সিএনএনের বিশ্লেষণ
টানা দুই সপ্তাহ পর ইরানে হামলা থামিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। এরপর কয়েক দিনের আপেক্ষিক শান্তির পর বুধবার জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে আগাম হামলা চালিয়েছে ইরান। ইরানের সামরিক কৌশলে আকস্মিক এই পরিবর্তনে খোদ যুক্তরাষ্ট্রও একে ‘বিস্ময়কর আক্রমণ’ বলে অভিহিত করেছে।
এতদিন ধরে হামলার শুরুটা যুক্তরাষ্ট্রই করে আসছে। তবে এবার যুক্তরাষ্ট্রের নতুন হামলার জবাবে নয়, বরং তেহরান নিজেই যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে দেশটি দেখাল, নিজের স্বার্থে যুদ্ধের গতিপথ পাল্টাতে সামরিক শক্তি ব্যবহারে তারা কোনো দ্বিধা করবে না।
এদিকে, এই হামলা নতুন করে যুদ্ধ পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার পথ তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার সকালে ফক্স নিউজকে বলেন, ‘আমরা তাদের ওপর চরম আঘাত হানতে যাচ্ছি। তাদের কঠোর শিক্ষা দেওয়া হবে।’
এই হুমকি তেহরানের জন্য অবাক করার মতো কিছু ছিল না। তারা মিসাইল ছোড়ার সময় ভালো করেই জানত, এর ফলে মার্কিন বোমারু বিমানগুলো আবার ফিরে আসতে পারে এবং সেটিই হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার ভোরে ইরানের বিভিন্ন শহরে বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
অথচ ট্রাম্প গত সপ্তাহের সাময়িক বিরতিকে ইরানের একটি অনুরোধের ফল বলে দাবি করেছিলেন। তার মতে, ইরান ‘খুব বিনয়ের সঙ্গে আবেদন করেছিল’ এবং আলোচনা চেয়েছিল। যদিও তেহরান প্রকাশ্যে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি। শুধু ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছিলেন, ‘আমাদের সশস্ত্র বাহিনীও সামরিক ব্যবস্থা না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে’।
এই কারণে যুদ্ধ পুনরায় শুরু করার বিষয়ে ইরানের এই সিদ্ধান্ত আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পর নিজেরাও সংযত থাকবে বলে প্রকাশ্যে ইঙ্গিত দেওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরই তেহরানের ওই হামলা অর্থ দাঁড়ায়– রাতে টানা বোমাবর্ষণের ঝুঁকির পরও চাপ বাড়িয়ে যাওয়াই উপযুক্ত পথ বলে মনে করছে তারা।
এ বিষয়ে জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্সের গবেষক হামিদ রেজা আজিজি সামাজিক মাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ইরানের কৌশলে একটি মৌলিক পরিবর্তন এসেছে বলে মনে হচ্ছে। বিশেষ করে তারা যদি মনে করে আগেভাগে আক্রমণ চালানোই একমাত্র কার্যকর পথ, এখন তারা তাই করবে।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে ওয়াশিংটন ডিসিতে ট্রাম্পের বৈঠকের পরপরই ইরান ওই হামলা চালায়। নেতানিয়াহু ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনাকে তাদের মধ্যে ‘অন্যতম সেরা’ বলে জানিয়েছিলেন। তবে বৈঠকের কয়েক ঘণ্টা আগে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ জানিয়েছিলেন, ইসরায়েল ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা চালাতে চেয়েছিল, কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন তাদের আটকে রেখেছিল।
গবেষক হামিদ রেজা আজিজি আরও লিখেছেন, ‘এই হামলা ছিল নেতানিয়াহুর হোয়াইট হাউস সফরের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বার্তা। এটি ইঙ্গিত দেয়, ইরানের সামরিক কৌশল বদলে গেছে এবং তারা এখন কোনো আসন্ন হুমকির লক্ষণ দেখতে পেলে আগেভাগে হামলা চালাতে প্রস্তুত।’
এদিকে, জর্ডানে হামলার পরপরই মার্কিন ও সৌদি সামরিক বাহিনী একযোগে ইরাকে ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়াদের ওপর হামলা চালায়। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) ওই অভিযানকে জর্ডানে হামলার প্রতিশোধ হিসেবে দেখায়নি, বরং গত ৭২ ঘণ্টায় মার্কিন বাহিনী এবং সৌদি জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে ৩০টির বেশি ড্রোন হামলার জবাব হিসেবে উল্লেখ করে।
