যাবতীয় সহায়তার জন্য প্রতি ৩০০ শব্দ বা তার অংশে ১৫ টাকা ফি নেওয়া যাবে।

এ ছাড়া রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮-এর ৫২ ধারার অধীনে কোনো পক্ষের ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি হিসেবে মূল দলিল ফেরত গ্রহণের জন্য ৫ টাকা, ছাপানো ফরম বা অন্য আবেদনপত্র লিখন ও পূরণের জন্য ৫ টাকা, প্রতিটি সমন লিখন ও পূরণের জন্য ২ টাকা এবং রাষ্ট্রীয় হুকুম দখল ও প্রজাস্বত্ব আইনের নোটিশ লিখন ও পূরণ করার জন্য নোটিশপ্রতি ২ টাকা ফি আদায়ের বিধান রয়েছে।

সূচি তল্লাশ বা বালামবহি পরিদর্শনের জন্য প্রতি বছর প্রতি ব্যক্তি বা প্রতি সম্পত্তির বিপরীতে ৫ টাকা ফি নির্ধারণ রয়েছে।

‘দলিল লেখক (সনদ) বিধিমালা ২০১৪’ অনুযায়ী, দলিল লেখকদের নির্ধারিত ফি সম্পর্কে জনসাধারণকে অবহিত করতে সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ের বাইরে দৃশ্যমান স্থানে সরকারি গেজেটে প্রকাশিত ফি তালিকা প্রদর্শনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। একই সঙ্গে কোনো দলিল লেখক নির্ধারিত হারের অতিরিক্ত ফি দাবি করলে তার সনদ বাতিল করা যেতে পারে।

সেবাগ্রহীতার কাছ থেকে প্রাপ্য ফি গ্রহণের পর প্রত্যেক সনদপ্রাপ্ত দলিল লেখককে রসিদ দিতে হবে বলে বিধিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে।

দলিল লেখকদের ফি

২০১১ সালের ১৮ আগস্ট আইন ও বিচার বিভাগ থেকে জারি করা এক আদেশে বলা হয়, দলিল লেখকরা পারিশ্রমিক গ্রহণ করে পক্ষগুলোকে রসিদ দেবেন এবং এ সংক্রান্ত ডায়েরি বা রেজিস্ট্রার সংরক্ষণ করবেন। দলিল দাখিলের সময় দলিল লেখকরা এ রসিদ দলিলের সঙ্গে দাখিল করবেন এবং জেলা রেজিস্ট্রারের পরিদর্শনের সময় দলিল লেখকরা এ রসিদ দেখাবেন। কিন্তু এ নিয়ম মানা হচ্ছে না।

অতিরিক্ত ফি ছাড়া হয় না দলিল

দলিল রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়ায় সেবাগ্রহীতা ও সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের মধ্যে সংযোগকারী হিসেবে কাজ করেন দলিল লেখক। আইন অনুযায়ী, একটি দলিলের মুসাবিদা (খসড়া) প্রথমে একজন দলিল লেখক প্রস্তুত করেন এবং পরে নিবন্ধনের জন্য তা সাব-রেজিস্ট্রারের সামনে উপস্থাপন করেন।

দলিল লেখকদের এড়িয়ে জমি নিবন্ধন করা প্রায় অসম্ভব। তাই তাদের চাহিদা মতো ফি না দিলে দলিল করা সম্ভব নয়। আর একটি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সব দলিল লেখকই নিজেদের মধ্যে একটি অঘোষিত নিয়ম ধরে চলেন।

আমি ৮ কড়া (আধা শতক) জমি কিনেছি। প্রতি কড়া এক লাখ ৩১ হাজার টাকা হিসেবে জমির দাম সাড়ে ১০ লাখ টাকা। সবকিছু মিলিয়ে দলিল লেখককে এক লাখ টাকা দিতে হয়েছে। দলিল লেখক ২০ হাজার টাকা বেশি নিয়েছেন।-সেবাগ্রহীতা মো. ইলিয়াস হাওলাদার

পটুয়াখালীর বাউফলের কালিশুরী এলাকার বাসিন্দা মো. ইলিয়াস হাওলাদার। তিনি দলিল করার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, ‘আমি ৮ কড়া (আধা শতক) জমি কিনেছি। প্রতি কড়া এক লাখ ৩১ হাজার টাকা হিসেবে জমির দাম সাড়ে ১০ লাখ টাকা। সবকিছু মিলিয়ে দলিল লেখককে এক লাখ টাকা দিতে হয়েছে। দলিল লেখক ২০ হাজার টাকা বেশি নিয়েছেন।’

ইলিয়াস বলেন, ‘জানতে চেয়েছি- সরকারি ফি ৮০ হাজার টাকার মতো, আপনি এত টাকা নিচ্ছেন কেন? দলিল লেখক বলেছেন, আমাকে দুই হাজার টাকা দেন, আমি দলিল লিখে দিচ্ছি। বাকিটা আপনি বোঝেন, বাকিটা আপনার দায়িত্ব। আমি বুঝে নিয়েছি, আমি দায়িত্ব নিলে দলিলটাই করতে পারবো না।’

গলাচিপা, দশমিনা ও বাকেরগঞ্জসহ কয়েকটি উপজেলার দলিল লেখকরা জানান, তারা দলিল মূল্যের ১০ থেকে ১২ শতাংশ হারে ফি নেন। এক্ষেত্রে ক্রেতা-বিক্রেতার কিছু করতে হয় না। সব দায়িত্ব তারা নিয়ে দলিল সম্পন্ন করে দেন।

পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার চিকনিকান্দি গ্রামের রহমান প্যাদা ৮ শতাংশ জমি কিনবেন। জমির দাম ঠিক হয়েছে সাড়ে ৩ লাখ টাকা। তিনি একজন দলিল লেখকের সঙ্গে কথা বলেছেন। মোট দামের ওপর ১০ শতাংশ হারে ৩৫ হাজার টাকা চাইছেন তিনি।

সরকার দলিল লেখকদের যে ফি নির্ধারণ করে রেখেছে তাতে যাওয়া আসার রিকশা ভাড়াও হয় না। তবে আমরা কারও সঙ্গে জোর-জবরদস্তি করে ফি নিই না।-দলিল লেখক কামরুল ইসলাম পাভেল

হিসাব করে দেখা যায়, এ জমি নিবন্ধনের ক্ষেত্রে সরকারি ফি হয় ২৭ হাজার ২৬০ টাকা। সারাদেশেই মূলত এভাবে দলিল করার ক্ষেত্রে এভাবে অতিরিক্ত ফি গুনতে হচ্ছে।

অতিরিক্ত ফির বিষয়ে প্রশ্ন করলে কিশোরগঞ্জ সদরের সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের দলিল লেখক কামরুল ইসলাম পাভেল জাগো নিউজকে বলেন, ‘সরকার দলিল লেখকদের যে ফি নির্ধারণ করে রেখেছে তাতে যাওয়া আসার রিকশা ভাড়াও হয় না। তবে আমরা কারও সঙ্গে জোর-জবরদস্তি করে ফি নিই না।’

কোন খাতে যায় অতিরিক্ত অর্থ

সারাদেশেরই দলিল লেখকরা তাদের নেওয়া ফি নিয়ে কঠোর গোপনীয়তা বজায় রাখেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশের কয়েকটি জেলার দলিল লেখক ও নকলনবিশরা জানিয়েছেন কোন কোন খাতে যায় দলিলপ্রতি নেওয়া অতিরিক্ত অর্থ।

দলিল লেখক সমিতিদলিল লেখক সমিতি

তারা জানান, অঞ্চলভেদে নেওয়া অতিরিক্ত অর্থের পরিমাণে পার্থক্য থাকে। ৫ লাখ টাকার কম দলিলের ক্ষেত্রে সাব-রেজিস্ট্রারদের কমপক্ষে ২ হাজার টাকা দিতে হয়। জমির দাম ৫ লাখের বেশি হলে প্রতি লাখের জন্য এক হাজার টাকা দিতে হয়। জেলা রেজিস্ট্রারদের (ডিআর) দিতে হয় ১০০ থেকে ৫০০ টাকা। দলিল লেখক সমিতির চাঁদা ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা। এছাড়া অফিসের দলিল সংশ্লিষ্ট কর্মীদের জন্যও একটি অংশ রাখা হয়।

নরসিংদী সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের দলিল লেখক আলমগীর সরকার জাগো নিউজকে বলেন, ‘অফিসে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০০টি দলিল নিবন্ধন হয়। প্রতিটি দলিলের বিপরীতে ‘সেরেস্তা’ খাতে এক হাজার টাকা নেওয়া হয়, যা অফিসের বিভিন্ন পর্যায়ের সংশ্লিষ্টদের মধ্যে বণ্টন করা হয়।’