এই সামরিক পদক্ষেপ দেখাচ্ছে যুদ্ধ কীভাবে মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ছে। শুরু থেকেই এই সংঘর্ষ সরাসরি জড়িয়ে পড়া এড়াতে চাওয়া সৌদি আরব এখন তিনটি ভিন্ন সীমান্ত (ইয়েমেনে হুতি, ইরাকে ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়া এবং ইরান) থেকে হুমকির মুখে পড়ে আরও গভীরভাবে ঢুকে পড়ছে।
ইসরায়েলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ গবেষক ড্যানি সিট্রিনোভিচ এক্সে এক পোস্টে লিখেছেন, ওয়াশিংটন এবং তার উপসাগরীয় অংশীদারদের মূল চ্যালেঞ্জ হলো, ইরান বা তার আঞ্চলিক মিত্র—কেউই তাদের মূল কৌশলগত অবস্থান থেকে পিছু হটতে চায় না। তেহরান হরমুজ প্রণালির ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার বিষয়ে অনড়। অন্যদিকে, হুতিরা স্পষ্ট করেছে, সৌদি নেতৃত্বাধীন অবরোধ না তোলা পর্যন্ত তারা তাদের অভিযান বন্ধ করবে না।
সবকিছুর মূলে এখন হরমুজ প্রণালি
জর্ডানে হামলার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে ইরানি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক সাক্ষাৎকারে দেশটির উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি তেহরানের অবস্থান খুব স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন। তিনি ইঙ্গিত দেন, ইরান হামলা বন্ধ রেখেছিল, কিন্তু হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের সার্বভৌমত্বের দাবি চ্যালেঞ্জ করা হলে পুনরায় লড়াই শুরু করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করবে না।
তিনি আরও বলেন, প্রণালিটি যদি যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরে যায়, তবে তেহরান নিজেকে বিজয়ী মনে করতে পারবে না। এই জলপথটি এখন দেশের জাতীয় নিরাপত্তা এবং ‘প্রতিরক্ষার’ মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।
যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়ে ইরান কেন ফের সংঘাত শুরুর ঝুঁকি নিল– উপস্থাপকের এমন প্রশ্নে গারিবাবাদি বলেন, ওমান ও যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমে হরমুজে বিকল্প নৌপথ তৈরির প্রচেষ্টাকে ইরান তার জন্য ‘রেড লাইন’ বা চূড়ান্ত সীমা মনে করে। তিনি যুক্তি দেন, সেই রুট চালু হতে দিলে জলপথটির ওপর ইরানের ‘সার্বভৌমত্বের কার্যকর প্রয়োগ’ কেবল ‘একটি কল্পনাবিলাস ছাড়া আর কিছুই থাকবে না’।
তিনি আরও বলেন, সহজ চোখে দেখে হয়তো কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেন, জিপিএস বন্ধ রাখায় ইরান কেন তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে মিসাইল ছুড়ে নতুন করে যুদ্ধ ডেকে আনবে। কিন্তু গভীরে তাকালে বুঝবেন, হরমুজ প্রণালিতে যে ব্যবস্থাই কার্যকর করা হোক না কেন, তার একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে ইরানের নিরাপত্তার ওপর।
ড্যানি সিট্রিনোভিচের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলা বন্ধকে মূলত ‘সংযমের চেয়ে কৌশলগত দুর্বলতা’ হিসেবেই দেখেছে তেহরান। এই ধারণা, এমন একটি চক্র তৈরি করতে পারে, যেখানে ইরান আরও বেশি সুবিধা আদায়ের জন্য উত্তেজনা বাড়াবে, যেখানে কোনো পক্ষই নিজেদের সক্ষমতা ও ভাবমূর্তি হারানোর ভয়ে পিছু হটতে প্রস্তুত নয়।
তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার অংশীদারদের সামনে এখন দুটি বিকল্প খোলা রয়েছে– হয় ইরানের কিছু কৌশলগত দাবি মেনে নেওয়া, অথবা জাহাজ চলাচল, জ্বালানি অবকাঠামো এবং বাণিজ্যিক রুটের ওপর ক্রমাগত হামলার ঝুঁকি নিয়ে এক দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত মেনে নেওয়া।