নরসিংদী সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে বছরে প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার দলিল নিবন্ধন হয়। প্রতিটি দলিলের বিপরীতে বিভিন্ন খাতে অর্থ আদায় হওয়ায় বছরে কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয় বলেও জানান তিনি।

নিবন্ধন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর ৩৫ থেকে ৪০ লাখের মতো দলিল নিবন্ধিত হয়। প্রতিদিন নিবন্ধন হয় ১২ থেকে ১৫ হাজার দলিল।

বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া হিসাব অনুযায়ী, দলিলপ্রতি ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা অতিরিক্ত নেওয়া হচ্ছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) বিভিন্ন বছরের (২০১২, ২০১৫, ২০১৭) সেবা খাতে দুর্নীতি শীর্ষক জাতীয় খানা জরিপে দেখা যায়, দলিল রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত কাজে সেবাগ্রহীতাদের দুর্নীতির শিকার হতে হয়েছে।

জরিপগুলোতে তথ্যদাতারা জানান, দলিল রেজিস্ট্রেশনের বিভিন্ন কাজে তাদের ঘুস দিতে হয়েছে এবং একইভাবে দেখা যায় যে এই টাকার পরিমাণও বছর অনুযায়ী বেড়েছে। ২০১২ সালে এই টাকার পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৬৫৩ টাকা। ২০১৫ সালে বেড়ে এই অর্থের পরিমাণ হয় ৯ হাজার ৭৭৭ টাকা এবং সবশেষ ২০১৭ সালে দেখা যায় এই অর্থের পরিমাণ বেড়ে হয়েছে ১১ হাজার ৮৫২ টাকা।

দুর্নীতির বড় জায়গা ‘দলিল লেখক সমিতি কল্যাণ তহবিল’

প্রত্যেকটি দলিল থেকেই দলিল লেখকরা তাদের সমিতির কল্যাণ তহবিলের নামে চাঁদা আদায় করেন। বছরে এ তহবিলে কোটি কোটি টাকা জমা হয়। দলিল লেখকরা জানান, দলিলপ্রতি সমিতির চাঁদা ৫০০ থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত। বড় দলিল হলে বেশিও নেওয়া হয়।

অনেক সময় সমিতির কাছে সাধারণ দলিল লেখকরা অসহায়। কারণ সমিতির নেতৃত্বে থাকেন স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, যাদের সঙ্গে থাকেন রাজনৈতিক নেতারা। অনেক সময় ইচ্ছার বিরুদ্ধেও তাদের চাঁদা দিতে হয়। আর এ চাঁদা তারা দলিল লেখা থেকে আদায় করেন।

জমি কেনার নামে সমিতি দলিল লেখকদের কাছ থেকে প্রায় ৭ কোটি টাকা তোলা হলেও সেই অর্থের কোনো হিসাব দেওয়া হয়নি। ঈদ বোনাসসহ সমিতির বিভিন্ন তহবিলের অর্থও সঠিকভাবে বণ্টন করা হয়নি সদস্যদের মধ্যে। বরং সেই অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।-দলিল লেখক আলমগীর সরকার

কয়েকজন দলিল লেখক জানান, দলিল লেখকদের কল্যাণের নামে চাঁদা তোলা হলেও মূলত এ টাকা সমিতির নেতা ও স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিরা ভাগ-বাটোয়ারা করে নেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বেশির ভাগ সমিতির কমিটিতে পরিবর্তন এসেছে। সেখানে বসেছেন ক্ষমতাসীনদের মদতপুষ্টরা।

জমি রেজিস্ট্রিরেজিস্ট্রি অফিস সংলগ্ন দলিল লেখকদের কার্যালয়

নরসিংদী সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের দলিল লেখক আলমগীর সরকার জাগো নিউজকে বলেন, ‘জমি কেনার নামে সমিতি দলিল লেখকদের কাছ থেকে প্রায় ৭ কোটি টাকা তোলা হলেও সেই অর্থের কোনো হিসাব দেওয়া হয়নি। ঈদ বোনাসসহ সমিতির বিভিন্ন তহবিলের অর্থও সঠিকভাবে বণ্টন করা হয়নি সদস্যদের মধ্যে। বরং সেই অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।’

দলিল লেখক সমিতির কয়েক বছরের আর্থিক হিসাব সদস্যদের কাছে উপস্থাপন করা হয়নি এবং অতীতে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সমিতির চাঁদার অর্থ লুটপাট করা হয়েছে বলেও দাবি তার।

আলমগীর সরকারের ভাষ্য, সারাদেশের অনেক দলিল লেখক সমিতিতেই একই ধরনের সমস্যা রয়েছে। এ খাতে কোনো কার্যকর বিধিমালা, গঠনতন্ত্র বা সরকারি তদারকি না থাকায় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা সুযোগ নিয়ে অর্থের অপব্যবহার করছেন।

সমিতির মাধ্যমে যে সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে, সেটি ভাঙা সহজ নয়। বিষয়টি আমরা দেখছি। সেখানে তারা একতাবদ্ধ। রাজনৈতিক দলের ব্যক্তিরাও এর সঙ্গে জড়িত।-আইন ও বিচার বিভাগের সচিব লিয়াকত আলী মোল্লা

এ বিষয়ে আইন ও বিচার বিভাগের সচিব লিয়াকত আলী মোল্লা জাগো নিউজকে বলেন, ‘দলিল লেখকদের ফি ও সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো আমরা পর্যালোচনা করছি। কীভাবে এগুলো আরও কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তা দেখা হচ্ছে।’

রেজিস্ট্রি অফিসে অতিরিক্ত অর্থ আদায় ও সিন্ডিকেটের অভিযোগ সম্পর্কে সচিব বলেন, ‘সমিতির মাধ্যমে যে সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে, সেটি ভাঙা সহজ নয়। বিষয়টি আমরা দেখছি। সেখানে তারা একতাবদ্ধ। রাজনৈতিক দলের ব্যক্তিরাও এর সঙ্গে জড়িত।’

নকল তুলতেও দিতে হয় কয়েকগুণ বেশি টাকা

নিবন্ধিত মূল দলিল পেতে কয়েক বছর লেগে যায়। এজন্য মানুষ নকল (দলিলের সার্টিফায়েড কপি) তুলে জরুরি কাজকর্ম সারেন। কিন্তু নকলের ক্ষেত্রে গুনতে হয় কয়েকগুণ বেশি টাকা।

নির্ধারিত ফি অনুযায়ী, একটি ১০ পৃষ্ঠার নকল তুলতে মোট ৬২০ টাকা সরকারি ফি দিতে হয়। এর মধ্যে নকল প্রস্তুতকরণ ফি ২৪০ টাকা (প্রতি পৃষ্ঠা ২৪ টাকা), নকলনবিশের পারিশ্রমিক ৩৬০ টাকা (প্রতি পৃষ্ঠা ৩৬ টাকা) এবং আবেদনপত্রে ২০ টাকার কোর্ট ফি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

অন্যদিকে, একই দলিলের জরুরি (অগ্রাধিকার) নকল নিতে চাইলে অতিরিক্ত ২০০ টাকা ফি যোগ হয়। সেক্ষেত্রে মোট সরকারি ফি দাঁড়ায় ৮২০ টাকা। অতিরিক্ত এ ২০০ টাকার মধ্যে রয়েছে জরুরি আবেদনের জন্য ৫০ টাকা এবং ১০ পৃষ্ঠার জন্য প্রতি পৃষ্ঠায় ১৫ টাকা হিসেবে আরও ১৫০ টাকা।

কিন্তু, একটি নকল তুলতে আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা দিতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সেবাগ্রহীতারা।

পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার মাছুয়াখালীর বাসিন্দা শাহরিয়ার হোসেন রানা জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা এক পরিচিত লোক আছেন, তার মাধ্যমে কিছুদিন আগে নকল তুলেছি, আড়াই হাজার টাকা দিতে হয়েছে।’

নিবন্ধন অফিসে পদে পদে অনিয়ম

শুধু দলিল ও নকলের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ই নয়, আরও নানা ধরনের অনিয়ম রয়েছে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসগুলোতে। জাল দলিল নিবন্ধন, দলিলে মিথ্যা তথ্য সংযোজন, জমির প্রকৃত শ্রেণি ও মূল্য গোপন করে কম দেখানো হয়।

কোনো কোনো সাব-রেজিস্ট্রার দলিল লেখকদের সঙ্গে যোগসাজশ করে এসব অনিয়ম-দুর্নীতি করেন বলে অভিযোগ আছে। সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি চক্র এর সঙ্গে জড়িত থাকেন বলেও অনুসন্ধানে জানা যায়।

রেজিস্ট্রি অফিসবাউফল রেজিস্ট্রি অফিসে সরকারি ফি সাঁটানো থাকলেও অতিরিক্ত ফি দিতে হয়

এছাড়া প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বা আইনি শর্ত পূরণ না করেও প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রে দলিল নিবন্ধন করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।

দলিল লেখকদের অভিযোগ, নরসিংদী সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতি চলে আসছে। এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় অনেককে হয়রানির শিকার হতে হয়েছে বলেও দাবি করেন তারা।

নরসিংদী সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের দলিল লেখক আলমগীর সরকার জাগো নিউজকে বলেন, ‘২০২১ সালে অফিসের এক নকলনবিশ শফিকের বিরুদ্ধে সরকারি পে-অর্ডারের অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি সামনে আসে। এক বছরের হিসাবেই প্রায় ১৯ কোটি টাকা আত্মসাতের তথ্য উঠে এসেছিল। তবে ওই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট দুই সাব-রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও নকলনবিশের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি ব্যবস্থা হয়নি।’

তার অভিযোগ, সাব-রেজিস্ট্রারের সহকারীর মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে সরকারি কর্মচারীর পরিবর্তে নকলনবিশদের বসানো হয়। এতে জবাবদিহি না থাকায় দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়। সরকারি কেরানি বা মোহরারদের এসব দায়িত্বে থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে অনিয়মিত ব্যক্তিদের দিয়েই কাজ করানো হচ্ছে।

সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের হাছিবুল ইসলাম (হাছিব) নামে এক নকলনবিশের বিরুদ্ধে একজন দলিল লেখকের স্বাক্ষর জাল করে দলিল সম্পন্ন করার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে সাব-রেজিস্ট্রারের স্বাক্ষর জাল করে মূল দলিলের রসিদ বিতরণসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।

আমরা এ বিষয়ে একটি গবেষণা করেছি। সেখানে দেখা গেছে, সারা দেশের মানুষ জমি নিবন্ধন সেবা নিতে গিয়ে সরকার নির্ধারিত হারের চেয়ে বেশি অর্থ দিতে বাধ্য হচ্ছেন। মানুষের অভিজ্ঞতা হলো, ঘুস বা অবৈধ লেনদেন না করলে সেবা পাওয়া যায় না।-টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান

স্বাক্ষর জাল করায় এ বিষয়ে সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের দলিল লেখক মো. আমজাদ হোসেন (সনদ নং-১০৪) সাব-রেজিস্ট্রারের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। এছাড়া রসিদ জালিয়াতির প্রমাণ সংযুক্ত করে নরসিংদী জেলা রেজিস্ট্রারের কাছে আলাদা অভিযোগ জমা দিয়েছেন একই অফিসের আরেক দলিল লেখক তারেকুজ্জামান (সনদ নং-২৫৯)।

নরসিংদী সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে বর্তমানে কোনো স্থায়ী সাব-রেজিস্ট্রার নেই। শিবপুর ও মনোহরদী উপজেলার দুই সাব-রেজিস্ট্রার অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন।

এ বিষয়ে কথা বলতে নরসিংদীর জেলা রেজিস্ট্রার মুহাম্মদ আরিফুর রহমানকে কয়েক বার ফোন দেওয়া হলেও তিনি ধরেননি। পরিচয় জানিয়ে মেসেজ দেওয়ার কিছুক্ষণ পর ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।

নিবন্ধন অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের জেলা ও সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে অনিয়ম, সেবাপ্রার্থীদের হয়রানি ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলার অবনতির অভিযোগের পর সম্প্রতি একটি অফিস আদেশ জারি করা হয়েছে। এতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ১০ দফা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সকাল ৯টার মধ্যে অফিসে উপস্থিত থাকতে হবে এবং অনুমতি ছাড়া কর্মস্থল ত্যাগ করা যাবে না। প্রতিদিনের কাজ, দলিল, বালাম ও অন্য রেজিস্ট্রারের কার্যক্রম সেদিনই শেষ করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই স্বাক্ষর বা লিখন বকেয়া রাখা যাবে না।

দেশজুড়ে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ দলিলের নকল বকেয়া থাকায় জেলা রেজিস্ট্রার ও সাব-রেজিস্ট্রারদের এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে। নকলনবিশদের কাজ নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে এবং টানা তিন মাস মানসম্মত কাজ করতে ব্যর্থ হলে তাদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ভূমি রেজিস্ট্রেশনকে আইন মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে নেওয়ার সুপারিশ করে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন।

পটুয়াখালী রেজিস্ট্রি অফিসপটুয়াখালীর গলাচিপা রেজিস্ট্রি অফিস

ভূমি সংক্রান্ত যাবতীয় কাজ ভূমি মন্ত্রণালয় করলেও রেজিস্ট্রেশনের কাজ আইন মন্ত্রণালয় করে। ফলে ভূমি রেজিস্ট্রেশনের জন্য দুটি মন্ত্রণালয়ে দৌড়ঝাঁপ করতে হয়। কমিশন মনে করে, এক মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত হলে জনগণের হয়রানি বহুলাংশে কমে আসবে। কিন্তু, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বাধায় আন্তর্বর্তী সরকার উদ্যোগ নিলেও তা ব্যর্থ হয়।

দলিল লেখকের সংখ্যা বেশি

নিবন্ধন অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী দেশে ২০ হাজারের মতো দলিল লেখক রয়েছেন। সংশ্লিষ্টরা জানান, সারাদেশে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি দলিল লেখক রয়েছেন। এজন্য অনেক দিন ধরে নতুন দলিল লেখকদের সনদ দেওয়া বন্ধ।

‘দলিল লেখক (সনদ) বিধিমালা ২০১৪’ অনুযায়ী জেলা রেজিস্ট্রার দলিল লেখকদের সনদ দেন। রেজিস্ট্রার সাধারণত বছরে প্রতি ৩০০ দলিলের জন্য একজন দলিল লেখক নির্ধারণ করবেন। তবে, একজন দলিল লেখক বছরে মোট কতটি দলিল লিখবেন সেটার কোনো সীমা নির্দিষ্ট নেই।

ভোলার জেলা রেজিস্ট্রার মো. নুর নেওয়াজ জাগো নিউজকে বলেন, ‘দলিল লেখকের সংখ্যা বেশি আছে। সদরে যেখানে ৩০ জন থাকার কথা, আছেন ৫০ জন।’

দলিল লেখকের সংখ্যা নিয়ে নিবন্ধন অধিদপ্তরের উপ-মহাপরিদর্শক মো. আশরাফুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, ‘বিধি অনুযায়ী প্রতি ৩০০টি দলিলের বিপরীতে একজন দলিল লেখক থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে অনেক জায়গায় প্রয়োজনের তিন থেকে চারগুণ বেশি দলিল লেখক আছেন। ২০২০ সালের আগে ব্যাপকহারে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল, এখন নতুন লাইসেন্স দেওয়া বন্ধ রয়েছে।’

অভিযোগের বিষয়ে যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা

আইন মন্ত্রণালয় ও নিবন্ধন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, দলিল লেখকদের ফি বাড়ানোর বিষয়টি তারা বিবেচনায় রেখেছেন।

দলিল লেখকদের পারিশ্রমিকের একটি নির্ধারিত হার বিধিমালায় আছে। কিন্তু সেই হার এত কম যে বাস্তবে তা কার্যকর নয়। এক পৃষ্ঠার জন্য ১২ বা ১৫ টাকা নির্ধারণ করা থাকলে ১০ পৃষ্ঠার দলিল লিখে ৬০-৭৫ টাকা দিয়ে তো কারও চলবে না।-নিবন্ধন অধিদপ্তরের উপ-মহাপরিদর্শক মো. আশরাফুজ্জামান

নিবন্ধন অধিদপ্তরের উপ-মহাপরিদর্শক মো. আশরাফুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, ‘দলিল লেখকদের পারিশ্রমিকের একটি নির্ধারিত হার বিধিমালায় আছে। কিন্তু সেই হার এত কম যে বাস্তবে তা কার্যকর নয়। এক পৃষ্ঠার জন্য ১২ বা ১৫ টাকা নির্ধারণ করা থাকলে ১০ পৃষ্ঠার দলিল লিখে ৬০-৭৫ টাকা দিয়ে তো কারও চলবে না।’

তিনি বলেন, ‘সরকার যদি যৌক্তিকভাবে দলিল লেখকদের পারিশ্রমিক নির্ধারণ করে দিতো, তাহলে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার সুযোগ অনেক কমে যেত। তখন বলা যেত- সরকার যখন নির্ধারণ করে দিয়েছে, তার বেশি কেন নেওয়া হচ্ছে?’

সিটিজেন চার্টারের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘প্রায় সব অফিসেই সিটিজেন চার্টার টাঙানো থাকে। সেখানে কোন দলিলে কী কী সরকারি ফি লাগবে তা উল্লেখ থাকে। কিন্তু মানুষ সরাসরি অফিসে না এসে আগে দলিল লেখকের কাছে যায়।’

এ সময় তিনি বলেন, ‘দলিল লেখকরা অনেক সময় অফিসারের নাম ভাঙিয়ে অতিরিক্ত টাকা নেন। এমনও হয়, অফিসার নিজেই জানেন না যে তার নামে টাকা নেওয়া হচ্ছে। মানুষ শেষ পর্যন্ত মনে করে সাব-রেজিস্ট্রারের জন্যই এত টাকা দিতে হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘দলিল নিবন্ধনের সময় মানুষ স্ট্যাম্প, ব্যাংক, রাজউকের অনুমোদন, দলিল লেখকসহ বিভিন্ন খাতে যে খরচ করে, শেষ পর্যন্ত সব মিলিয়ে বলে রেজিস্ট্রিতে এত টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু পুরো দোষটা এসে পড়ে সাব-রেজিস্ট্রারের ওপর। এটা আমাদের জন্য দুঃখজনক।’

দুর্নীতির অভিযোগ প্রসঙ্গে উপ-মহাপরিদর্শক বলেন, ‘সব কর্মকর্তা এক রকম নন। আমাদের মধ্যে অনেক কর্মকর্তা আছেন যারা এক টাকাও অনিয়ম করেননি। আবার কিছু খারাপ কর্মকর্তাও আছেন। প্রায় ৫০০ কর্মকর্তার মধ্যে হয়তো ৮০ থেকে ১০০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকতে পারে। কিন্তু তাদের কারণে বাকি সবার বদনাম হয়।’

দলিল নিবন্ধনের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের নানা হয়রানির বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে জেলা রেজিস্ট্রার মো. জহুরুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের কাছে যদি কেউ (অভিযোগ নিয়ে) আসে, আমরা সরাসরি ব্যবস্থা নিই, আইনি ব্যবস্থা নিই।’

তিনি বলেন, ‘সরকার নির্ধারিত দলিল লেখকদের ফি অত্যন্ত কম এবং বাস্তবসম্মত না হওয়ার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই তা মানা হচ্ছে না।’

দলিল লেখকদের নেওয়া অতিরিক্ত ফির একটি অংশ সাব-রেজিস্ট্রারদের কাছে যায় এবং আরেকটি অংশ দলিল লেখক সমিতির ফান্ডে জমা হয়- এমন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সিলেটের জেলা রেজিস্ট্রার মো. জহুরুল ইসলাম তা অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘না, এ ধরনের তথ্য আমার জানা নেই।’

ভোলার জেলা রেজিস্ট্রার মো. নুর নেওয়াজ জাগো নিউজকে বলেন, ‘সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নানা ধরনের অনিয়ম রয়েছে। এগুলোতে নজর দেওয়া উচিত। অফিসকে ডিজিটালাইজ করা উচিত। এতে অনিয়ম কমবে।’

তিনি বলেন, ‘দলিল লেখকদের ফি খুবই কম। এটা গ্রহণযোগ্য নয়। মানবিক দিক বিবেচনা করে ফি-টা বাস্তবসম্মত করা উচিত। উপযুক্ত ফি নির্ধারণ করা হলে, দলিল লেখকরা আর অযৌক্তিক ফি নিতে পারবে না।’

‘দলিল লেখকরা সাব-রেজিস্ট্রার ও রেজিস্ট্রারের নামে ফি নেন কি না- আমরা জানা নেই। আমার তো কোনো চাহিদা নেই। অনেক সময় আমাদের নাম করে অনেকে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে। দলিল লেখকদের নিয়মের আনা প্রয়োজন’ বলেন ভোলা জেলা রেজিস্ট্রার।

রেজিস্ট্রি অফিসদশমিনা রেজিস্ট্রি অফিস

বাংলাদেশ দলিল লেখক সমিতির সভাপতি এম এ রশিদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘এখন দলিল লেখকদের ফি ১৫ টাকা, ১০ টাকা, ২ টাকা... বিভিন্ন ক্ষেত্রে এ রকম আরকি। আমরা এটা নিয়ে আন্দোলনের কর্মসূচি দেবো। আমরা সেপ্টেম্বরের ৫ প্রেসক্লাবে একটি কনফারেন্স দিচ্ছি। আমাদের দাবি দলিলপ্রতি ৫ হাজার টাকা সম্মানী নির্ধারণ করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা ২৫ পাতা, ২৪ পাতা দলিল লিখি। আমরা ফি বাড়ানোর জন্য বলেছি। দেখা যাক কী করে। যদি না হয়, আমরা কর্মবিরতিতে যাবো।’

অনুসন্ধানে জানা যায়, দলিল লেখকরা সাব-রেজিস্ট্রারদের জন্য একটি অংশ তারা রাখে, তারপরে ডিআরদের জন্য, জেলা রেজিস্ট্রারের জন্য, আপনাদের সমিতির জন্যও একটি অংশ রাখে- এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, ‘না না, সাব-রেজিস্ট্রারের জন্য দলিল লেখকদের টাকা রাখার কোনো সুযোগ নেই। ডিআরদের জন্য রাখার কোনো সুযোগ নেই। এটা যার যার … নিতে পারে। আমরা যে ফি নিই, সেটা বলেই নিই।’

যা বলছে টিআইবি

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা এ বিষয়ে একটি গবেষণা করেছি। সেখানে দেখা গেছে, সারা দেশের মানুষ জমি নিবন্ধন সেবা নিতে গিয়ে সরকার নির্ধারিত হারের চেয়ে বেশি অর্থ দিতে বাধ্য হচ্ছেন। মানুষের অভিজ্ঞতা হলো, ঘুস বা অবৈধ লেনদেন না করলে সেবা পাওয়া যায় না।’

তিনি বলেন, ‘এটি এখন এমন এক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে, যেখানে দুর্নীতি একটি সাধারণ ও স্বাভাবিক চর্চা। এই অপরাধ কেবল একজন সেবাদানকারী কর্মকর্তার ওপর নির্ভর করে না। বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তার মধ্যে যোগসাজশ রয়েছে এবং কে কত অংশ পাবে, সেটিও এক ধরনের নির্ধারিত রেশিও অনুযায়ী চলে।’

এটি শুধু স্থানীয় নিবন্ধন কার্যালয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কেন্দ্রীয় কার্যালয়েরও দায় রয়েছে। কারণ তাদের দায়িত্ব নজরদারি করা। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, নজরদারির নামে তারাও এই যোগসাজশের অংশীদার হয়ে পড়ে।’

তারা সরকারি কর্মচারী না হলেও নিবন্ধন কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের ওপর নির্ভরশীল এবং তাদের সঙ্গে যোগসাজশে লিপ্ত। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ছত্রছায়া ও সুরক্ষা ছাড়া দলিল লেখকরা কোনো অবস্থাতেই এসব অনিয়ম করতে পারতেন না।-টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘এই পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার উপায় হলো, পুরো প্রক্রিয়ায় জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা। এটি কঠিন কোনো কাজ নয়। যারা সরকারি কর্মকর্তা, তাদের বৈধ আয়ের সঙ্গে সম্পদের হিসাব মিলিয়ে দেখলেই অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের সহজেই শনাক্ত করা সম্ভব। তাদের পাশাপাশি পরিবারের নির্ভরশীল সদস্যদের সম্পদের হিসাবও খতিয়ে দেখা উচিত।’

নিবন্ধন খাতে জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতি কমাতে পুরো সেবা ব্যবস্থাকে বিকেন্দ্রীকরণের পাশাপাশি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ডিজিটালাইজেশন করার বিষয়ে মত দেন তিনি।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘পুরো প্রক্রিয়াটি ডিজিটাল করা গেলে দীর্ঘমেয়াদে টেকসইভাবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। কিন্তু এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের একটি অংশ কোনো না কোনোভাবে বর্তমান ব্যবস্থার সুবিধাভোগী হওয়ায় প্রয়োজনীয় সংস্কার এগোচ্ছে না।’

দলিল লেখকদের ভূমিকা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘তারা সরকারি কর্মচারী না হলেও নিবন্ধন কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের ওপর নির্ভরশীল এবং তাদের সঙ্গে যোগসাজশে লিপ্ত। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ছত্রছায়া ও সুরক্ষা ছাড়া দলিল লেখকরা কোনো অবস্থাতেই এসব অনিয়ম করতে পারতেন না।’

‘মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণ এবং আমাদের গবেষণা বলছে, দলিল লেখক, দালাল ও সংশ্লিষ্টরা অনানুষ্ঠানিকভাবে এই প্রক্রিয়ার অংশ। তারা প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে এবং অবৈধভাবে আদায় করা অর্থের অংশীদার হন সরকারি প্রশাসনিক কর্মকর্তারাও,’ বলেন ড. ইফতেখারুজ্জামান।